আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

শোষিত বেলুচ ও মোদীর বেলুচিস্তান নীতির নেপথ্যে

বিজন সরকার  

ব্রিটিশ শাসিত কালাত, খারন, মারখান ও লাসবেলা  নিয়েই মূলত বেলুচিস্তান। বেলুচিস্তানের আগ্নেয়গিরির আগুন সেই সাতচল্লিশ সাল থেকেই। কালাত চুক্তির মাধ্যমে বেলুচিস্তানের শাসকেরা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। চুক্তিতে কেবল প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি-ইসলামাবাদের হাতে থাকার কথা ছিল। বাকী বিষয়গুলিতে বেলুচিস্তানের শাসকদের উপর ন্যস্ত রাখা হয়। আটচল্লিশ সালে জিন্নাহর সাথে বেলুচিস্তানের শাসকদের যে চুক্তি হয়, তা পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী মানেনি। পাকিস্তানি শাসকেরা সেনাবাহিনী পাঠিয়ে আরও অঞ্চল দখল করে বেলুচিস্তান নামক প্রদেশটি তৈরি করে। বেলুচিস্তান প্রদেশটি পাকিস্তানের চল্লিশ ভাগ জায়গা জুড়ে অবস্থিত। প্রদেশটির জন সংখ্যা প্রায় দশ লাখের মত।

বেলুচেরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার হারিয়ে ভুলের খেসারত দিচ্ছে। তবে পাকিস্তানী শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা বেলুচেরা মানতে পারেনি। স্বাধীনচেতা বেলুচেরা আটচল্লিশ সালেই পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে বহুবার বেলুচদের স্বাধীনতার সংগ্রাম দাবানলের মত জ্বলে উঠে। তাতেও কোন ফল আসেনি। বিশেষ করে, একাত্তরে পূর্ব-পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে গেলে বেলুচদের স্বাধীনতার সংগ্রাম উনিশ তিয়াত্তরে তেজময় হয়ে উঠে। বেলুচদের স্বাধীনতার সংগ্রামকে অভীষ্ট লক্ষে নেওয়ার জন্য বেলুচদের একজন বঙ্গবন্ধু খুবই অপরিহার্য। এখনো বেলুচদের মধ্যে কেউ বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেনি।

যতবারই স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়েছে ততবারই পাক সেনারা বেলুচদের নির্বিচারের হত্যা করেছে। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী একাত্তরের শিক্ষাকে উচ্চতার চিহ্ন হিসাবে বিবেচনায় নিয়ে বেলুচদের দমিয়ে রাখছে। বেলুচেরা প্রায় দশবার পাকিস্তানের শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রতিবারেই বেলুচ স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর নির্মম দমন নীতি প্রয়োগ করেছে। নির্বিচারে বেলুচদের হত্যা করা হয়েছে।

খোদ পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থার হিসাব মতে, আজ অব্ধি প্রায় আঠার হাজার বেলুচিস্তানের মানুষ হারিয়ে গেছে। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেখা যায়, গড়ে প্রায় প্রতিটি বেলুচ পরিবারের একজন করে মানুষ গুম করা হয়েছে। কেবল গ্রাউন্ডে সেনা বুট পাঠিয়ে নয়, আকাশ থেকেও বেলুচ স্বাধীনতাকামী জনগণের উপর হামলা করা হচ্ছে।

২০০৩ সালে থেকে কয়েক বছর ধরে বেলুচেরা আবারো স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে।  আত্মনিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার জন্য বেলুচদের ন্যায্য সংগ্রাম তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। সেই সময়ে সামরিক শাসক পারভেজ মোশারফ বেলুচদের স্বাধীনতার চেতনাকে নির্মূল করতে চেয়েছিলেন। বেলুচদের উপর নেমে আসে মধ্যযুগীয় বর্বরতা। গুহার ভিতর থেকে ধরে বেলুচদের অবিসংবাদিত জাতীয় নেতা নবাব আকবর বুগতিকে হত্যা করে পাক সেনা বাহিনী। বুগতিকে হত্যার পর বেলুচদের স্বাধীনতার সংগ্রাম স্ফুলিঙ্গের মত চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

গত সাত দশক ধরে বেলুচেরা পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী দ্বারা তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণের ন্যায় শোষিত হচ্ছে। সময়ের পরিক্রমায় বেলুচদের শোষণ করার জন্য নতুন নতুন ভু-রাজনৈতিক হাতিয়ার পাকিস্তানি শাসকেরা ব্যবহার করছে।

পাকিস্তানের জাতীয় গ্যাস উৎপাদনের সতের শতাংশ আসে বেলুচিস্তান থেকে। বেলুচেরা ব্যবহার করে মাত্র সাত শতাংশ। অপর দিকে পাঞ্জাব মাত্র জাতীয় গ্যাস উৎপাদনে চার শতাংশ অবদান রাখে। অথচ পাঞ্জাবিরা ব্যবহার করছে তেতাল্লিশ শতাংশ। বেলুচিস্তানের চল্লিশ শতাংশ মানুষ গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ পায়; অন্যদিকে পাঞ্জাবের সাতানব্বই শতাংশ মানুষ গ্যাস ব্যবহার করে।

অনুরূপভাবে, প্রতিটি খাতে বেলুচদেরকে শোষণ করা হচ্ছে। সারা দিনে বেলুচদেরকে ঘণ্টা দুয়েক পানি দেওয়া হয়। বেলুচদের পানি সিন্ধু প্রদেশে দেওয়া হয়। বেলুচিস্তানের সেচ প্রকল্প গুলিতেও একই রকম অবস্থা। অথচ পাকিস্তানের জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারে বেলুচিস্তানের ভূমিকা অনেক। কয়েক দিন আগেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর হাতের পুতুল খোদ বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নবাব সানাউল্লাহ খান জাহেরি বেলুচিস্তানের কৃষকদের সরকারী ঋণ না দেওয়ার অভিযোগ আনেন।

প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ থাকার পরও বেলুচিস্তানেই সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব, দরিদ্রতা ও শিশু শ্রম। প্রশাসনের উপরের স্তরে বেলুচদের সংখ্যা হাতে গনা। এমনকি বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীল প্রকল্প গুলিতেও অন্যান্য প্রদেশ ও চীন থেকে লোক নিয়োগ করা হয়। শোষণ করার তারতম্যের  প্যারামিটারের পূর্ব-পাকিস্তানের চেয়ে বেলুচিস্তানের অবস্থা খুব খারাপ। এর পিছনে মুল কারণ বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদ।

বেলুচদের ভূমির প্রাকৃতিক সম্পদ দেশী বিদেশীরা লুটে খাচ্ছে। বেলুচিস্তানের ভৌগোলিক গত সুবিধাজনক অবস্থানের ফসলও অন্যের ঘরে। বেলুচদের ভবিষ্যৎ একে-৪৭ ও এফ-১৬ এর নিচে। বেলুচিস্তানে বেলুচদের সার্বিক সয় সম্পত্তি কমছে। বাড়ছে কেবল বিভিন্ন বাহিনীর স্থাপনা ও বাহিনীর বুটের আওয়াজ।  

এমতাবস্থায় এটি বলা যায় যে শোষণ ও বঞ্চনা দিক দিয়ে বেলুচিস্তান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চেয়েও সব প্যারামিটারেই খারাপ। বেলুচদের জাতীয় সম্পদের হরিলুটে কেবল পাকিস্তানের ইলিট সম্প্রদায়ের জড়িত হয়, চীনের নব্য পুঁজিবাদীদের রাক্ষুসে থাবাও বেপরোয়া হয়ে গেছে। চীনের অর্থায়নে গুয়াদার সমুদ্র বন্দর বেলুচদের ভূমিতে নির্মাণ হলেও বেলুচদেরকে এই বন্দরের শত্রু হিসাবে দেখা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, আমেরিকা ও ভারত গুয়াদার সমুদ্র বন্দরে চীনের অর্থায়নের পিছনে চীনের নৌ-ঘাটি নির্মাণের পরিকল্পনার অভিযোগ করে আসছে। পাকিস্তানের আপত্তি থাকা স্বত্বেও আমেরিকা বেলুচিস্তানের কোয়েটাতে একটি অফিস খোলার চেষ্টা করছে।  চীন নৌ-ঘাটি নির্মাণ করছে এমন ধারনা সাধারণ বেলুচদেরও।

বেলুচিস্তানের স্বর্ণের খনিগুলিও অব্যবস্থাপনার মত নানান অজুহাতে প্রাদেশিক সরকারকে নিষ্ক্রিয় করে পাকিস্তানের এলিট সম্প্রদায় হাতে নিয়েছে। চীনের কোম্পানি গুলি স্বর্ণ উত্তোলনের বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। এক সমীক্ষা থেকে জানা যায়, বেলুচিস্তানের চাগাই জেলার রিকু ডিকের মত ছোট শহরটিতেই প্রায় পাঁচশত বিলিয়ন ডলারের দামের স্বর্ণ ও তামা জাতীয় সম্পদ রয়েছে। একই জেলায় আরেকটি ছোট শহর সেইনডাকেও স্বর্ণ ও তামার মজবুতের পরিমাণ শত বিলিয়ন ডলারের উপরে। বেলুচের এই মূল্যবান সম্পদ আরোহণের দায়িত্বে রয়েছে চীনা ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিগুলি।

বেলুচিস্তানের উপর পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর এই রকম ভয়াবহ নির্যাতন, নিপীড়ন ও শোষণের চিত্র বহির্বিশ্বের কাছে অজানা গল্প। বহির্বিশ্বের দেশগুলি, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ বেলুচদের শোষিত হওয়ার খবর জানলেও কেউ দীর্ঘদিন তেমন মাথা ঘামায়-নি। কেন মাথা ঘামায়নি, এই পরিসরে ব্যাখ্যা দেয় দুরূহ। বিভিন্ন সামরিক সূত্রগুলির মতে, পাকিস্তানের  বিমানবাহিনী যখন বেলুচ স্বাধীনতাকামী যোদ্ধাদের উপর বিমান থেকে হামলা চালায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন গোপনে দূত পাঠিয়ে কিংবা অন্য কোন মাধ্যমে পাকিস্তানকে শাসিয়ে দেয়।

বহির্বিশ্বের সাধারণ জনগণের কাছে বেলুচদের শোষিত হওয়ার নিত্য দিনের খবর তেমন ছিল না। বেলুচ স্বাধীনতাকামী জনগণ গত সাত দশক চেষ্টা করেও তাদের শোষণের খবর বিশ্ববাসীকে জানাতে পারেনি। কোন দেশের সমর্থন বেলুচেরা পাইনি। ভারতও নানান ভু-রাজনৈতিক ও শক্তিশালী অর্থনীতি অর্জনের লক্ষ্যের কারণে বেলুচিস্তানের অমানবিক চিত্র দিয়ে কথা বলেনি। দেশটির উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলে শান্তি বজায় রেখে নিজের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।

নরেন্দ্র মোদী ভারতের ক্ষমতায় আসার পরপরই বেলুচেরা কিছুটা আশান্বিত হয়েছিল। কিন্তু গত দুই বছর মোদী বেলুচিস্তানের বিষয়ে কোন অবস্থান নেননি। বরং মোদী আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে জম্মু-কাশ্মীরের সমস্যাটিকে মোদীর আলাপ আলোচনার মাধ্যমে গত দুই বছরে একটি পর্যায়ে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। গত দুই বছরে মোদী তিনবার জম্মু-কাশ্মীর সফর করলেন। ভারতের কোন প্রধানমন্ত্রীরই পুরো এক টার্মে তিনবার কাশ্মীর সফরের রেকর্ড নেই।

এমতাবস্থায় বুঝা যায়, মোদী সরকার জম্মু-কাশ্মীর ইস্যুটিকে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছেন। ভারত সরকার জম্মু-কাশ্মীরে উন্নয়ন করে জম্মু-কাশ্মীরের জনগণকে আরও ভারতের বহুতবাদ রাজনৈতিক দর্শনে দীক্ষিত করতে চাচ্ছে। বর্তমানে জম্মু-কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির সাথে মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি কোয়ালিশন করে জম্মু-কাশ্মীর শাসন করছে। বিরোধীদলে রয়েছে ন্যাশনাল কনফারেন্স।

জম্মু-কাশ্মীরে ভিতরে পাকিস্তানের সহযোগিতায় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা গত কয়েকমাস ধরেই তৎপর। পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থায় সহযোগিতায় এই বিচ্ছিন্নতাবাদীরা জম্মু-কাশ্মীরের ২০১৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিল। জম্মু-কাশ্মীরের জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করে। গত পঁচিশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পঁয়ষট্টি শতাংশ ভোট পড়ে।

মোদী সরকার যে বহুমাত্রিক পদ্ধতিতে জম্মু-কাশ্মীরের সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে তৎপর তা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বুঝে গেছেন। মোদীর সেই বহুমাত্রিক পন্থায় একটি ছিল পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করা। বিশেষ করে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে এসে এই অঞ্চলে শান্তি বজায় রাখা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর নওয়াজ শরীফের খুব একটা আপত্তি ছিল বলে মনে হয় না। একটি উদাহরণ দেই।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আপত্তিকে এড়িয়ে নওয়াজ শরীফ মোদীর অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের সাথেও নওয়াজ শরীফ দিল্লিতে সফর প্রাক্কালে দেখা করেনি। নওয়াজ শরীফের সিদ্ধান্তটি একটি শান্তির বার্তার ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু দিল্লি থেকে দেশে ফিরতে না ফিরতেই সেনাবাহিনীর সমর্থনে জঙ্গি বান্ধব ইমরান খানের কথিত সরকার বিরোধী আন্দোলনে নওয়াজ শরীফকে পড়তে হয়।  নওয়াজ শরীফ নিজের ক্ষমতা ও রাজনীতির অস্তিত্বকে রক্ষা করার জন্য জম্মু-কাশ্মীরের প্রতি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর চাপিয়ে দেওয়া নীতিতে ডুব দিতে বাধ্য হন।

নরেন্দ্র মোদী তবু হাল ছাড়েননি। মোদী সরকার দুটি বছর নানান ফোরামে জম্মু-কাশ্মীরে পাকিস্তানের মদদে সন্ত্রাসের বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে আলোচনা চালিয়ে যান। সেই সকল আলোচনায় ভারত পাকিস্তানের কাছ থেকে  পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সমর্থিত কোন ধরনের জঙ্গি কর্মকাণ্ড যেন ভারতে না ঘটে সেই নিশ্চয়তা  চেয়েছিল। তবে পাকিস্তান কেবল জম্মু-কাশ্মীর ছাড়া ভারতের অন্যান্য প্রদেশের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। জম্মু-কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিদেরকে পাকিস্তান অনেকটা প্রকাশেই সমর্থন দিচ্ছে। পাকিস্তানের এখনো মনে করে জম্মু-কাশ্মীর একটি অমীমাংসিত বিষয়।

এমতাবস্থায় মোদী সরকার নিজ দলে ও সংঘ পরিবারের চাপে পরেন। বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী জনগণকে সমর্থন দেওয়ার চাপটি ক্ষমতায় আসার পরপরই মোদীর উপর ছিল। কিন্তু মোদী আমলে নেয়নি। মোদী পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে এড়িয়ে দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের সকল চেষ্টাই করেন। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির ক্ষমতার কেন্দ্রে যে কুর্দি পরিহিত মানুষেরা, সেটি জানার পরও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার উৎসাহ দিয়ে যান মোদী।

কিন্তু মোদীর গৃহিত কোন পদক্ষেপই কাজে আসেনি। নওয়াজ শরীফ পাকিস্তানের এইবারের স্বাধীনতা দিবসকে জম্মু-কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদিদেরকে উৎসর্গ করেন। ফলে বাধ্য হয়েই মোদী ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেলুচিস্তান, পাকিস্তান-দখলকৃত কাশ্মীর ও গিলকিটে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর নির্মম নীতির সমালোচনা পথ বেছে নেন। একই সাথে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী জনগণের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। বলা যায়, ভারত এখন বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার জন্য কাজ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পুরো বিষয়টি দ্রুত পাল্টে যায় দুইটি ঘটনার পর। আফগানিস্তানে মার্কিন নতুন কমান্ডার জেনারেল জন নিকোলসন নিয়োগ পান তিন মাস হতে চলল। এই তিনমাসে তিনি দুবার ভারত সফর করেন। চলতি মাসের ১০ তারিখে ভারত সফরে গিয়ে আফগানিস্তানে ভারতের সামরিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন। আফগানিস্তানে ভারতের কেবল সামরিক খাতে নয়, বেসামরিক খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ দেয় মার্কিন প্রশাসন। আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও ভারত সফরে এসে ভারতের বিনিয়োগকারীদের আফগানিস্তানের বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান। ভারত ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে দুইশত বিশ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে।

অন্যদিকে, পাকিস্তানকে নিজের ভূমি থেকে জঙ্গিদের স্বর্গরাজ্য গুলিকে নিশ্চিহ্ন করার তাগিদ দিলেন জেনারেল জন। বিশেষ করে হাক্কানি নেটওয়ার্ককে। আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আশরাফ ঘানি পাকিস্তানে সফর গিয়ে কিভাবে জঙ্গি গোষ্ঠী গুলিকে নির্মূল করা যায় তা ভাবার জন্য পাকিস্তানের সরকারকে অনুরোধ করলেন। আফগানিস্তানের অভিযোগ, আফগানিস্তানের বিগত কয়েক বছরের হামলায় পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের হাত রয়েছে। উল্লেখ্য, আফগানিস্তানে ভারতের প্রাধান্য বৃদ্ধির কারণে আফগানিস্তানের প্রতি পাকিস্তান নাখোশ।

দ্বিতীয়ত: মার্কিনী প্রশাসন পাকিস্তানকে তিনশত মিলিয়ন ডলার সামরিক সাহায্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের ঘোষণাটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল সামরিক সহযোগিতাই বাতিল করেনি, পাকিস্তানকে শাসিয়ে দিয়েছে। জঙ্গিদের মদদ দেওয়া বন্ধ না করলে পাকিস্তানের উপর বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে এবং  উত্তর কোরিয়ার মত পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হবে-এটি স্পষ্ট করেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভারতের ভু-রাজনৈতিক সচেতন কূটনৈতিক সমাজ একটি বিষয় ভাল করেই বুঝতে পেরেছে। বিষয়টি হল, পাকিস্তান ইচ্ছে করলেই ভারত বিদ্বেষ পররাষ্ট্র নীতি বাদ দিতে পারবে না। আর সেই বিদ্বেষপূর্ণ ভারত বিরুদ্ধ নীতিতে জঙ্গি গোষ্ঠী গুলি পাকিস্তানের সামরিক শক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। যে সমাজে হাফিজ সাইদের মত একজন জঙ্গি ও সন্ত্রাসীকে জাতীয় বীর ঘোষণা করা হয়, সেই সমাজকে উত্তর কোরিয়া হওয়া থেকে কেউ ফেরাতে পারে না। যে সমাজে একটিভ ট্যাঙ্ক থিংকিং ট্যাঙ্কের ভূমিকা পালন করে, সেই সমাজের উত্তর কোরিয়া হওয়ার স্বাভাবিক পদ্ধতি রোধ করা যাবে না।

ভারতের সাথে আফগানিস্তান ও ইরানের গভীর সম্পর্কটিও বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী জনগণের পক্ষ নেওয়া মোদীর সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখে। আফগানিস্তান দেশটির নিরাপত্তাকে স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে হিমসিম কাছে।পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক দর্শন যে জঙ্গি-পন্থী, সেটি আফগানিস্তানের প্রতিটি নাগরিক (জঙ্গিরা ছাড়া) ভাল করেই বুঝে। পাকিস্তান যদি ক্রমশ আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যদি একেবারেই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, আফগানিস্তানের ভারত নির্ভরশীলতা বাড়বে বৈ কমবে না।

অন্যদিকে, ভারত যদি মোদীর বেলুচিস্তান নীতি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয় তাতে ইরানেরও তেমন সুবিধা হবে। তবে এইক্ষেত্রে ইরান নিজের দখলকৃত বেলুচিস্তানের অংশের নিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তা করবে। তাছাড়া পাকিস্তানকে থেকে বেলুচিস্তান সরে গেলে ইরান খুশিই হবে। ইরানের চিরশত্রু সৌদির ওহাবিজম আদর্শের রাজনৈতিক গবেষণার হ্যাচারি পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদির ক্ষমতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

মোদী বেলুচিস্তান নীতি কেবল নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্যাক্টর গুলির উপর নির্ভর করে নেননি। পরিবর্তনশীল বিশ্বের ভারত বান্ধব ভু-রাজনৈতিক নতুন নতুন প্রেক্ষাপট মোদীকে অনুপ্রাণিত করেছে। যে পরিবর্তনশীল বিশ্বে পাকিস্তানের জন্য স্থান ক্রমশই সংকোচনশীল হয়ে পড়ছে।  

এমতাবস্থায় মোদীর বেলুচিস্তান নীতির ভবিষ্যৎ একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় কি?

বিজন সরকার, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ