আজ শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

কেন প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ায় ছিলেন ফসলের সুষম বন্টন চাওয়া কবি?

আলমগীর শাহরিয়ার  

কবি আল মাহমুদকে আমি প্রথম দেখি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পাঠাগার সিলেটের কেমুসাসে। প্রায় বছর চৌদ্দ আগে। একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে সেদিন পাঠাগারে পড়তে গেছি। অডিটোরিয়ামে চোখ পড়ার পর কাউকে বলতে শুনলাম, ঢাকা থেকে কবি আল মাহমুদ এসেছেন। শুনে একটু কৌতূহল হল। একটু ভালো করে দেখবার জন্য আমি বেশ ক'বার অনুষ্ঠানস্থলে উঁকিঝুঁকি দিলাম এবং অনুষ্ঠান শেষে বেশ কাছ থেকে কবিকে দেখলাম, শুনলাম। দেশের কোন প্রধান কবিকে সেই আমার প্রথম দেখা। ইতোমধ্যে আমার কবির আত্মজীবনী "যেভাবে বেড়ে উঠি"---পড়া হয়ে গেছে। এই মুগ্ধতা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। তবে দেশের একজন প্রধান কবিকে কাছে পেয়ে বেশ কৌতূহল ছিল---সেটাও অস্বীকার করার কোন জো নেই।

বিবিসি বাংলা বছর কয়েক আগে কবি আল মাহমুদকে প্রশ্ন করেছিল, আপনার বিরুদ্ধে অনেকেই অভিযোগ তুলেন আপনি নাকি যুদ্ধাপরাধী জামাতিদের রাজনীতিতে আস্থা রাখেন, পৃষ্ঠপোষকতা পান? অনুষ্ঠানটি সে সন্ধ্যায় আমি শুনছিলাম।---বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম---জামাতিদের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক বা কোন ধরনের যোগসাজশ সে সাক্ষাৎকারে তিনি অস্বীকার করেছিলেন।

আমরা দেখতাম শামসুর রাহমান যখন বেঁচেছিলেন তখন সাবেক কমরেড অধ্যুষিত দেশের একটি প্রধান দৈনিক শামসুর রাহমানকে যে কাভারেজ দিত আল মাহমুদকে অতোটা দিত না এবং তাদের দু'জনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার পরও একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা জিইয়ে রাখত।---কে প্রধান? আল মাহমুদ না শামসুর রাহমান? কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলাম শামসুর রাহমান মারা যাওয়ার পর আল মাহমুদে তাদের মনোযোগ বেড়ে গেল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখলাম তাদের---অখণ্ড মনোযোগ এই কবিকে ঘিরে এবং তিনি তাদের ফুল পেজ কাভারেজ পাওয়া শুরু করলেন। তাদের প্রকাশনা থেকে বের হলো তাঁর আত্মজীবনীমূলক একটি বইও।

আল মাহমুদ রাজনৈতিকভাবে আদর্শচ্যুত ছিলেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছুঁড়তে দেখা গেছে সবসময়। স্বাধীনতা উত্তর বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ঘোর সরকার বিরোধী পত্রিকা হিসেবে খ্যাত "গণকন্ঠ"-পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে কলকাতায় নির্বাসনে থাকা আল মাহমুদ। বঙ্গবন্ধু সরকার উৎখাতে এই পত্রিকার একটা বড় ভূমিকা ছিল। অথচ ৭৫ সালেই বঙ্গবন্ধু তাঁর বরাবরের মত অসীম রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় দিয়ে কবিকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হয়েছিলেন। তার রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় আনুগত্য হওয়া উচিত তাঁর শিল্পচর্চায়। সে আনুগত্য আমৃত্যু তাঁর নিরঙ্কুশ ছিল। এমনকি দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাবার পরও। তাঁর কাব্যপ্রতিভা, লেখকসত্তা নিয়ে কারোর কোন সংশয় নেই। ১৯৬৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে ‘লোক লোকান্তর’ ও ‘কালের কলস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

শোনা যায়, বিএনপি জামানায় জামাতিদের রমরমা অর্থনৈতিক অবস্থায় চরম অর্থকষ্টে থাকা আল মাহমুদ তাদের আর্থিক সহযোগিতা নিয়েছেন। জামাত-শিবিরের অনেক অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তাদের মিডিয়ায় তাঁর সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। সুবিধা নিয়ে গুণগান করেছেন যুদ্ধাপরাধী জামাত অনুসারীদের। অথচ তাঁর লেখা "যেভাবে বেড়ে উঠি"---পড়লে দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে জন্ম নেওয়া মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ কৈশোরেই বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। শুধু কবি হবেন বলে ঢাকা শহরে ফুল আঁকা একটি টিনের ট্রাঙ্ক হাতে নিঃস্ব অবস্থায় এসেছিলেন। লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিক জীবনে মোহান্ধ কবি লিখেছিলেন, “যদি পায়ে পড়ে কহড়, তবুও ছেড়ো না শহর।”

প্রশ্ন ওঠে কৈশোরেই প্রগতিশীল রাজনীতির দীক্ষা নেওয়া কবি স্বাধীনতা উত্তর সময়ে প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ায় আশ্রয় নিলেন কেন? উচ্চশিক্ষা নিতে না পারা কবিকে কতিপয় ফাঁপা জাত্যভিমানে ভরা উচ্চশিক্ষিতদের অবহেলার শিকার হতে হয়েছে, বঞ্চিত হয়েছেন তাঁর প্রাপ্য সম্মান থেকে, তাঁর সহজাত প্রতিভা, সৃজন ও সৃষ্টিশীলতাকে পাশ ঠেলে গ্রাম্য কবি বলে নিগৃহ ও অবহেলার শিকারও হয়েছেন জীবনভর---এসবই কি তাকে প্ররোচিত করেছিল সুযোগসন্ধানী প্রতিক্রিয়াশীলদের সহানুভূতি ও সম্মান নিতে? এ নিয়ে সহজে কোন উপসংহারে পৌঁছানো যাবে না। নিশ্চয়ই আরও আলোচনা ও বিতর্ক হবে।

অথচ আমরা দেখি এই আল মাহমুদ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় লিখেছেন-

"ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে
দুয়োর বেঁধে রাখ।
কেন বাঁধবো দোর জানালা
তুলবো কেন খিল?
আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে
ফিরবে সে মিছিল।
ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!
ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিয়ুরকে ডাক।
কোথায় পাবো মতিয়ুরকে ঘুমিয়ে আছে সে!
তোরাই তবে সোনামানিক আগুন জ্বেলে দে..."----ফিরেছে মানুষের মুখে মুখে।

একজন শিল্পীসত্তার গভীর চেতনাগত অঙ্গীকার হিসেবে হিসেবে মা, মাটির প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে প্রতিবাদে জ্বলে ওঠে তারও আগে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর কবিতা শহীদ বেদিতে আজও উচ্চারিত হয় সম্ভ্রমে-

"ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়?
বরকতের রক্ত।
হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে!
প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।
চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে?
পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।
প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।

আর মাকে নিয়ে লেখা কবিতা-

"আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে
হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।
নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?
-হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।
বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে
শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছাড়িয়ে থাকে।..."

বিপ্লবী রাজনীতিতে বিশ্বাসী কবি লিখেছিলেন-

"শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতের উঠিয়াছে হাত
হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা,
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোশাকে এসো এঁটে দিই বীরের তকোমা
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন।..."

বিস্ময় লাগে ‘সোনালী কাবিন’, ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘উপমহাদেশ’-এর মত উপন্যাস লেখা কবি এক সময় আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির ছায়ায়। মৃত্যু তাঁর রাজনৈতিক ভুল ভ্রান্তি থেকে তাকে মুক্তি দিক। তবে সচেতন ও অবচেতনভাবে জামাতিদের সংশ্রবে থেকেও তিনি অস্বীকার করেছেন তাদের। এ কথা মনে হলে আমি তাঁর প্রতি কোন বিদ্বেষ পুষে রাখতে পারি না। কারণ বাংলা ভাষায় তাঁর সৃষ্টি অতুলনীয়। কারণ রাজনৈতিক জিন্দাবাদ ভুলে একদিন মানুষ শুধু তাঁর কবিতাই পড়বে। তাই রাজনৈতিক বিভাজন ও বিতর্কের বাইরে---দুই বাংলায় একজন কবি ও লেখক হিসেবে আল মাহমুদ সমান জনপ্রিয়।

আলমগীর শাহরিয়ার, কবি ও প্রাবন্ধিক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ