আজ বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৯ ইং

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মৃত্যু

মাসকাওয়াথ আহসান  

২০০৪ সালের একুশে আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জনসভায় জঙ্গি গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মীর নিহত হওয়া ও অসংখ্য মানুষ আহত হবার ঘটনা বাংলাদেশকে শোকাচ্ছন্ন করেছিলো। ক্ষমতাসীন বিএনপি তার একদলীয় শাসন ব্যবস্থাকে পাকাপোক্ত করতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ও কর্মীদের হত্যার লক্ষ্যে হুজি জঙ্গি গোষ্ঠীকে লেলিয়ে দিয়েছিলো; জঙ্গি গ্রুপ হুজি'র শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নানের সাক্ষ্যে এ তথ্য বেরিয়ে আসে। বলাই বাহুল্য হুজি জঙ্গি গ্রুপটি ছিলো জামায়াত ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলের আশীর্বাদপুষ্ট। অথচ বিএনপি দাবী করেছিলো, আওয়ামী লীগ জনসহানুভূতি পেতে নিজেরাই নিজেদের জনসভায় এ হামলা চালিয়েছে। বিএনপি-জামাত শাসনামলে সংঘটিত এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় বিএনপির রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটে। মানবতার এ বিপর্যয়ে দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এরকম নৈতিকতাহীন ঘাতক রাজনৈতিক দলের ওপর আর নির্ভর করা যায় না। তারা ভরসা খোঁজে আওয়ামী লীগের মাঝে। বিএনপির পতন ছিলো তখন কেবল সময়ের ব্যাপার।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর বিএনপি-জামাত যে সময়টুকু ক্ষমতায় ছিলো; রাজনৈতিক দলের প্রেতায়িত আত্মা হিসেবেই তারা ক্ষমতায় ছিলো। তাদের দাঁতে-নখে ছিলো রক্তের দাগ।

ইতিহাসের নির্মম ট্র্যাজেডি হচ্ছে; রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের জনসাধারণ যে আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভর করেছিলো; সেই রাজনৈতিক দলটি আজ যখন একুশে আগস্টের শোক পালন করছে; তখন কার্যত রাজনৈতিক দলটির নৈতিক মৃত্যু ঘটেছে। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসব্যাপী স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের লেলিয়ে দেয়া পুলিশ কিশোরকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে তার সাদা স্কুল ড্রেস- কিশোরের সাদা জুতা জোড়ায় জমাট বেধেছে চাপ চাপ রক্ত; লুঙ্গি পরে 'সরকারি স্বেচ্ছাসেবক সংঘ' পুলিশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছে কিশোর-কিশোরীর বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের পেটমোটা মাঝবয়েসী ক্যাডার কিশোর-কিশোরীদের ওপর হামলায় রাজপথে নেমেছে। ছাত্রলীগের ক্যাডার এসে হামলা করে বন্ধ করে দিয়েছে প্রাইভেট টিভির লাইভ কাভারেজ। সাংবাদিকদের ওপর প্রকাশ্যে হামলা করেছে 'সরকারি স্বেচ্ছাসেবক সংঘের' হেলমেট পরা সন্ত্রাসীরা। সাংবাদিকের ক্যামেরা ভেঙে ফেলেছে; সব অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলতে। মানবতার এ বিপর্যয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি শিশু-কিশোর-তরুণ এখন আওয়ামী লীগ ভীতির মধ্যে বসবাস করে। ঠিক যেরকম বিএনপি ভীতির মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ বসবাস করতো ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার পরে।

বিএনপি যেভাবে আওয়ামী লীগের ওপর হামলার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছিলো; কাল্পনিক অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে হাজির করেছিলো জজ মিয়া নামের এক নির্দোষ মানুষকে; ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগ সাম্প্রতিক শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার জন্য দায়ী করেছে শিক্ষার্থীদের ও তাদের আন্দোলন সমর্থকদের প্রচারিত "গুজব"-কে। আর এই চাপিয়ে দেয়া অভিযোগের ভিত্তিতে তারা তুলে নিয়ে গেছে তরুণ-তরুণীদের। এই শঠতা আর নির্মম ছলচাতুরি দুটি দলেরই রাজনৈতিক মৃত্যু সূচিত করেছে একে একে। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের প্রেতায়িত আত্মা হিসেবেই এখন ক্ষমতায় আছে। ২০০৪ সালের একুশে আগস্টের পর ঠিক যেমন ছিলো বিএনপি।

সাধারণ মানুষ খুব স্পষ্টভাবে বুঝে গেছে; তাদের ভরসার আর কোন জায়গা নেই। ধর্মীয় কট্টরপন্থার জামায়াত বিষবৃক্ষটিকে বিএনপি লালন করেছিলো যেভাবে; ঠিক একইভাবে ধর্মীয় কট্টরপন্থার হেফাজত বিষবৃক্ষটিকে লালন করেছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চিরস্থায়ী করার সর্বনাশা নেশায়; মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারের সাম্য, মানুষের মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার কিংবা অসাম্প্রদায়িকতা--এসব এখন কেবলই স্মৃতি।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র চোখের সামনে সহপাঠীদের কোটা-সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রলীগের কাছে কিল-চড়-ঘুষি-লাথি খেতে দেখে, সরকারি সন্ত্রাসীদের হাতুড়ির আঘাতে সহপাঠীর মেরুদণ্ড ভেঙে যেতে দেখে; নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে কিশোর-কিশোরীর প্রতি নিষ্ঠুরতা দেখে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের দড়ি বেঁধে কোরবানির পশুর মতো প্রিজন ভ্যানে করে তুলে নিয়ে যেতে; "গুজবে"-র অভিযোগে পছন্দমতো তরুণীদের বেছে নিয়ে পুলিশ রিমান্ডের অনিরাপদ পরিবেশে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত রেখে দিতে দেখে গভীরভাবে উপলব্ধি করে, এ আঁধার থেকে ফেরার পথ নেই; মুক্তির পথ নেই। ফেসবুকে সুইসাইড নোট লিখে বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহনন করে তরুণ। একটি নতুন প্রজন্মের স্বপ্নভঙ্গের শোকগাথা এই সুইসাইড নোট।

এই একুশে আগস্টে গভীর শোকে স্মরণ করছি; ২০০৪ সালে গ্রেনেড হামলায় নিহত ও আহত অবস্থায় বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষদের। সমবেদনা জানাচ্ছি ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের কোটা-সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন চলাকালে হামলায় রক্তাক্ত আর গভীর ভীতি ও নৈরাশ্যের মাঝে জীবন্মৃত শিশু-কিশোর-তরুণকে।

মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৫ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭১ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১০ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ