আজ বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ইং

যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে কেন আন্দোলনের সংস্কৃতি চাই?

কাজল দাস  

সমাজে ধর্ষণের সংস্কৃতি কেন জন্মায়?

নারীকে একজন পুরুষ ধর্ষণ করতে পারে, এই ভয়ানক ক্রিয়াগত  চিন্তার জন্ম মানব সমাজে কিভাবে এলো? ইতিহাসের কোন প্রেক্ষাপট সমাজে এই ক্রিয়াটার জন্ম দিলো? কেন এবং কিভাবে নারীকেই ধর্ষিতা হবার জন্য দোষী হিসাবে সাব্যস্থ করা হলো?  সেই সাথে আরেকটি প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ সেটা হল-প্রাণী জগতের মধ্যে মানুষের বাইরে আর কোন প্রাণী কেন এই রকম একটি জঘন্য প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত নয়।


 


সমাজ–নৃতাত্বিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর নানান আলোচনা পাওয়া যায়। নারীকে নির্যাতন ও ধর্ষণের স্বরূপ প্রণিধানযোগ্যভাবে পাওয়া যায়, মার্ক্সবাদী দার্শনিক ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের  বিখ্যাত রচনা পরিবার, ব্যাক্তিমালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি (১৮৮৪)’ বইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায়। তিনি আবার এই বইটি  লিখেছিলেন আরেক বিখ্যাত দার্শনিক, যাকে পরবর্তীতে নৃ-বিজ্ঞানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া  হয়েছিল সেই লুইস. হেনরী মর্গানের আদিম সমাজ (১৮৭৭), বইয়ের উপর। এঙ্গেলস, এই বইয়ে সর্বপ্রথম উল্লেখ করেন, সমাজে নারীর সকল প্রকার নির্যাতনের মূল কারণ- পিতৃতান্ত্রিক সমাজের উদ্ভব। যাকে তিনি উল্লেখ করেছিলেন ‘নারী জাতির এক বিশ্ব ঐতিহাসিক পরাজয় হিসেবে’।



তিনি দেখিয়েছিলেন- সমাজে উৎপাদনের প্রাচুর্য্য আসার পরে মানুষের মনে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ধারণা জন্মায় ,  আবার একই সাথে এই সম্পত্তিকে  ঠিকিয়ে রাখার জন্য উত্তরাধিকারের প্রশ্ন  ও দেখা দেয় আর তখন এই সম্পত্তি ও উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখার একমাত্র সমাধান হিসেবে আসে বৈধ সন্তানের প্রশ্ন। আর এই বৈধ সন্তান আসতে পারে একমাত্র নারীকে কব্জা করেই, সেটা হল বিয়ে করে তাকে পুরুষের একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা যাতে করে তাকে আর কোন পুরুষ নিজের বলে দাবি করতে পারে না। আজকের নারী ধর্ষণের সময় সবার আগে ‘ইজ্জতে’র  প্রশ্নটা যেভাবে প্রধান হয়ে সামনে আসে তার মূল কারণ –এই লিগ্যাসি। যার নাম আসলে প্যাট্রিয়ার্কি বা পিতৃতন্ত্র।

 



গত শতাব্দীর আরেক বিখ্যাত নারীবাদী মনীষী সিমোন দ্য বোভোয়ার তার সেকেন্ড সেক্স (১৯৪৯), বইয়ে আরো বিস্তৃত করেছেন এই ধারণাকে। তিনি দেখিয়েছেন-পুরুষতন্ত্র হল একটা সামাজিক ও মানসিক প্রক্রিয়া যেখানে নারীরা পুরুষের বিপরীতে ‘অন্য বা আদার’ হয়ে সমাজে অবস্থান করছে, বেড়ে উঠছে। নারীর জন্ম, বেড়ে উঠা, সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে তিনি বায়োলজিক্যাল সেক্স বা সামাজিক লিঙ্গের পরিচয়ে আলাদা করে দাঁড় করিয়ে দেখান ‘কেউ নারী হয়ে জন্মায় না, তাকে নারী হতে হয়’।  এইসব থেকে একটা স্পষ্ট ধারণা আসে যে, নারীকে নির্যাতন করার জন্য সামাজিকভাবে একটা চিন্তা বা মনস্তত্ব এই সমাজে বহুকাল আগ থেকেই নির্মাণাধীন আছে । এবং এই প্রক্রিয়া চলমান।

 



নারীর উপর সকল প্রকার অধস্থনতা, অধীনতা, অবদমন, নিপীড়ন, নির্যাতন যে কৌশলে গড়ে উঠেছে ধর্ষণের ক্রিয়াটা ও এই নির্মাণের ফসল। ধর্ষণের এই ক্রিয়ার এক অনবদ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন আরেক আমেরিকান নারীবাদী লেখিকা সুশান ব্রাউনমিলার। তিনি এ্যাগেইন্সট আওয়ার উইল: ম্যান অম্যান এ্যান্ড রেইপ বইয়ে দেখান কিভাবে সমাজে ধর্ষণের মনস্তত্ব জন্ম নেয় ও সামাজিক হয়ে উঠে।  লেখিকা বলেন-ধর্ষণ এমন একটি সচেতন প্রক্রিয়া যেখানে সকল পুরুষ কর্তৃক  সকল নারীর উপর ভয়ের সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়। তিনি মনে করেন ‘ধর্ষণ শুধু একটি কামনা বা বাসনা প্রশমনের ব্যাপার নয় উলটো এটা হল ক্ষমতা ও ত্রাসের মানদন্ড। এবং এখানেই তিনি দেখান যে, প্রাণীজগতে মানুষের বাইরে আর কোন প্রাণীর এই রকম ভয়, শাসন, ত্রাস না থাকায় তাদের মধ্যে কখনোই যৌনতার কারণে রেইপের ঘটনা ঘটে না।

 



ব্রাউনমিলার আলোচনা করে দেখান-সমাজে প্রথমদিকে নারীকে যখন রেইপ করা হত তখন এটাকে কোন অপরাধ হিসেবে দেখা হতো না, বরং মনে করা হতো একটা সম্পদের ক্ষতি হিসাবে, একজন বাবা ধর্ষককে মনে করতেন তার মেয়ের ভার্জিনিটি বা কুমারীত্বের নষ্টকারী হিসেবে যে বাজারে তার মেয়ের বিনিময় মূল্য কমিয়ে দিয়েছে, নারীকে ধর্ষণ করা মানেই হলো কেউ তার একটা সম্পত্তির ক্ষতি করেছে সেজন্য তখন ধর্ষকদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হতো। তিনি বিভিন্ন সময় ও সমাজের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করে দেখিয়েছেন, ধর্ষণ অনেক পরে এসে সমাজে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, তার আগে এইটা ছিল নারীর উপর নিয়ন্ত্রণ নেয়া, দখল নেয়া, আধিপত্য বিস্তার করা। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়া এখনো বিদ্যমান সর্বাগ্রে। বর্তমানে আমাদের সমাজে যে ধর্ষণ হচ্ছে এইসবই অতীতের এই সব ঘটনাজাত। নতুন সময়ে শুধু ক্ষমতা কাঠামোর সাথে রূপ ভিন্ন হয়েছে। কার্যত ধর্ষণের চেহারা একই।



 

 

বাংলাদেশ ধর্ষণ ও তার সংস্কৃতি উৎপাদনের কারখানা:



পৃথিবীর ইতিহাসে সকল দেশে ও সমাজে ধর্ষণের ক্ষেত্রে একটি সাধারণ বিষয় পাওয়া যায় সেটা হল –প্রতিটি ধর্ষণই ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে ঘটেছে। পুরুষের বায়োলিজিক্যাল ক্ষমতা, পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতা, ধর্মীয় ক্ষমতা, যুদ্ধের ক্ষমতা, প্রশাসনের ক্ষমতা, মিডিয়ার ক্ষমতা, জাতিগত প্রতিপত্তির ক্ষমতা, অর্থের ক্ষমতা, রাষ্ট্র ও সমাজের সকল সামাজিক ক্ষমতা এসব ব্যবহার করে নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। আমাদের দেশেও রেপের ক্ষেত্রে এই চিত্র ফুটে উঠেছে।

 



এই দেশে ধর্ষণের বড় ঘটনাটি ঘটেছে ১৯৭১ সালের দীর্ঘ নয় মাস জুড়ে। সুশান ব্রাউনমিলার, তার বইয়ের ‘রেইপ অফ বাংলাদেশ’ অধ্যায়ে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে ২,০০,০০০ অথবা ৩,০০,০০০ অথবা ৪,০০,০০০ নারী ধর্ষিতা হয়েছেন বলে তিনটি বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে উল্লেখ পাওয়া যায়। তারপর সাম্প্রতিক ইতিহাসে ধর্ষণ বেশী দেখা গেছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনসংখ্যার উপরে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনের হেফাজতে, মিডিয়ার কাজে, কর্মক্ষেত্রে এর বাইরে বড় সংখ্যার রেপ হয় আমাদের সামাজিক পরিমন্ডলে বিশেষ করে পরিবারে, সেটা শহর-গ্রামের উভয় ক্ষেত্রেই হচ্ছে।

 



সাম্প্রতিক সময়ের সংঘটিত ধর্ষণের পর্যালোচনা করলেই এই ক্ষমতা বিন্যাসের চিত্র পাওয়া যাবে। পহেলা বৈশাখের টিএসসি’র শ্লীলতাহানি ও একই দিনের বিভিন্ন জায়গায় ঘটে যাওয়া বর্বরোচিত ঘটনার কথা সবার কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে কারা কিভাবে এগুলো সংঘটিত করছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকার সাথে দুর্ব্যবহার , জাবিতে আদিবাসী তরুণীর গায়ে হাত ও রঙ দিয়ে শ্লীলতাহানি , এইসব ঘটনা রেপ না হলে ও ভয়াবহ, ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থার্টিফাস্ট নাইটে তরুণীকে শ্লীলতাহানি, জাবিতে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন, সেঞ্চুরিয়ান মানিকের ধর্ষণের পাশবিক উদযাপন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী ধর্ষণ, এগুলো প্রতিটার ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবপুষ্টদের দ্বারাই এই সব হয়েছে, এজন্য ধর্ষকের পরিচয়ের ক্ষেত্রে রাজনীতি মুখ্য। এদের রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকত তাহলে এটি সম্ভব হত না।



আবার মোহাম্মদপুরের যে শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে এটি একজন বিবেক বুদ্ধিহীন পুরুষের পাশবিক ক্ষমতা, যে গারো তরুণীকে রেপ করা হল বা নারায়ণগঞ্জে বাসে ধর্ষণ করা হল, এগুলো সব কয়টাই পুরুষতন্ত্রের পাশবিক বর্বরতা। এখানে বাস্তবিক অর্থেই একজন নারী বা শিশু অসহায়। গ্যাং রেইপ ভয়াবহ।

 



প্রান্তিক বা আদিবাসী বা সংখ্যালঘুদেরকে ধর্ষণ করা ও ক্ষমতার ব্যবহার। পার্বত্য এলাকার সাম্প্রতিক ইতিহাস হতে দেখা যায়, সেখানে সেটেলার অভিগমনের পরেই তাদের মধ্যে ধর্ষণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার বড় কারণ, জাতিগত নিপীড়ন কাঠামো। সেখানকার সেটেলার-পুলিশ-সেনাবাহিনী-সিভিল প্রশাসন মিলে যে দুর্বৃত্তায়নের চক্র গড়ে উঠেছে, এটিই সকল রেপের জন্ম দিচ্ছে। এখানে সরাসরি এই ঘটনার জন্য রাষ্ট্র দায়ী, কারণ জনগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রনের বা তার যে স্টেইট মেকানিজম, এটি সকল ধর্ষণকে বৈধতা দিচ্ছে। পৃথিবীর বহু দেশে প্রান্তিকদের ক্ষেত্রে এটি ঘটে।

 



মিডিয়ার দ্বারা সমাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রেপ হচ্ছে। মিডিয়ার কাজে নিয়োজিত নারীদেরকে সরাসরি অনেক সময় রেপের শিকার হতে হয়, এটি সারা বিশ্বের মিডিয়া জগতে একটি সাধারণ ফেনোমেনন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার বাইরে মিডিয়া একটি উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা রাখে, সেটি হল সমাজের ভেতরে শরীর ও যৌনতা কেন্দ্রিক বিভিন্ন উপাদান তৈরি করে রেপের একটি কম্পালসিভ সংস্কৃতি জন্ম দেয়া, যাতে করে মানুষের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত কামোত্তেজনা তৈরি হয়, আর তার প্রতিক্রিয়ায় ধর্ষণ সংঘটিত হয়। বর্তমানে ভারতে, এর প্রভাব মারাত্মক। যখন কোন সমাজে বস্তুগত উপাদান (মিডিয়ার ক্ষেত্রে-পর্ণো, নাইটক্লাব, বার, রেটেড মুভি, যৌনতার কিটস) এর সাথে অবস্তগত উপাদানের (মিডিয়ার ক্ষেত্রে, মানুষের সঠিক যৌন ধারণা, বয়স ও অবস্থানভেদে বিভিন্ন যৌন বস্তুর প্রদর্শণ, তার প্রসার  ইত্যাদি)  বিকাশ সমানভাবে হয় না, তখন সেখানে একটি সংকট সৃষ্টি হয়, যাকে সমাজবিজ্ঞানীরা কালচারাল ল্যাগ বা সাংস্কৃতিক দুরত্ব বলেন, এই দুরত্ব মিডিয়ার রোল প্লেয়িং এর মাধ্যমে ও হয়, যা সমাজে ধর্ষণের সংস্কৃতি উৎপাদন করে।

 



আমাদের দেশে এর বাইরে বড় একটি সংখ্যার রেইপ হয়, গ্রামে বা শহরে, পারিবারিক সংস্কৃতির মধ্য বা বিদ্যমান সংস্কৃতির মধ্যে। মূলত, নারীর প্রতি সমাজের মূল দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ধর্মীয় বিভিন্ন অনুশাসন ও পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাই এখানে নারীর উপর এই সংস্কৃতির জন্ম দেয়।

 



ধর্ষণ প্রতিরোধে আমরা কোন পথে হাঁটছি ?



বাংলাদেশে বর্তমানের নিয়মিত ধর্ষণের ঘটনা ও তার বিচার না হওয়ার বড় কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, ’৭১ সালের ধর্ষকদের বিচার না হওয়া। এই বিচারহীনতা আমাদের সমাজে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ। যদি ’৭১ সালের পরে যদি এইসব ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক বিচার বা শাস্তি হতো তাহলে বর্তমান সময়ে এ দেশে এই রকম ঘটনা কম হতো বলেই আশা করা যায়। সময়মত যুদ্ধাপরাধীদেরকে ধর্ষক হিসেবে বিচার করা গেলে, এই দেশে একটা বড় সংস্কৃতির জন্ম হত। নারীর প্রতি সম্মান ও মূল্যবোধ গড়ে না উঠার আরো একটি ঘাটতি আমাদের এই জায়গায় তৈরি হয়েছে। তবে আশার কথা হল, আমাদের সেই ধর্ষিতা নারীদের সম্মান দেয়ার জন্য, যারা ধর্ষক সেই রাজাকারদের বিচার আমরা শুরু করতে পেরেছি ৪৩ বছর পর এসে, মাত্র ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী থেকে। শাহবাগ আন্দোলনের পরে। এই আন্দোলনের দীপশিখা আবার জ্বালিয়েছিলেন আরেক সাহসী নারী-আমাদের জননী জাহানারা ইমাম। এক্ষেত্রে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে, সেটি হল ইতিহাসকে আমরা ভবিষ্যতের জন্য স্বাক্ষী করতে পারিনি সময়মত ।



তবে এই দেশে যতদিন পর্যন্ত একটা সঠিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক যৌন ধারণা ও যৌন সম্পর্ক পাঠ তৈরি করা যাবে না ততদিন ধর্ষণ ঠেকানো অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কোন সমাজেই ধর্ষণ বন্ধ করে দিতে পারবে না কিন্তু যৌন স্বাধীনতা ও শিক্ষা দিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ রাখার একটা চেষ্টা করা যেতে পারে। আমাদের দেশে সেক্স বা যৌনতা কি পর্যায়ে আছে সহজ একটা উদাহরণ দিয়েই এর নমুনা বুঝা যায় ,আমাদের দেশে সেক্স বা যৌন সঙ্গমের নাম দেয়া হয়েছে, দিল্লীর লাড্ডু। চুড়ান্ত অশ্লীল হলে ও উক্তিটি সবাই ব্যবহার করে। এমনি বাবা-মা ও ছেলেমেয়েকে বলে  ‘ছেলে দিল্লীর লাড্ডুর জন্য পাগল হয়ে গেছে’ ।



এই দিল্লীর লাড্ডু শব্দ দিয়ে আমাদের দেশের মানুষের যৌনতার ধারণা ও জ্ঞান পাওয়া যাবে অনেকটাই। আমাদের যৌনতায় সেক্স হল মূলত ক্রিয়া ,এটিকে কামনা বা আনন্দের যায়গায় দেখা মিলে না। বিয়ের পরে দুজন নারী পুরুষ শুধু ক্রিয়া করে অথবা বিয়ের আগে দুজন নারী-পুরুষ ক্রিয়াতে যাবার জন্য শুধু বিয়ে করে। এই অবস্থার জন্য কারো যৌন আকাঙ্ক্ষা দেখে বলা হয়, যে দিল্লীর লাড্ডু খাইছে সেও পস্তায় যে খায় নাই সেও পস্তায়। অথচ যৌনতা পস্তানোর মতো কোন কিছু না। এটাকে এই পস্তানো পর্যায়ে নামিয়ে আনার কারণ আমাদের যৌন ক্রিয়াতে সর্বাংশে কামনা বা আনন্দের অনুপস্থিতি বিদ্যমান থাকা।



যৌনতা মূলত মানূষের দুই ধরণের প্রবৃত্তি। একদিকে এইটা জৈবিক সেজন্য শারীরবৃত্তীয় প্রবৃত্তি, অন্যদিকে এটা বিপরীত লিঙ্গের উপর নির্ভর করে সেজন্য মানসিক বা সাংস্কৃতিক প্রবৃত্তি। আমার শরীর সক্ষম, সেজন্য যৌন ক্রিয়া আছে কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে মিলনে যাবার জন্য উপযুক্ত সঙ্গী না থাকায় মানসিক ক্রিয়া নিবৃত্ত হবার সুযোগ নাই। এই দুই ক্রিয়ার দ্বন্দ্বেই মূলত সমাজে যৌন সমস্যার উপসর্গ তৈরি হয়। পর্ণো দেখা, চটি পড়া, হস্তমৈথুন, স্বমেহন,  ইত্যাদি ক্রিয়া ও তার সাথে ধর্ষণ মূলত এই জায়গা দিয়ে মানুষেরে ভেতরে প্রবেশ করে। এখানে কামনা বা আনন্দ নাই শুধু ক্রিয়াটা মূখ্য। যারা ধর্ষণের মত কাজ করে তারা শুধু পাশবিক ক্রিয়াটাই করে, এমনকি দাম্পত্য জীবনে ও এই ক্রিয়াটাই বেশীরভাগ প্রথাগত সংস্কৃতিতে দেখা যায়। আমাদের দেশে ও এটি বেশী বিদ্যামান।ফলে ধর্ষণকে প্রতিরোধের জন্য প্রথমেই মিটিগেট করা দরকার শারীরিক ও মানসিক ক্রিয়ার দ্বন্দ্ব, এজন্য দরকার যৌন সম্পর্কের স্বাধীন সমাজ। ব্যক্তির স্বাধীনতার সাথেই এর সম্পর্ক।



এর বাইরে আরো কয়েকটি বিষয় দরকার একটা হল ব্যক্তির সুপার ইগো বা সামাজিক বোধশক্তির নিয়ন্ত্রণ। ৫ বছরের শিশুকে নির্যাতন বা বাবার দ্বারা কন্যা সন্তান রেইপ, নিকট আত্মীয়ের দ্বারা শিশু নির্যাতন, নারীকে দেখলেই কেবল যৌন প্রাণী মনে করতে হবে এইসব বন্ধের জন্য ব্যক্তির সুপার ইগোর জাজমেন্ট ইম্পরট্যান্ট। এটি অর্জন করতে হলে নারী-পুরুষের মধ্যকার সেক্স-রোল সোশালাইজেশন বা সামাজিক লিঙ্গ বা জেন্ডারের  উপর ভিত্তি করে যে  সামাজিকীকরণ গড়ে উঠেছে তাকে প্রতিরোধ করতে হবে। নারী, নারী হয়ে জন্মায় না, তাকে নারী হতে হয়, বোভায়ারের এই মহান উক্তির প্রেক্ষাপট বিচার করতে হবে।  সমাজের ভিতরে সেক্সুয়াল পলিটিক্স বন্ধ করতে হবে। নারীকে সব সময় কোমল, নরম, আবেগী, অপ্রতিরোধ্য, নমনীয়, অরক্ষিত এইসব বাইনারী জেন্ডার পোলারাইজেশন ভাঙ্গতে হবে, নারীকে  যৌন সর্বস্বতা দিয়ে দেখার ধারণার খোলস ভাঙ্গতে হবে। নারীর নিজস্ব নির্মাণ যাকে ব্রিটিশ লেখিকা ভার্জিনিয়া ওলফ বলতে চেয়েছেন ‘এ্যা রুমস অফ ওয়ান ওন’  এটিকে উৎসাহিত করতে হবে, ছোটবেলা থেকেই ছেলে-মেয়েদের মধ্যকার জেন্ডারগত ধারণা দূর করতে হবে।



এর বাইরে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ একটি কার্যকরী উদ্যোগ। যদি ধর্ষণের মতো ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বিধান করা যায় তাহলে সেটা নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।  রাজনৈতিক ক্ষমতার সাথে সমাজে যত ধরণের ক্ষমতা কাঠামোর উপর ভিত্তি করে  ধর্ষণ সংগঠিত হয়, সব কয়টিকে আইনের শাসনে নিয়ে আসা গেলে ধর্ষণ প্রতিরোধ সম্ভব, বাংলাদেশের মত প্রথাগত সংস্কৃতির দেশে আইনের উপর শ্রদ্ধা না থাকায় এই রকম ঘটনা প্রতিনিয়ত উৎসাহ পাচ্ছে।



তবে মূলত দরকার ধর্ষণ বা নারী নিপীড়নের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনপ্রতিরোধ ও আন্দোলনের সংস্কৃতি, সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার, নারীর উপর ধর্মীয় অনুশাসনের বাঁধা, কর্মক্ষেত্রে নারীর উপর ত্রাস  সকল ক্ষেত্রেই এটি উপযোগী। বর্তমানে সময়ে পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে ছাত্র ইউনিয়নের তরুণ বন্ধুদের প্রতিরোধ আশা জাগানীয়া, একই দিনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ও একজনকে গণধোলাই দিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দিয়েছে। ঐ দিন আবার জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আদিবাসী তরুণীর গায়ে হাত ও রঙ দিয়ে শ্লীলতাহানি করায় জাবি শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে প্রশাসন  ৫ জন ধর্ষককে আজীবন ও বাকিদের সাময়িক বহিষ্কার করেছে।



তার কিছুদিন পর আরো এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা লুবনা জেবীন, অপমানকারীকে টেনে ধরে প্রক্টরের রুমে এনে ধরিয়ে দিয়েছেন, হাইকোর্টে রিট করে তাকে আজীবন বহিষ্কার করেছেন। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের নারকীয় ও লোমহর্ষক ঘটনার পরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিশোরীর ছাত্রীর মৃত্যু সবাইকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে। তারপর নারায়ণগঞ্জে চলন্ত বাসে এক নারীকে ধর্ষণের পর ২২ তারিখ রাতে আদিবাসী তরুণীকে গ্যাং র‍্যাপের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন দাঁনা বেঁধে উঠেছে।



ইউরোপের ইতিহাসে নারীর আজ মর্যাদার আসন প্রতিষ্টা করতে পেরেছে তার মূল কারণ শক্তিশালী নারী আন্দোলন।  ইংল্যান্ডে, ১৮৩৫ সালে নারী শিক্ষার দাবিতে রিফর্ম বিল, ১৮৮৮ সালে সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার আন্দোলন, ৮ মার্চের নারী দিবসের আন্দোলন, সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন নারীকে নিজের অধিকারের সক্ষমতা দিয়েছে। আমাদের দেশে তার ব্যতিক্রম সম্ভব নয়। সারাবিশ্বের মোড়ল, উদারনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের সূতিকাগার খোদ জাতিসংঘই মনে করে, নারীর নিপীড়ণের মূল কারণ পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্য, পুঁজিতান্ত্রিক অসমতা আর ধর্মীয় অনুশাসন।



গত মার্চে হয়ে যাওয়া, জাতিসংঘ ইউ এন ওম্যানের সিএসডব্লিউ কমিশন ( কমিশন অন দ্য স্টাটাস অফ ওম্যান) এর ৫৯তম অধিবেশনের রাজনৈতিক প্রস্তাবনায়ও তারা এই আন্দোলনের কথা গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করেছে।  ফলে পুঁজিবাদ ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের একটি লিবারেল প্রতিষ্ঠান যখন নারীর উপর নিপীড়নের মূল কারণ হিসেবে পিতৃতন্ত্র ও বর্তমান সমাজের বিদ্যামান অসমতাকে দায়ী করে এবং আন্দোলনকেই একমাত্র কার্যকরী পন্থা হিসেবে চিহ্নিত করে ফলে আমাদেরকে বুঝে নিতে হবে পালটা আঘাতের আন্দোলন কতটা শক্তিশালী হওয়া দরকার।  

 

 

কাজল দাস, অনলাইন এক্টিভিস্ট

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫৩ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২১ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৬ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০৯ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৭ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১২৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ