আজ মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

আমাদের মোনাজাতউদ্দিন

ফজলুল বারী  

আমার পায়ে হেঁটে বাংলাদেশ ভ্রমণের সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংবাদিকদের কাছে মোনাজাতউদ্দিনের নাম-খ্যাতি শুনি। আমাকে তাদের অনেকে বলেন আমার কাজটা নাকি অনেকটা মোনাজাতউদ্দিনের মতো। পার্থক্য শুধু মোনাজাতউদ্দিন যানবাহন ব্যবহার করেন। আমি করিনা। ওই সময়ে আমি রংপুর যখন পৌঁছি তখন মোনাজাত ভাই’র খোঁজ করি। কিন্তু তিনি তখন রংপুরে না থাকায় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। মোনাজাত ভাই’র সঙ্গে প্রথম দেখা হয় ঢাকায় বিচিন্তা অফিসে। ৪১/২ দিলু রোডের সেই অফিসেই থাকতাম আমি। মোনাজাত ভাই আমাকে বলেন তিনি আমাকে দেখতে এসেছেন। কারণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাংবাদিকদের কাছে তিনি আমার কথা শুনেছেন। তাঁর সেই কথায় আমার চোখে পানি চলে আসে। যিনি আমার স্বপ্নপুরুষ সাংবাদিক তিনিই নাকি দেখতে এসেছেন আমাকে! আমি মোনাজাতউদ্দিনকে বলি, আমি তাকে আজ খাওয়াবো। আমরা সব রিপোর্টাররা তখন অফিসেই খাই। আমার সম্পাদক মিনার মাহমুদ আমাকে বলেন, আপনি মোনাজাত ভাইকে খাওয়াতে পারবেননা। কারণ মোনাজাত ভাই যে কড়া বিষ খান তা আপনি দিতে পারবেননা। কড়া বিষটা কী তা আমি জিজ্ঞেস করিনা। আরেকদিন দেখা হবে কথা হবে বলে মিনার মাহমুদের সঙ্গে বেরিয়ে যান মোনাজাতউদ্দিন। সেই প্রথম দেখা।

মোনাজাত ভাই’র সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয় মূলত প্রিয় প্রজন্ম অফিসে। ৭৬ সেগুনবাগিচার নীচতলায় বিশাল এক পাঁচকক্ষের অফিসে আমাদের প্রিয় প্রজন্ম অফিস। পত্রিকাটির প্রাণ পুরুষ প্রভাষ আমিন, রোকন রহমান, নঈম তারিকরা মূলত অফিসে থাকেন। এখানেও প্রতিদিন বাজার-রান্না খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। শুধু প্রিয় প্রজন্মের কর্মীরা না, ঢাকার অনেক সাংবাদিক-রাজনৈতিক কর্মীরাও অনেকে এখানে দুপুরে খেতে আসতেন। অফিস ভবনের মাঝখানটায় বড়সড় হলরুম। সেখানেই ডাইনিং কাম মিটিং টেবিল। ঢাকা এলে মোনাজাত ভাই দিনের বেশিরভাগ অংশ এই টেবিলটার দখল তাঁর কর্তৃত্বে রাখতেন। সংবাদ অফিস কাছেই। তাই এখানেই বসে তিনি লিখতেন। আর শিক্ষকতা করতেন সাংবাদিকতার। প্রিয় প্রজন্মের কর্মী বাহিনীর সাংবাদিকতার শিক্ষক ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। আরেকজন ছিলেন। তিনি তখনও অতোটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেননি। কিন্তু তাঁর ভিতরের আগুনছটা তখনি আমরা টের পেতাম। প্রিয় প্রজন্মের মাঝের দুটি পাতার কর্তৃত্ব নিয়ে তিনি বের করতেন ‘অণু প্রজন্ম’। পত্রিকার ভিতর পত্রিকা! অণু প্রজন্মের সম্পাদক ছিলেন তিনিই। তিনি সঞ্জীব চৌধুরী। দলছুটের গায়ক হিসাবে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা পান তাঁর অকাল মৃত্যুর পর। ভোরের কাগজের মেলা’ যেটি পরে  তুমুল জনপ্রিয় হয় এর ভিত্তি ছিল ‘অণু প্রজন্ম’।

প্রিয় প্রজন্মের জনপ্রিয় অংশ ছিল প্রিয় প্রজন্ম পার্লামেন্ট। রাজনীতিকরা এই পার্লামেন্টে এসে তুলোধুনো হতেন প্রিয় প্রজন্ম বাহিনীর প্রশ্নবাণে। পার্লামেন্টের পুরো কার্যক্রম ছাপা হতো পত্রিকায়। সে জন্যে তুলোধুনো রাজনীতিকরা আর দ্বিতীয়বার এখানে আসতে চাইতেন না। মোনাজাতউদ্দিন, সঞ্জীব চৌধুরীও থাকতেন প্রিয় প্রজন্ম পার্লামেন্টে। মাঝে মাঝে এমন সরল প্রশ্নও তিনি করতেন যেন আজই সাংবাদিকতায় এসেছেন। এমন শিশু সুলভও ছিলেন আমাদের বিশাল দুই মানুষ মোনাজাতউদ্দিন এবং সঞ্জীব চৌধুরী। আর্থিক কারণে প্রিয় প্রজন্ম বন্ধ হয়ে গেলে ভেঙ্গে যায় আমাদের সেই সংসার। এরপর আমি এখানে সেখানে অনেকদিন লিখেছি। এরমাঝে সাপ্তাহিক খবরের কাগজে মিডিয়া নিয়ে লিখতাম নিয়মিত।
 
শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলের নেত্রী। একবার তাঁর সঙ্গে আমরা দহগ্রাম-অঙ্গারপোতা গেলাম। তিন বিঘা করিডোরের কারণে দহগ্রাম-অঙ্গারপোতা তখনও বিচ্ছিন্ন জনপদ। শেখ হাসিনার সেই বহরে তাঁর গাড়ির পিছনের গাড়িতেই ছিলাম আমি সহ কয়েক সাংবাদিক। বহরের শেষের দিকের একটি গাড়িতে ছিলেন মোনাজাতউদ্দিন। শেখ হাসিনা যাবেন এই খবর পেয়ে ভারতীয় বিএসএফ আগেই করিডোরের গেট খুলে রেখেছিল। বিএসএফ সেখানে শেখ হাসিনাকে গার্ড অব অনার দিতে চায়। নেত্রী গাড়ি থেকে নেমে তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন তিনি ফেরার সময় গার্ড অব অনার নেবেন। তাঁর পিছনের গাড়িতেই থাকায় এই তথ্যটির আমরা সামনাসামনি সাক্ষী। কিন্তু মোনাজাত ভাই অনেক পিছনের গাড়িতে থাকায় আসল ঘটনা সম্ভবত বুঝতে পারেননি।

তাঁর পত্রিকায় এ নিয়ে তাঁর রিপোর্টের শিরোনাম হয়, ‘তিন বিঘা করিডোরের গেট বন্ধ থাকায় আটকে গেলো শেখ হাসিনার গাড়ির বহর’। মিডিয়ার এসব ভুল ক্রটি নিয়ে আমি লিখতাম খবরের কাগজে। মোনাজাত ভাই’র এই ভুল রিপোর্ট নিয়ে আমি খবরের কাগজে লিখেছিলাম। তিনি গুরু আমি শিষ্য। এ যেন আমার গুরুমারা বিদ্যা! শিষ্যের এই ভূমিকা হয়তো পছন্দ করেননি মোনাজাত ভাই। ওই ঘটনার পর তিনি অনেক দিন আমার সঙ্গে কথা বলেননি।

দৈনিক সংবাদের মোনাজাতউদ্দিনকে বেশি বেতনে জনকণ্ঠ নিজের টিমে নিয়ে আসে। জনকণ্ঠে থাকতেই তিনি ফেরি দুর্ঘটনায় মারা যান। কিন্তু মোনাজাত ভাই সংবাদে যেমন স্বচ্ছন্দ ছিলেন জনকণ্ঠে সে রকম ছিলেননা। জনকণ্ঠের চরিত্রের কারণে তাঁর রিপোর্ট খুব কম প্রথম পাতায় ছাপা হতো। রংপুরের সাংবাদিক আমান-উদ-দৌলা ছিলেন জনকণ্ঠের কূটনৈতিক সংবাদদাতা। মোনাজাত ভাই তাঁর তখনকার কষ্ট শেয়ার করতেন আমান ভাই’র সঙ্গে। একবার আমান ভাইকে এক চিঠিতে লিখেন, ‘আর কিভাবে লিখলে আমার রিপোর্ট জনকণ্ঠের লিড নিউজ হবে’?

মর্মন্তুদ এক ফেরী দুর্ঘটনায় মোনাজাতউদ্দিনের হঠাৎ মৃত্যু হলে জনকণ্ঠ থেকে ডাক পাই আমি। পত্রিকার প্রাণপুরুষ উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খানকে রিপোর্টিং মিটিং’এ বলা হয় মোনাজাতউদ্দিনের শূন্যস্থান নাকি আমিই পূরণ করতে পারবো। ১৯৯৬ সালের ১১ মে আমি যোগ দেই জনকণ্ঠে। যোগ দিয়েই আমাকে রিপোর্টিং’এ পাঠানো হয় ঢাকার বাইরে। কিন্তু তখনই টের পাই মোনাজাতউদ্দিনের কষ্টের মাত্রা। দেশে তখন নির্বাচনী ডামাডোল। ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আসে আওয়ামী লীগ। সেই সময় ঢাকার বাইরে এক সপ্তাহ কাটাবার তখন একদিন তোয়াব ভাইকে ফোন করে বলি, নির্বাচনের রিপোর্ট করতে আমি ঢাকায় ফিরতে চাই। সঙ্গে সঙ্গে আবেদন মঞ্জুর হয়। ঢাকায় ফিরিয়ে এনে কখনো শেখ হাসিনা-কখনো খালেদা জিয়ার বহরের সঙ্গে আমাকে পাঠানো হতো। মোনাজাতউদ্দিনের শূন্যস্থানে যোগ দিলেও আমি এভাবে চলে আসি পত্রিকাটির মেইন স্ট্রিম রিপোর্টিং’এ।

 বিভিন্ন সময়ে ইস্যু ভিত্তিক আমাকে ঢাকা বা দেশের বাইরেও পাঠানো হতো। যেমন মৌলভীবাজারের মাগুরছড়ার গ্যাসক্ষেত্র দুর্ঘটনার পর আমি সেখান থেকে টানা তেরদিন রিপোর্ট করেছি। টানা তেরদিন আমার রিপোর্ট তখন জনকণ্ঠে লিড হয়েছে। আবার মাগুরছড়া থেকে ফেরার পর আমাকে পাঠানো হয়েছে মিশরে-জর্দানে। ফিলিস্তিনের ইন্তিফাদা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তাল এক পরিস্থিতি চলছিল। আবার ইরাক থেকে ফেরার পর ইলিশের রিপোর্ট করতে পাঠানো হয় চাঁদপুরে।

এভাবে সব সময় মেইন স্ট্রিমের মূল রিপোর্টের পিছনে ছুটে আমি প্রতিদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় থাকতাম। আমি আমার প্রিয় প্রজন্ম রিপোর্টারদের বলি, সব সময় হাল চলতি আলোচিত মূল রিপোর্টের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করবে। তোমাদের রিপোর্ট কেউ একসেস বা বাদ ফেলে রাখতে পারবেনা। কিন্তু এভাবে কাজ করে গেলেও আমরা কেউ মোনাজাতউদ্দিন হতে পারিনি। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে দ্বিতীয় কোন মোনাজাতউদ্দিনের সৃষ্টি হয়নি। কারণ মোনাজাতউদ্দিন হাঁটতেন কাদামাটির রাস্তায়। এখন সে রকম কাদামাটির রাস্তা খুব বেশি নেই। আমরা নাগরিক রিপোর্টাররা কাদামাটির রাস্তাও এড়িয়ে চলতে পটু। মোনাজাতউদ্দিন তাঁর জায়গায় তাই আজও অদ্বিতীয়। আজ ১৮ জানুয়ারি আমাদের প্রিয় মোনাজাতউদ্দিনের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন মোনাজাত ভাই। না ফেরার দেশে ভালো থাকুন। খুব ভালো একজন সৎ পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন আপনি।

ফজলুল বারী, প্রবাসী সাংবাদিক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ