আজ রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৯ ইং

ভিকারুননিসা হোক শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্কুল

শিতাংশু গুহ  

দশ বছরের মাথায় শিক্ষামন্ত্রী অরিত্রী মৃত্যু ঘটনায় বেশকিছু সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাকে ধন্যবাদ। শিক্ষা দপ্তর সংশ্লিষ্ট ৩ শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছে। তাদের এমপিও বাতিল হয়েছে। পুলিশ এক শিক্ষিকাকে গ্রেপ্তার করেছে, বাকি দুইজনকে খুঁজছে।

অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যা প্রমাণ করে যে, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমস্যা আছে এবং এর আমূল পরিবর্তন দরকার। এ মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত। এক কিশোরী কতটা অপমানিত হলে আত্মহননের পথ বেছে নিতে পারে, এটি ভাবতে হবে? শিক্ষার্থীরা জীবন গড়ার জন্যে স্কুলে যায়, লাশ হয়ে ঘরে ফেরার জন্যে নয়?

অরিত্রীর আত্মহত্যা জাতিকে নাড়া দিয়েছে। অরিত্রী মরে নিজের লজ্জা ঢাকতে চেয়েছে, কিন্তু তার মৃত্যু জাতিকে লজ্জায় ফেলে দিয়েছে। জানা যায়, ২০১২-তে ভিকারুননিসার শিক্ষকদের রূঢ় মন্তব্যে চৈতি রায় নামে আর একটি বালিকা আত্মহত্যা করেছিলো।

অরিত্রীর বাবা-মা-কে স্কুল ডেকেছিলো, মেয়েকে সাথে নিয়েই তারা স্কুলে যান। সেখানে এমন কিছু ঘটেছে যাতে একটি পঞ্চদশী নাবালিকা পিতামাতা ঘরে ফেরার আগেই বাড়ি এসে আত্মহত্যা করে। নিজের বা পিতার অপমান কি এতটাই অসহ্য ছিলো যে, তাকে রাগে-অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হলো?

স্কুলে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিলো তা জানা দরকার। স্কুলের অধ্যক্ষা বা সংশ্লিষ্টরা এর দায় এড়াতে পারেন না? অরিত্রী আত্মহত্যা করেনি, স্কুল কর্তৃপক্ষের উন্নাসিকতা তাকে আত্মহননে প্ররোচিত করেছে। আশির দশকে ভিকারুননিসা কলেজ সেকশনে দু’একবার এক্সটারনাল হিসাবে গিয়েছিলাম। তাদের উন্নাসিকতা তখনো ছিলো।

তখন ভাবতাম, স্কুলটার নাম এমন কেন? পাকিস্তানের এক প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খাঁন নুনের স্ত্রীর নামে এই স্কুল। দেশ স্বাধীন হয়েছে, দৈনিক পাকিস্তান হয়েছে দৈনিক বাংলা, পাক মোটর হয়েছে বাংলা মোটর, কিন্তু স্কুলের নামটি পরিবর্তন হয়নি? এখন হলে কেমন হয়? শাহিদ জননী জাহানারা ইমাম স্কুল?

হাই কোর্ট ভিকারুননিসা স্কুলের ছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে হৃদয় বিদারক বলে বর্ণনা করেছেন। রিট হয়েছে। অরিত্রীর বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন। ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রী স্কুলে যান এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের তোপের মুখে পড়েন।

স্বজনরা বলছেন, স্কুলের শিক্ষকদের কাছে বাবার অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে অরিত্রী। শিক্ষকরা বলেছেন, বাবার অপমান নয়, পরীক্ষায় নকল করে ধরা পড়ে লজ্জায় এ ঘটনা ঘটিয়েছে অরিত্রী। অধ্যক্ষা হাতজোড় করে ক্ষমা চেয়েছেন।

অরিত্রী ও তার বাবা অধ্যক্ষার পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তিনি ক্ষমা করেননি। বরং পরদিন গিয়ে টিসি নেয়ার পরামর্শ দেন? অধ্যক্ষা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির যেই সদস্য ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন, তিনি কে এবং তার ভূমিকা জানা দরকার।

ধরে নেয়া যাক, অরিত্রী নকল করছিলো, কিন্তু এর শাস্তি তো মৃত্যু হতে পারেনা? স্কুল তো বাঁচতে শিখায়, মরতে না? অধ্যক্ষা একটি বালিকাকে ক্ষমা করতে পারেননি, সেখানে জাতি তাকে ক্ষমা করে কিভাবে? অথচ স্কুলের একটু ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি একটি জীবন বাঁচাতে পারতো।

স্কুলে চরম অপমানের পর মেয়েকে একা বাসায় যেতে দেয়াটা ঠিক হয়নি। স্কুল কর্তৃপক্ষ অরিত্রীর ক্ষেত্রে ‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি’ দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। অধ্যক্ষা অরিত্রীকে টিসি দিতে পারেননি, বরং অরিত্রী সমাজকে টিসি দিয়ে চলে গেছে।

অরিত্রীর বাবা স্কুলে অপমানে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিশ্চয় স্কুলে আরও কিছু ঘটেছে যা পিতাকে কাদায়, কন্যাকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়? স্কুলের অধ্যক্ষা ও উপাধ্যক্ষা কন্যার সামনেই তার বাবাকে অপমান করতে পারলেন?

এ সময় নাকি একজন শিক্ষিকা অরিত্রীর বাবাকে যা-ইচ্ছে তাই ভাবে অপমান করেন। ইহা কি সত্য? এটি কি চরম অবজ্ঞা নয়? একজন শিক্ষিকার কাজ কি একজন পিতাকে অপমান করা? ভিকারুননিসার শিক্ষকরা নিজেদের কী মনে করেন? হয়তো এ কারণে হাই কোর্ট বলেছেন, শিক্ষকদেরও মানসিক কাউন্সেলিং দরকার।

হাই কোর্টে রিট হয়েছে। কোর্ট পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্কুল তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। কেউ কেউ এটাকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলতে চাচ্ছেন। অধ্যক্ষাকে ‘খুনি’ হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। স্কুলের ছাত্রীরা এবং অভিভাবকরা বিক্ষোভ করছেন।

অনেকে এটিকে ক্ষমতার দাপট হিসাবে দেখতে চাইছেন। যে যাই বলুন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা চাই। শিক্ষকতা পেশা শুধু একটি পেশা নয়, এরসাথে মানবিকতা, দায়বদ্ধতা, সততা থাকতে হয়। বিশেষত: ছোট ক্লাসের শিক্ষকদের তো বাচ্চাদের বন্ধু হতে হয়?

ছাত্র জীবন হচ্ছে একজন মানুষের উৎকৃষ্ট সময়। আমেরিকায় দেখি বাচ্চারা স্কুলে যাবার জন্যে পাগল। শিক্ষকরা তাদের বন্ধু। যাহোক, অরিত্রী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যতে আর কোন শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যা করতে না হয়?

অরিত্রী চলে গেছে, কোন প্রতিকারই তাকে আর ফিরিয়ে আনবে না? তবু তার চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জীবন সুন্দর হোক।

শিতাংশু গুহ, কলাম লেখক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৬ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭১ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৫ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫৩ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১১ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ