আজ শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ইং

এই আদিম হিংস্রতা একদিনে গড়ে উঠেনি

অসীম চক্রবর্তী  

কালকে থেকে দেখছি প্রায় সব শ্রেনীপেশার মানুষ একাট্টা হয়ে বরগুনার নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদ করছেন। আমি আসলে ভিডিওটি দেখার দুঃসাহস করতে পারিনি। আমার হার্ট খুবই দুর্বল এসব বিষয়ে। রক্ত দেখলে মাথা ঝিম ঝিম করে। তবে স্টিল ছবিতে ঘটনার সময় আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের নির্লিপ্ততা আর একজন স্বামীকে বাঁচানোর জন্য একজন স্ত্রীর প্রানপণ চেষ্টা দেখে নিজেকে নিজে ধিক্কার দিলাম।

এ দেশ আমার নয়, এ মাটি আমার নয়। এ অন্য কোনো রাক্ষসীর জীওন কাঠি মরণ কাঠির ছোবলে সম্পুর্ণ অচেনা উল্টোপথ অভিমুখি কোনো বর্বর এক ভূমি। এদেশে ঘাতকের আক্রমনে আক্রান্ত মানুষকে বাঁচানোর চেয়ে মোবাইলে হত্যার দৃশ্য ধারন করে সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ইতরের সংখ্যা বেশি। এর মধ্যেই দেখলাম একটি বিদেশি স্বনামধন্য মিডিয়ার দেশি ব্রাঞ্চ মুহুর্মুহু চাপাতির আঘতে চোখের সামনে খুন হয়ে যাওয়া স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করা প্রচন্ড ট্রমার মধ্যে দিয়ে কালাতিপাত করা স্ত্রীকে ঘটনার পরের দিনই ফোন দিয়ে ইন্টারভিউ নিয়ে প্রকাশ করেছে। কেনো ভাই, আরো দুটো দিন পরে ইন্টারভিউ নিলে কি এমন ক্ষতি হতো? ওহ, ভাইরাল হতো না। কি বিচিত্র এ দেশ। মানুষের জীবন থেকেও ভাইরাল হওয়া বেশী জরুরি।  

যাই হোক এই ঘটনার পরে একটা অবজারভেশন শেয়ার করি।
 
যে দিন থাবাবাবাকে ভর সন্ধ্যাবেলা নিজ বাড়ির সামনে ঠিক একই ভাবে কুপিয়ে গেলো সেদিন বিশাল একটা জনগোষ্ঠী চুপ করে থেকেছেন, আরো বিশাল একটা জনগোষ্ঠী মুখ টিপে হেসে উল্লাস করেছেন আর আমাদের মতো দেশে বিদেশে কিছু ছ্যাঁচড়া টাইপের লোক ক্ষুদ্র সামর্থ্যের মধ্যেও প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছি।

একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো ডক্টর অভিজিৎ রয়, ওয়াশিকুর বাবু, অনন্ত বিজয় সহ রুপবানের সম্পাদকের বেলায়।

যখন বিশ্বজিৎকে চক্রব্যুহ তৈরি করে একই কায়দায় হত্যা করা হলো তখন হঠাৎ করে নয়া প্রতিবাদী দল এসে জুটলো শ্রেফ পলিটিক্যাল ফায়দা লুটার জন্য। তাদের প্রতিবাদে আক্রান্তের জন্য সমবেদনা অথবা অধপতিত সমাজ এবং বৈকল্যতাপূর্ন অনৈতিক সমাজ ব্যাবস্থাকে রিফর্মেশন কোনো আওয়াজ ছিলোনা। শুধু ছিলো রাজনীতির অশ্লীল ঘৃন্য দুর্গন্ধ।  

অন্যদিকে ক্রমাগত বিচারহীনতার অথবা বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা মামলা অথবা টাকা এবং রাজনৈতিক পেশি খাটিয়ে চার্জশিট নয়ছয় করার যে সংস্কৃতি  রয়েছে বাংলাদেশে সেটাও সামাজিক হিংস্রতার নিয়ামক।  

গতকাল থেকে দেখছি বরগুনার ঘটনায় সকল শ্রেনী পেশার মানুষের মনে আতংক। অথচ এই লোকগুলোই অতীতে একই কায়দার খুনিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হয়নি কখনো পরকালের আবার কখনো ইহকালের লাভের আশায়।

বয়েলিং ফ্রগ ম্যাটাফর বাংলাদেশের জন্য আজ অপ্রিয় এক চরম সত্য। এই আদিম হিংস্রতা এক দিনে গড়ে উঠেনি। এই রাস্ট্র, এই সমাজ, এই আমরাই ধিরে ধিরে এমন বিকলাঙ্গ সমাজ গড়ে তুলেছি। আমরাই আমাদের সন্তানদের আত্মকেন্দ্রিক হতে শিখিয়েছি, সাম্প্রদায়িকতার আফিমে আচ্ছন্ন করে রেখেছি, রাজনৈতিক বিষে নীল করে রেখেছি, নানা অজুহাতে হাজারো বিভাজন শিখিয়েছি, অসৎ পথে অর্জন করতে শিখিয়েছি।

কয়েক দশক ধরে দৃশ্যমান উন্নয়নের গরু গাছে উঠিয়ে এই রাস্ট্র আম গাছের বদলে ক্রমাগত আমড়া গাছ লাগিয়েছে। এখন নিশ্চয়ই সেই আমড়া গাছে আম ধরবে না। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক মনন, মানসিকতা, নৈতিকতা উন্নয়ন প্রয়োজন।
 
কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের দেশের রাজপুত্র টাকশাল তছরুপ করে দেশান্তরি হোন, ক্ষমতায় গেলে আমাদের মন্ত্রীদের সম্পদ বাড়ে অস্বাভাবিক হারে, গার্মেন্টসের দালান ভেঙে তেরশো কর্মী মারা গেলে মন্ত্রী বলেন প্রতিপক্ষের মিছিলের জেরে দালান ভেঙ্গেছে, বাপের কোলে শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে স্বরাস্ট্র মন্ত্রী বলেন আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন, রেল বিভাগের চরম হটকারিতায় ট্রেন দুর্ঘটনা হলে রেল মন্ত্রী বলেন অতিরিক্ত যাত্রীর কারনে ট্রেন খাদে পড়ে গেছে। ভেজাল পন্য, ভেজাল মানুষ, আর ভেজাল কর্মকাণ্ডে গোটাদেশ সয়লাভ।

তবে নতুন করে শুরু করার দিন কখনোই শেষ হয়না। অলওয়েজ দেয়ার ইজ এ নেক্সট ডে। রিফর্মেশন একদম প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করতে হবে যা শেষ হবে দেশের চুড়ান্ত প্রশাসন পর্যন্ত। আর এই কাজের দায়িত্ব রাস্ট্রিয় পৃষ্টপোষকতা ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়৷  এই নস্ট ভ্রস্ট, আত্মকেন্দ্রিক হিংস্রতাপূর্ন, অসৎ জঞ্জালে পূর্ণ  সমাজ কাঠামোকে  একটি নান্দনিক সমাজ কাঠামোতে রুপান্তর না করলে আপনি আমি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম কেউই নিরাপদ নয়।

মনে রাখবেন আজকে যে আপনি বিভিন্ন বাহানায় অথবা লাভের আশায় চুপ করে আছেন আগামীকাল আপনার বেলায়ও আরেকজন এমনই চুপ করে থাকবে।

অসীম চক্রবর্তী, যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫৩ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২১ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৬ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১১০ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৭ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১২৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ