আজ বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ ইং

পৃথিবী কি শুধু ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থের জন্য?

জুয়েল রাজ  

গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়ে ৫০ জন মুসল্লিকে হত্যা করা হয়। হামলাকারী অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। তার বিরুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের আদালতে হত্যা মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সারা পৃথিবীর মানুষ সেদিন নিউজিল্যান্ডের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। নিউজিল্যান্ডের সেই ক্ষত এখনো শুকায়নি। রক্তের দাগ মুছে যাওয়ার আগেই আত্মঘাতী হামলা হলো শ্রীলঙ্কায় তিনশতাধিক সাধারণ মানুষকে সেই হামলায় খুন করা হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের মসজিদের সেই রক্ত আর শ্রীলংকার গির্জার রক্তের রং একই ছিল। সেই লালে কোন ভিন্নতা ছিলনা। দিনের ও ব্যবধান ছিলনা, নিউজিল্যান্ডে হামলা হয়েছিল ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের পবিত্র দিন শুক্রবার। যেখানে জুম্মার নামাজে সমবেত হয়েছিলেন সবাই। শ্রীলংকায় হামলা হলো খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র দিন ইস্টার সানডেতে। তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস মতে এইদিনে ঈশ্বরের পুত্র যিশু ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার তিনদিন পর আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছিলেন। ইতোমধ্যে শ্রীলংকার হামলার দায় স্বীকার করে নিয়েছে ইসলামী জঙ্গি সংগঠন আইএস। কিন্তু শুধু দায় স্বীকারে কি দায়মুক্তি ঘটে?

জায়ান নামের ফুটফুটে দেবশিশুটি বাবার সাথে সকালের খাবার খেতে গিয়ে লাশ হয়ে গেল। বাংলাদেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। জায়ানের জন্য হাহাকার করছে মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত জায়ান নামের দেবশিশুটির দিকে আমি অপলক তাকিয়ে দেখি। বিষাদে ভরে উঠে মন। জায়ানের সমবয়সী আমার ভাগ্না-ভাগ্নিগুলোর মুখ ভাবি। বাংলাদেশের একদল জঘন্য মানুষ, শুধুমাত্র জায়ানের নানা শেখ সেলিমের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এই মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করছে। ঠিক তেমনি অন্যপক্ষ ৩৬০টি লাশের মিছিল একপাশে রেখে, শুধু জায়ানের জন্যই সব হাহাকার উজাড় করে দিচ্ছেন, যতোটা না মানবিক কারণে তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভুভক্তি প্রমাণের জন্য বলে মনে করছেন অনেকে।

সর্বজনীন শোক কিংবা প্রতিবাদ নেই কোথাও। নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে হামলায় প্রার্থনারত মানুষের উপর জঘন্য হামলায় সারা পৃথিবী হাতে হাত রেখে প্রতিবাদ করেছে। মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদে পাহারায় ছিলেন অমুসলিম নাগরিকগণ। লন্ডনের মসজিদগুলোর সামনেও অনেক অমুসলিম সেদিন বুক আগলে দাঁড়িয়েছিলেন।

কিন্তু শ্রীলঙ্কার হত্যাযজ্ঞ সেভাবে কোন উদ্যোগ দেখা যায়নি। এর কারণ হতে পারে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসাবে সংখ্যাগুরুরা তাদের নিরাপত্তা দিতে, মানসিক শক্তি যোগাতে দাঁড়িয়েছিলেন। ইউরোপ তথা পশ্চিম বিশ্বে যেহেতু মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানে সংখ্যাগুরু খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। কিন্তু শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা যেমন সংখ্যালঘু, হত্যাযজ্ঞের লক্ষ্যবস্তু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও ঠিক তেমনি সংখ্যালঘু।

শ্রীলঙ্কার বোমা হামলায় নিহতদের জন্য সমবেদনায় বা শোক জানানোতে কিছুই হয়তো পরিবর্তন ঘটবে না পৃথিবীতে, তবু মানুষ সাহস পায়, এই ছোট ছোট বিষয়গুলোই বিশ্ব জনমতে রূপ নেয়।

ব্যক্তিগত ভাবে পেশাদার, অপেশাদার কিছু হোয়াটসআপ এবং ফেইসবুক গ্রুপের সাথে জড়িত কোনটা ইচ্ছায় কোনটা অনিচ্ছায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের সেই পেশাদার অপেশাদার বন্ধুরা শ্রীলঙ্কার সেই হামলায় কোন ধরণের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন নি। যেমন বিক্ষুব্ধ ছিলেন নিউজিল্যান্ডে হামলা পরবর্তী সময়ে। শ্রীলংকার হামলাকে পাশ কাটিয়ে, সবাই ব্যস্ত ছিলেন জীবিত সাংবাদিক মাহাফুজ উল্ল্যাহ খানের আত্মার শান্তি কামনায়।

আমাদের সেই সহকর্মী, বন্ধুরা সেদিন উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ক্রাইস্টচার্চের হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা উল্লেখ করলো না কেন সেই বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। একদল আবার ব্যস্ত ছিলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আর্ডরেন এর জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের দাবিতে পিটিশন সাইন নিয়ে। রোহিঙ্গার মতো আপদ বাংলাদেশ গ্রহণ করার পেছনে মানবতাবাদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ছিল ধর্মবাজী। তবুও বাংলাদেশের মানুষ সরকার তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সেই আপদ এখন বাংলাদেশের জন্য বিপদে পরিণত হয়েছে।

৯১ সালে বাবরী মসজিদের ধ্বংসের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা এখনো কিছু কিছু মনে আছে। মানুষের চোখে মুখে চাপা ভয়, জন্মমাটি ছেড়ে দেশান্তরি হওয়া তখনো সেইসব বুঝার বয়স ছিল না আমাদের। কিন্তু আতংকিত মুখগুলো এখন মনে পড়লে বুঝতে পারি সেই বেদনা। প্রত্যেকটি মানুষ অন্তরে ধর্মান্ধতা লালন করে সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেন। এই যে দ্বিচারিতা এই যে ধর্মানুভব, ধর্মানুভতাবাদ, মানবতাবাদ সেখানে অপাংক্তেয়।

এমন দিন না আসুক, শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধরা যদি মেতে উঠে মুসলিম নিধনে তখনো কি এই নীরবতা পালন করবেন আপনারা? আরেকটা গুজরাট ফিরে না আসুক আসুক। আরেকটা বাবরী মসজিদ ফিরে আসুক, পৃথিবীতে আর কোন মায়ানমার না হউক, আর কোন ইয়েমেন, গাজা হউক। ধর্মানুভূতি নয় মানবতানুভূতি জাগ্রত থাকুক। পৃথিবীটা মানুষের হউক। না হলে একদিন পৃথিবীতে শুধু রক্তের দাগ থাকবে, ধর্মগ্রন্থ আর ধর্মই থাকবে, কোন মানুষ থাকবে না সেদিন।

অন্তরে বিষ রেখে এই রক্তপাত এড়ানো যাবে না।

যে মানুষ ব্রিটেনের সমাজ ব্যবস্থায় জীবন যাপন করেন। যাবতীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন, সেই একই মানুষ বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য কাজ করেন।

শ্রীলঙ্কায় এর মাঝেই ছোট একটা ঘটনা ঘটে গেছে, কোন এক মসজিদে হামলা হয়েছে। চক্ষুলজ্জায়ই হয়তো কেউ প্রতিবাদ করেন নি। ভারতের বাবরী মসজিদ ভাঙার দুঃসহ স্মৃতি ভারতের চেয়ে বেশি বুঝেছেন বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। ভারতে দাঙ্গা হয়েছিল দুপক্ষেই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশে হয়েছিল একতরফা। আমার বালকবেলার সেই স্মৃতি কিছু কিছু এখনো মনে আছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের নাম নিয়ে মসজিদে গুলি ছুড়বে, মসজিদ গুড়িয়ে দিবে, মুসলিমের নাম নিয়ে মন্দিরে গির্জায়, মেলায় হাটেঘাটে ক্লাবে বোমা মারবে, সিরিয়া ইরাক, আফগানিস্তানের মতো, মানব সভ্যতার সব নিদর্শন মুছে ধ্বংসস্তূপ করে দেবে পৃথিবী। প্রতিশোধের এই খেলায় যদি মানুষই না থাকে শুধু ধর্ম আর ধর্মগ্রন্থ কি পৃথিবীকে পাহারা দেবে?

যাপিত জীবনে ধর্মকে রাখুন, গ্রামে-গঞ্জে একটা প্রবাদ আছে, পুরুষ নষ্ট হয় হাটে, নারী নষ্ট হয় ঘাটে। ধর্ম নষ্ট হয় লোক দেখানোতে।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরডার্ন সেদিন বিশ্বমানবতার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, কোথাও কোন মসজিদে কোন মন্দিরে কোন প্যাগোডায় গির্জার সামনে কেউ দাঁড়ায়নি।

সেদিন হাজার হাজার মানুষ পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। মুসলমানদের সেই দায়িত্বটা এইবার বেশি ছিল শ্রীলঙ্কার খ্রিস্টানদের পাশে দাঁড়ানোর। বলা উচিত ছিল যারা হামলা করেছে এরা মুসলমান না। গাজার জন্য, মায়ানমারের জন্য যেভাবে আপনার কণ্ঠস্বর জেগেছিল, শ্রীলঙ্কার জন্য সেটা হয়নি। শ্রীলঙ্কা নিউজিল্যান্ড হতে পারেনি। সহি কিংবা অসহি ফর্মুলা দিয়ে আর কতো! সহি হোক বা না হোক, স্বীকার করতে হবে ধর্মের নামেই এই রক্তপাত চলছে পৃথিবীব্যাপী। ১৭০ টা সংগঠনের নামের তালিকা করেছেন একজন যারা ইউরোপ আফ্রিকা এশিয়া আমেরিকায় ধর্মের নামে এই হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে।

আমরা বারবার বলছি সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই। এই বলে বলে প্রতিটা হত্যাকে শুধু সমবেদনা আর শোক জানিয়ে পাশ কেটে যাই। অথচ ধর্মের নামেই এই রক্তপাত হচ্ছে। তাই সন্ত্রাসীর কোন ধর্ম নেই বলে আর এড়িয়ে যাওয়ার আর সময় নেই। মানুষের পৃথিবী হউক ধর্মগ্রন্থ;' আর ধর্ম থেকে কি হবে যদি মানুষই না থাকে। কে পালন করবে ধর্ম, কে পড়বে পবিত্র গ্রন্থসমূহ?

জুয়েল রাজ, ব্রিটেন প্রবাসী সাংবাদিক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৫ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭০ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১০ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ