আজ রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯ ইং

মিয়ানমারের বর্বরোচিত রোহিঙ্গা নির্যাতন

রণেশ মৈত্র  

সম্প্রতি নতুন করে মিয়ানমারে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্মম নির্যাতন সুরু হয়েছে। এই নির্যাতন অতীতেও বেশ কয়েকবার ঘটেছে। চালিয়েছে সে দেশের সামরিক সরকার। কোন রাখঢাক না করে সরাসরি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে এই বর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিশ্ব জনমত উপেক্ষা করে।

এবার সেটা শুরু হয়েছে সপ্তাহ দুয়েক আগে-নভেম্বরের মাঝামাঝি বাংলাদেশকে রোহিঙ্গারা মনে করেন একমাত্র আশ্রয় শিবির। কারণ সম্ভবত: এই যে তাঁরা মনে করেন যেহেতু বাংলাদেশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান উভয়েই মুসলিম রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সুতরাং ধর্মীয় কারণেই তাঁরা এখানে আশ্রয় পেতে দাবীদার। তদুপরি, বাংলাদেশ তাদের নিকটতম প্রতিবেশীও।

একদিকে, অন্তত: আশীর দশক থেকে শুরু করে এ যাবত আনুমানিক লাখ পাঁচেক রোহিঙ্গা চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চল এলাকায় এসে ও স্থায়ীভাবে বাড়িঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন-টাকা-পয়সার বিনিময়েই হোক আর যেভাবেই হোক অনেকেই আবার বাংলাদেশের নাগরিকত্বের খাতায় সপরিবারে নামও লিখিয়ে ফেলেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম তুলে ফেলেছেন এবং দিব্যি বাংলাদেশের পাসপোর্টও পেয়েছেন। এবং সব কটি কাজই পৃথিবীর যে কোন দেশে অসম্ভব - কিন্তু তা বাংলাদেশে শুধুমাত্র সরকারী আমলাদের অসততার কারণে সম্ভব হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো- অতীতে আসা এই যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা এ দেশে বসবাস করছেন অবৈধভাবে - যদি মিয়ানমার সরকার তাঁদেরকে ফেরত নিতে রাজীও হন-তাঁরা কি যাবেন ফিরে? উত্তরে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে দু’চার শত রাজী হলেও তাতে পারেন বাকীরা যাবেন না। কারণ এঁদের অনেকেই বৈধ - অবৈধ পথে বিপুল অর্থ সম্পদের মালিকানা অর্জন করে ফেলছেন বাংলাদেশে। যা মিয়ানমারে গেলে হয়তো তাঁরা ধরে রাখতে পারবেন না। হয়তো বা সে দেশের পরিস্থিতিতে তাঁদের পক্ষে অর্থবিত্ত - বৈভব অর্জন করা ও তা রক্ষা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের জন্য এ এক সামাজিক নৈতিক সংকট ও বটে।

কিন্তু এই কথাগুলির পেছনেও তো অনেক কথা-রয়েছে যার কোন উত্তর আপাতত: কোন মহল থেকেই গণতান্ত্রিক অধিকার- মানবাধিকার ভোগ করেন? স্পষ্টত জবাব, না।

বিগত নির্বাচনে সামরিক শাসকেরা যে সকল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার - তারা তাদের মত করেই পালন করে চলেছে। অর্থাৎ মূল ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতে। সে কারণেই অং সাং সূচি এবং তাঁর ল বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও শুচি সেদেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধান উপদেষ্টা মাত্র। উপদেষ্টা এমন একটি পদ যাতে কোন কিছু করার বা নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা সম্ভবত তাঁর হাতে নেই। এ সরকার তাই মিয়ানমারের অগণতান্ত্রিক সেনাবাহিনীর সাথে আপোষের সরকার-গণতান্ত্রিক সরকার আদৌ নয়।

কিন্তু তাই বলে ঐ দেশের নাগরিক হওয়া স্বত্বেও রোহিঙ্গাদের উপর সেনাবাহিনী বর্বর অত্যাচার চালিয়ে যাওয়া স্বত্বেও, অং সান সূচি ও তাঁর ন্যুনতম প্রতিবাদ করবেন না-এটা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং তাঁর ন্যুনতম করনীয় হলো রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, তাদের উপর সেনাবাহিনীর নির্যাতন বন্ধ করা, নির্যাতিতদের উপর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দান ও সেনা নির্যাতনের ফলে যে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সহ নানা দেশে-রিফিউজি হিসেবে বসবাস করছেন-তাঁদের মিয়ানমার সরকারের উদ্যোগে সম্মানে ফিরিয়ে নেওয়া এবং যাঁরাই রোহিঙ্গাদের উপর এ যাবত নির্যাতন করেছে তাদের বিচার করে কঠোর শাস্তি প্রদানের দাবী উত্থাপন করা ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে গিয়ে সব কিছু স্বচক্ষে দেখে ক্ষতি গ্রস্ত মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা জানানো।

জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে রোহিঙ্গাদের স্থান দেওয়ার আবেদন অযৌক্তিক। কারণ তাঁরা ঐ সরকারকে নির্যাতন বন্ধ করার জন্য কার্যকর কোন ব্যবস্থা দুই দুইটি দশকেও গ্রহণ করে নি। দীর্ঘকাল যাবত পাঁচ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে বাস করছে-মিয়ানমার সরকার তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে কার্যত অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। কাজেই অভিজ্ঞতা আদৌ মধুর নয়।

এ অবস্থায় যাঁরা রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অকথ্য নির্যাতনকে “মুসলমান-বিরোধী কার্যকলাপ” বলে তার স্বরে চীৎকার করছেন-তাঁরাই ঐ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বন্ধ নন-কপট মিত্র বটে। কারণ ঐ ধরণের প্রচারের ফলে সমস্যার সমাধান তো হবেই না-বরং মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীদেরকে - যাঁরা ধর্মবিশ্বাসে বৌদ্ধ বা বুড্ডিষ্ট তাঁরা উগ্র মুসলিম -বিরোধী হয়ে উঠতে পাবেন। তাই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির এই অপচেষ্টা থেকে সকলের অবিলম্বে বিরত হওয়া উচিত।

আরাকান প্রদেশে মুসলিম ছাড়াও হিন্দু ও খৃষ্টান বসতিও আছে। বেশ কিছুদিন আগে মিয়ানমারের থেকে পরিবার এবং এক লক্ষ মুসলিম বিতাড়িত হন। হিন্দুরা ভারতে এবং মুসলিমরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় পান। তখন দেশের জনসংখ্যাও ছিল কম। কাজেই দেখা যাচ্ছে ও খানে আরাকানিদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নয় জাতিগত সংখ্যালঘু বিতাড়নের ষড়যন্ত্র বহু পুরাতন এবং তা আজও দিব্যি বহাল আছে।

ঐ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সাংস্কৃতিক চেতনা ইত্যাদি সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণাই নেই তবে সাধারণভাবে ধরে নিতে পারি দীর্ঘকাল মুসলিম বাদশা দ্বারা এবং পরবর্তীতে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা শাসিত এই দেশ (মিয়ানমার) ১৯৪৮ সালে ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা অর্জন করলেও সে দেশের জনগণ কদাপি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের স্বাদ পায় নি। সে কারণে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশও ঐ দেশে ব্যাহত হয়েছে।

তবে বহুকাল আগে ঐ দেশে প্রাচীন যে সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়-সেই সভ্যতার নাম নিশানাও আজ আর দৃশ্যমান নয়। এক গভীর সাংস্কৃতিক ও সভ্যতার সংকটে পতিত হয়েছে মিয়ানমারবাসীদেরকেই সোচ্চার হতে হবে-গণতন্ত্রের যে সংগ্রাম অং সান সূচির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল-তাকে তার যৌক্তিক এবং সকল পরিসমাপ্তির পথেও নিয়ে যেতে হবে। শুচিকে তাঁর দলের এবং সর্বোপরি তাঁর অর্জিত নোবেল পুরস্কারের মর্যাদাও রক্ষা করতে এগিয়ে আসা আজ অত্যন্ত জরুরী শুধু রোহিঙ্গাদের স্বার্থে নয়-ব্যাপক অর্থে মিয়ানমার ও তার সকল অধিবাসীদের স্বার্থেই।

আজ আন্তর্জাতিকতার যুগ। মিয়ানমার আন্তর্জাতিক পরিসবে কোন খ্যাতি বা প্রভাব রাখে না। তাই জাতিসংঘ, ও আই সি প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে সামরিকভাবে হলেও তাদেরকে বাঁচাতে। আর মিয়ানমার সরকারের উপর ব্যাপক চাপ বৃদ্ধি করে সে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও নাগরিক অধিকারের স্বীকৃতি সহ অপরাপর ন্যায্য দাবীগুলি আদায়ে।

কিন্তু অমানুষিক, অমানবিক ও নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য এই মুহূর্তের করনীয় যেন আন্তর্জাতিক মহল বিস্মৃত না হন। বস্তুত:ই তারা অগ্নিসংযোগ মারধর, ধর্ষণ ও লুটপাটের যে ভয়াবহ শিকারে পরিণত তাতে আপাতত: তাদের ঐ দেশে বাস করা দুরূহ। তাই সাময়িকভাবে হলেও, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব প্রভৃতি দেশে তাদেরকে অভিবাসী হিসেবে থাকতে দিলে এবং একই সাথে মিয়ানমার সরকারের উপর সকল মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করে সমস্যাটির তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সময় সাপেক্ষ হলেও এই পথেই বিষয়টির সমাধান সম্ভব।

বাংলাদেশ এতই বেশী over populated যে তার আর নতুন করে অভিবাসী আশ্রয়দান অসম্ভব। তবে বাংলাদেশ সম্ভবের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের নির্যাতিতদের ব্যাপারে নানা আন্তর্জাতিক মহলের সাথে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।

রণেশ মৈত্র, লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক; মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ইমেইল : [email protected]

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৫ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭০ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫১ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১০ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৬ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৫ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ