আজ মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

আহা তরুণ, তোর ‘ক্ষ্যাত’ মুখ!

আলমগীর শাহরিয়ার  

জীবন যাপন করা কতোটা অসহনীয় উঠলে মানুষ আত্মহননের পথ বেঁচে নেয়-ঠিক জানা নেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ নামে যে ছেলেটি পুরান ঢাকার এক মসজিদের ছাঁদ থেকে লাফিয়ে পড়ে নিজের জীবনের সব লীলাখেলা সাঙ্গ করে চিরতরে চলে গেছে- সে নিশ্চয়ই জানত।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কাছে শুনেছি, যুদ্ধে নাকি সবাই যায় দলবেঁধে, কিন্তু পালায় একা। জীবন যদি যুদ্ধ হয় কিংবা উৎসব-সে যুদ্ধ ও উৎসবে আমরা সবাই লড়ছি, হতোদ্যম হচ্ছি আবার জিতে গিয়ে কখনো উদযাপন করছি। কিন্তু অন্তিমে, আখেরে সবাই পালাই একাই। কেননা মৃত্যুই মানুষের জীবনের অমোঘ নিয়তি।

তরুণের জীবনযুদ্ধ থেকে পালানোর ঘটনাটিও স্বাভাবিক ছিল না। ছিল বড্ড অস্বাভাবিক, অসময়ের। কিন্তু কেন এই আত্মহনন?

জানা যায়, আর আট-দশটি ছেলের মেয়ের মত তরুণও বুক আর চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে এই করুণ শহরে এসেছিল। ছোটবেলা মাকে হারিয়েছিল। মায়ের মমতাহীন, জাগতিক শ্রীহীন এক দুঃখের জীবন ছিল তার। অভাব-অনটন নিত্য লেগেই ছিল, ক্ষেত থেকে আসা মজুরের পোলার চেহারায় সেই ছাপ স্পষ্ট ছিল! শহুরে সম্ভ্রান্তরা, নাক উঁচু বিদ্যায়তনে পড়ুয়ারা নিরাপদ দুরত্বে থাকত। তাদের স্মার্টফোনের আকর্ণবিস্তৃত সেলফিতে ওর কালো 'ক্ষ্যাত' মুখ বড় বেমানান ছিল। মুখ ফুটে বলত না কিন্তু ওরা হাবভাবে বুঝিয়ে দিত। বন্ধু ভাবা দূরে থাক নিরাপদ দুরত্ব বজায় করেই শেষ নয়, সুযোগ পেলেই ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর উপহাস করতে কসুর করত না (উপরন্তু ছিল ফিনান্সের মত কঠিন বিষয় অধ্যয়নের চাপ, কুলিয়ে উঠতে না পেরে বিভাগ বদলাতে চেয়েছিল ছেলেটি আর ছিল অসহনীয় আর্থিক টানাপোড়েন)।

ধানসিঁড়ি নদী, হেমন্তের মাঠ, মাছরাঙা পাখিটারে নিয়ে উচ্ছ্বাস করা রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ তাদের কাছে অপাংক্তেয়, যেমন অপাংক্তেয় ঠেকে রবীন্দ্র হৃদয়ে বাঙালির হাজার বছরের সঞ্চিত আবেগ মন্থিত গান, "ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কি দেখেছি মধুর হাসি। কি শোভা কি ছায়া গো, কি স্নেহ কি মায়া গো কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে নদীর কূলে কূলে। মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো" যে দেশের জাতীয় সংগীতে দেশকে মায়ের সঙ্গে তুলনা, মওসুমের ভরা ক্ষেত-কে মায়ের সমৃদ্ধি, সুখ ও শান্তির প্রতীকতুল্য মধুর শব্দ হিসেবে দেখানো হয়েছে সেটাকে উপহাসের কুৎসিত অস্ত্র করে তুলল- এ কেমন উন্নাসিক প্রজন্ম!

যে দেশের কৃষি এখনও অর্থনীতির প্রাণভোমরা, যেদেশের কবি গান গায় সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা -সেদেশে কৃষকের মজুরের ছেলেকে 'ক্ষ্যাত' বলে উপহাস করে, বর্ণবাদের অস্ত্র বানায় এরা কোন শ্রেণি ও গোত্রের? জানতে ইচ্ছে করে। এদের শিক্ষা এদেশের মাটি, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভূগোল, আউল বাউল মরমিয়া মন-মনন, স্বাধিকারের লড়াই সংগ্রাম ও স্বপ্ন থেকে বিচ্যুত কিনা ভেবে দেখা দরকার।