আজ বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০১৯ ইং

কিশোর-বিদ্রোহীদের অবাক সূর্যোদয়

মাসকাওয়াথ আহসান  

ইন্টারযুগের বিশ্বনাগরিক প্রজন্ম একটি সভ্য সমাজে বসবাস করার জন্য আকুল। চোখের সামনে বন্ধুর মৃত্যু দেখেও তারা চুপ করে থাকবে; স্থানীয় ভিলেজ পলিটিক্সের সেই বহু ব্যবহারে জীর্ণ "ধামাচাপা" কৌশলকে তারা নিঃশব্দে মেনে নেবে; এ এক আউটডেটেড বা অচল চিন্তা।

রাজনৈতিক মদদে বেপরোয়া ঘাতক বাসের চাকার নিচে পিষে যাওয়া কিশোর-কিশোরীর মৃতদেহের কথা ভুলে গিয়ে মাঝ-বয়েসি আপোষে অমেরুদণ্ডি প্রজন্ম বেশ হেসে-হেসে চাঁদের দেশে যাওয়ার গল্প শুনে মাথা নাড়াতে পারে; কারণ তাদের চাকরিটা, ঠিকাদারিটা, ধান্দাটা এই "সহমত" বলে ডিমের খোসার মতো মাথা নাড়ানোর সুতোয় বাঁধা। এইসব বিবেক বর্জিত আকাশ-কুসুম উন্নয়নের ঠাকুরমার ঝুলিতে আটকে থাকা উপমানবের সময় অতিক্রান্ত।

সূর্যসেন, রফিক, বরকত, বঙ্গবন্ধু, নূর হোসেনের গভীর আত্মত্যাগ যখন বাজারে বিকোয়; নবীন কিশোর তখন সেই কিংবদন্তির পূর্বপুরুষের দ্রোহের আগুন বুকে নিয়ে প্রমিথিউসের মতো ঘুরে দাঁড়ায়। লাইসেন্সহীন পুলিশের গাড়িতে লিখে দেয় "লাইসেন্স" নেই। আইন ভাঙলে কাউকে ছাড় দেয় না তারা। মন্ত্রীর গাড়ি ফেরত পাঠায় অভ্যাস বশত আইন ভেঙে রাস্তার উলটো পাশ দিয়ে আসার অপরাধে। লাইসেন্সহীন পুলিশের গাড়ি তখনো বুঝতে পারে না কিশোর বিদ্রোহের শক্তি। এতোদিন যত্রতত্র উপায়হীন নাগরিকদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করে; বিনা বিচারে হত্যা করে বেপরোয়া তারা।

সভ্যতার শেষ বিবেচনাটুকু আর মনুষ্যত্বের বোধ হারিয়ে পুলিশ স্কুল ছাত্রকে পিটিয়ে তার স্কুল ইউনিফর্ম লাল রক্তে ভেজায়; কিশোরটির জুতো জোড়ায় চাপ চাপ রক্ত জমাট বাঁধে। পুলিশ বাহিনীর হাতে বাংলাদেশের কিশোরের রক্তের দাগ লেগে যায়। এই কিশোরেরা তবু আত্মবিশ্বাস হারায় না; যেসব জায়গায় পুলিশ মানুষের মতো আচরণ করে; তাদের প্রতি তারা মানবিক হয়। দ্রোহকালেও ঠিকই দায়িত্ব নিয়ে কিশোরেরা রোগীবাহী এম্বুলেন্সকে রাস্তা করে দেয়। কোথাও কোথাও অবস্থান ধর্মঘটে অচল রাজপথের ময়লা পরিষ্কারও তারা নিজ হাতে করে।

ঘরে ঘরে আপোষ; শুকনো কথায় চিঁড়ে ভেজানোর ছল; সলিম বুঝ; শতাব্দী প্রাচীন মধ্যস্বত্বভোগীদের চন্দ্রসুখ। অথচ এই কিশোরেরা চন্দ্রাহত; কারণ বাসের নিচে পিষ্ট বন্ধু রাজীবের বরফ ঢাকা মৃতদেহটি নৌকা করে চৌমুহনীর পারিবারিক কবরস্থানের পথে; অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে মা তাকে ঢাকার একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছিলেন। রাজধানীর মাফিয়ারা মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিলো সন্তানের মৃতদেহ।

তাই তো বিদ্রোহী কিশোরেরা আর কাউকে বিশ্বাস করে না। এই সাপ-সংকুল জঙ্গলে হিংস্র বাঘ-ভালুকের থাবা থেকে বাঁচতে সে নিজে ছাড়া আর কেউ নেই পাশে। তারা দেখেছে রাজনীতির "গেম অফ থ্রোনস"। কাঁটার সিংহাসনকে চিরস্থায়ী পুষ্প সিংহাসন বানানো ছাড়া আর কোন লক্ষ্য নেই এই রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থার।

যুগের পর যুগ এদল-ওদলের ঠগি নেতারা তরুণদের পথে নামিয়ে তাদের রক্ত পান করে চর দখলের লড়াই করে এই গহীন বালুচরে। রাজনীতি; ক্ষমতার ইউনিফর্ম যেন বিনা বিচারে মানুষ হত্যার লাইসেন্স। অথচ লাইসেন্স নেই দেশ চালানোর; ঠিক লাইসেন্স বিহীন ঘাতক বাস-ট্রাকের মতোই।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিশোর দ্রোহের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যানবাহন শ্রমিকেরা; এ যাত্রা কিছু শ্রমিক-চালককে শাস্তি দিয়ে যদি ধামাচাপা দেয়া যায় সড়কে চলমান গণহত্যার খলনায়কদের। মরলে শ্রমিক মরবে; তবু রাজপ্রাসাদের চন্দ্রসুখের আসরে যেন আঁচ না লাগে। বেপরোয়া শ্রমিক "বিদ্রোহী কিশোরে"র ওপর দিয়ে পিক-আপ চালিয়ে দেয়। ভাগ্যক্রমে সে বেঁচে যায়।

ঠগিদের দলদাস পাটোয়ারীরা কখনো কখনো কিশোরের মৃত্যু ও রক্তাক্ত হবার ঘটনায় শোক প্রকাশের অভিনয়ের ছলে সাধারণ মানুষের মিছিলে মিশে যাবার চেষ্টা করলেও; ঠগিসমাজের একে ওকে অভি-নন্দন জানানোর কথা ভোলেনা। ঠগিদের নিলামে নেয়া বাজারের দখল নিয়ে চিন্তিত হয়। মিথ্যাবাদী রাখালের মতো বার বার বলে, বাঘ এসেছে এসেছে। প্রত্যাখ্যাত মিথ্যার ঠিকাদার হয়ে অবাক হয়ে দেখে বিদ্রোহী কিশোরদের আন্দোলনের স্লোগানগুলো।

নিষ্ক্রিয় মধ্যবিত্ত সারাজীবন পড়ে পড়ে মার খেয়ে; নিজের স্বাধীনতাটুকু ঠগিদের কাছে বন্ধক রেখে শুধুই গুমরে কেঁদেছে। তবু অন্যায়কে অন্যায় বলে তীব্র প্রতিবাদের শক্তি পায়নি। অথচ বুঝতে পারে না সরকারের পুলিশ কিংবা ক্যাডারদের হাতে মুখ বুজে মার খেয়ে খেয়েই আজ তাদের সন্তানের গায়ে হাত তোলার সাহস যুগিয়েছে তারা।

ভয়ের রাজনীতির গুম-জনপদে নিজভূমে পরবাসী মানুষ ভয়ে ভয়ে জীবন্মৃত। সন্তানের কণ্ঠে অবাক সূর্যোদয় দেখে আবার স্বপ্ন দেখে। সন্তানের কাছে সভ্যতার উত্তরণ প্রত্যাশা করে।

কিন্তু এইসব দুঃসাহসী কিশোর-কিশোরীকে দশমাস গর্ভে ধারণ করেছেন যে মায়েরা; তাদের নির্ঘুম রাত কাটে; সন্তান পথে না খেয়ে আন্দোলন করছে; মায়ের গলা দিয়ে খাবার নামে না। নিহত রাজীবের মা গ্রাম থেকে ঢাকায় ছুটে এসে রাজীবের থাকার ঘরময় ছেলের স্মৃতি খুঁজতে থাকেন। ঘরময় কে যেন ফিস ফিস করে বলছে, "মা তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়ন জলে ভাসি"।

মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৮ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৪ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৬৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৪৩ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৪ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ৯৮ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১০৬ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৮৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৩ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ