আজ মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

আবুল বাজানদারের চিকিৎসা সংগ্রাম

ফজলুল বারী  

ভুল স্বীকার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসায় ফিরে এসেছে বৃক্ষ মানব আবুল বাজানদার। আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা এই নিউজটির লিঙ্ক ঝড়ের বেগে আমার ইনবক্সে দিচ্ছিলেন। কারণ তারা এই চিকিৎসা সংগ্রাম নিয়ে আমার একটি অংশগ্রহণ জানেন।

২০১৬ সালে আমি যে দেশে গিয়েছিলাম, এর অন্যতম কারণও ছিল আবুলকে দেখা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার ইতিহাসে হাসপাতালে সবচেয়ে দীর্ঘতম সময় ধরে থাকা রোগী আবুল এক পর্যায়ে চিকিৎসা নিয়ে তার ব্যক্তিগত হতাশা এবং আরও কিছু কারণে এক সকালে কাউকে না বলে হাসপাতাল থেকে চলে গেলে আইনত ফেরারি হয়। তার এভাবে হাসপাতাল থেকে চলে যাবার ঘটনা আমাদের মধ্যেও হতাশা ও ক্রোধ তৈরি করে।

হাসপাতাল থেকে চলে যাবার পর ডাক্তারদের ভালোটা না বলে যেভাবে শুধু মন্দটা বলছিল তাও আমাদের হতাশা বাড়াচ্ছিল। কারণ আমরা জানতাম তাকে আবার হাসপাতালে ফিরে আসতে হবে এবং তার চিকিৎসা করবেন ডাক্তাররাই। আবুল যে আবার হাসপাতালে ফিরেছে এর পিছনে তার সমস্যাটি প্রায় আগের রূপ নেবার পাশাপাশি ক্ষুধাও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সে তিনবেলা খাবার পাচ্ছিল। চিকিৎসার বাইরে আরও যখন যা লাগতো তা আমরা দিচ্ছিলাম। পরিবারের ভরণপোষণ নিয়েও ভাবতে হচ্ছিলো। একবার বললো, অত হাজার টাকা যদি দেই তাহলে তার বাবা ফলের ব্যবসা করবেন। সে টাকাও দেয়া হয়। কোন চাহিদাই তার অপূর্ণ রাখা হয়নি।  কিন্তু বাড়িতে চলে যাওয়ায় এর সব যোগান বন্ধ হয়। তার ফোনকলও আমরা ধরতাম না। তাই বলা চলে চিকিৎসার পাশাপাশি ক্ষুধা লাগবের জন্যেও সে ফিরে এসেছে হাসপাতালে।

আবুল কিভাবে আমাদের কাছে এসেছিল, তার চিকিৎসার পিছনে আমাদের ভূমিকা এসব মোটামুটি অনেকে জানেন। আবার লিখছি। আমাদের ভূমিকাটি মূলত সোশ্যাল ওয়ার্কারের। বিদেশে যারা থাকেন হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা নিয়েছেন তারা এসব সোশ্যাল ওয়ার্কারদের ভূমিকা জানেন। অস্ট্রেলিয়ার মতো কল্যাণ রাষ্ট্রে এই সোশ্যাল ওয়ার্কারও সরকার থেকে দেয়া হয়। চিকিৎসা দেন ডাক্তাররা। আর সোশ্যাল ওয়ার্কাররা স্বজনহীন রোগীদের নানা সহায়তা সার্ভিস দেন। বাংলাদেশে যেহেতু সোশ্যাল ওয়ার্কার সার্ভিসের সরকারি কোন ব্যবস্থা নেই, আমাদের মতো একটু পাগল টাইপের লোকজন তাদের সহায়তা দিতে গেলে উল্টো একদল প্রশ্ন তোলেন এদের স্বার্থ-ধান্ধাটা কী! প্রশ্ন যারা রাখার তা তারা রাখবেই। আমাদের মতো পাগল টাইপ কিছু সোশ্যাল ওয়ার্কার দেশজুড়ে আছেন বলে অনেক অসহায় রোগী-মানুষ কিছুটা হলেও বেঁচে থাকার অবলম্বন পায়।

আবুলের সন্ধান প্রথম আমাকে দেন খুলনার সাংবাদিক সুনীল চৌধুরী। তিনি এস এ টিভির খুলনা ব্যুরো প্রধান। আবুলের হাত পায়ের কিছু ছবি তিনি আমার ইনবক্সে দিয়ে অনুরোধ করে বলেন তার চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা। সুনীল চৌধুরীর কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে আমি আবুলের সঙ্গে ফোনে কথা বলি। আবুল অস্ট্রেলিয়া থেকে আমার ফোন পেয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আমাকে বলে, চিকিৎসার জন্যে সে দু’বার ভারতে গিয়েছিল। আমি যদি তাকে কিছু টাকা দেই সে আবার চিকিৎসার জন্যে ভারতে যেতে চায়। আমি আবার যে কোন সামর্থ্যহীন মানুষের বিদেশে চিকিৎসার বাইরে চিকিৎসার বিরুদ্ধে। বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় সম্পর্কেও আমাদের দেশের অনেক মানুষের ধারনা কম। আমি আবুলকে বলি আমি দেশে তার চিকিৎসার পথ বের করার চেষ্টা করবো।

আবুলের ছবিগুলো আমি আমাদের বড়ভাই ডা. শরফুদ্দিন আহমদের কাছে পাঠাই। মূলত তার নেতৃত্বেই এখন আমরা এই চিকিৎসা সহায়তার কাজটি করি। শরফুদ্দিন ভাইকে অনুরোধ করে বলি দেখেন এই ছেলেটির চিকিৎসার কী ব্যবস্থা করা যায়। শরফুদ্দিন ভাই আবুলকে ফোন করলে সে একই কথা বলে, টাকা দিলে ভারত যাবে চিকিৎসা করাতে। শরফুদ্দিন ভাই তাকে বলেন, আগে আমরা দেশে চেষ্টা করে দেখি। শরফুদ্দিন ভাই প্রথমে তার খুলনার ডাক্তার বন্ধুদের দিয়ে বোর্ড করিয়ে আবুলকে দেখার ব্যবস্থা করেন। তারা তাকে দেখে রেফার করেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি অ্যান্ড বার্ন ইউনিটের ডা. সামন্ত লাল সেনের কাছে। ডা. সামন্ত লাল সেন শরফুদ্দিন ভাই’রও বিশেষ ঘনিষ্ঠ। খুলনার ডাক্তাররা রেফার করেও তিনিও আবুলের ব্যাপারে ডা. সেনকে বলে রেখেছিলেন। আবুলকে ঢাকায় আনার উদ্যোগ নিতেই আমরা একজন স্বেচ্ছাসেবক পেয়ে গেলাম। আমার প্রিয় প্রজন্ম নিয়াজ মাহমুদ ঢাকায় বাস টার্মিনালে আবুল পরিবারকে রিসিভ করে তোলে চানখাঁর পুলের একটি হোটেলে। এসব ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। আবুল ঢাকা পৌঁছার পর দিন সকালে নিয়াজ তাকে ডা. সামন্ত লাল সেনের কাছে নিয়ে যায়।