আজ রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯ ইং

রাজন হত্যাকান্ড: গ্যাং থেকে গ্যাংরিন

মাসকাওয়াথ আহসান  

সিলেটের শিশু রাজনের হত্যাদৃশ্যটি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেয়ায়; পাশবিক সামাজিক মনোজগতটিকে স্পষ্ট দেখা গেলো। মূলধারার মিডিয়া এতো বেশী রাজনৈতিক রেটোরিকের রুটিন খবর নিয়ে ব্যস্ত থাকে যে, রাজনের মৃত্যুর খবরটি তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে পেতে হলো। কজনের হত্যাদৃশ্যই বা ভিডিও হয়; আলোর অলক্ষ্যে কত শিশুর জীবন এমন ঝরে যায় সে খবর রাখার সময় আমাদের কারো আছে! আমরা আদার ব্যাপারী; আমরা ব্যস্ত জাহাজের খবর নিয়ে!



সিলেটের রাজন হত্যাকান্ডের মনস্তত্ব ব্যাখ্যা করতে সৌদী আরবে কর্মরত ‘কামরুল’-এর নতুন টাকার গরম বিষয়টি খুবই গুরুত্বের দাবী রাখে। সে সৌদী আরব থেকে এসেছে রঙ চটা জিনসের প্যান্ট পরে এক গ্যাং স্টার হয়ে। তার হাতে টাকা আছে, সুতরাং তাকে ঘিরে তার এলাকার একটি দুষ্টচক্র গ্যাং পাকিয়েছে। এই গ্যাং ইয়াবা-ফেনসিডিল খায়; গ্যাংস্টার কামরুল যে কয়দিন আছে ‘টেকাটুকা’র অসুবিধা নাই; সুতরাং ইয়াবা-ফেনসির ফিলিংস নিশ্চিত।



কামরুল সৌদী আরবে দেখেছে উটের পিঠে শিশুদের বসিয়ে উটের দৌড় হয়। শিশুরা ভয় পেয়ে কাঁদে আরবের শেখেরা হাততালি দেয় বিকৃত আনন্দে। উটের দৌড়ে উটের পিঠ থেকে পড়ে অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু অসুবিধা কী! সৌদী বর্বর সমাজে অনেক পেট্রোডলার-অলা গ্যাংস্টার আছে। কামরুলেরও শখ হয়। সে পেট্রোডলার গ্যাংস্টার হবে। কিন্তু সৌদী আরবে সে তো মিসকিন। এই নামেই ডাকে তাকে পেট্রোডলার গ্যাং-স্টাররা। তাই মিসকিন কামরুল সেই দিনের প্রতীক্ষা করে; যেদিন সে টেকাটুকা-অলা গ্যাং-স্টার হতে পারবে।



দেশে ফিরে সে সুযোগ জুটেও যায়। নেশার ঘোরে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া শিশুকে কামরুল-গ্যাং খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। নিহত শিশু রাজনের শরীরে ৬৪ টি ক্ষতচিহ্ন আছে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় ক্যামেরার অন্তরালে কোন না কোন গ্যাং যে শিশু-হত্যা চালাচ্ছে তার এক প্রতীকী চিহ্ন যেন রাজনের শরীরের ৬৪টি ক্ষত।



আমাদের রাজনীতিতে যে মন্ত্রী গ্যাং রয়েছে এরা মন্ত্রী হবার পর এতো জনবিচ্ছিন্ন ও বড় গ্যাংস্টার হয়ে যায় যে, আদিবাসী নারী হত্যা-শিখন্ডী হত্যা-শিশু হত্যা এগুলো নিয়ে ভাবার মানসিক অবস্থা তাদের প্রায় থাকে না। ক্ষমতাসক্তিতে এক ধরণের বায়ু চড়ে যায় মন্ত্রী গ্যাং-স্টারদের। আর মন্ত্রীদের পিএস-এপিএস যে গ্যাং রয়েছে; তারাও লুকিয়ে রাখে বাস্তবতা। নিজেদের গ্যাংবৃত্তির সুবিধার জন্য মন্ত্রীকে রেখে দেয়, ‘ঠিক আছে’ ‘ঠিক আছে’ এক্সট্যাসির মাঝে।



এই গ্যাং কালচার ও অপরাধ অস্বীকারের যুগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এর ব্যতিক্রম বলেই মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিশু রাজনের মর্মন্তুদ হত্যাদৃশ্য দেখে আলোড়িত হয়ে তিনি স্ব-উদ্যোগে অপরাধীদের গ্রেফতারের উদ্যোগ নেন। কামরুলের গ্যাং-এর সবাই গ্রেফতার হয়ে গেলেও গ্যাংস্টার ঠিকই পুলিশ গ্যাং-কে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে সৌদী আরবে পালিয়ে যায়। এদিকে রাজনের শোকাহত পিতাকে কামরুল গ্যাং-এর লোকেরা ভয় দেখাতে থাকে, তোকেও তোর ছেলের মত মেরে ফেলবো। এ যে হিংস্র জুরাসিক পার্ক। পয়সা খাওয়া পুলিশ গ্যাং-ও ভাবে টেকাটুকা দিয়ে একটা রফা হলে ক্ষতি কী!



কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন প্রতিবাদের ঝড় ওঠে যে সমস্ত গ্যাং-ফ্যাং উড়ে যেতে থাকে। সৌদী আরবে কর্মরত সুস্থ কিছু মানুষ, যাদের গ্যাং থেকে গ্যাংরিন রোগ হয়নি; তারা পলাতক গ্যাংস্টার কামরুলকে ধরে দেয়। কামরুল গ্যাং হারিয়ে ব্যাং হয়ে এখন কারাগারের পাতকূয়ায় যাওয়ার অপেক্ষায়।



সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে এই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে রাজপথে। কারণ রাজনের হত্যার দৃশ্যটি যুগের ক্ষতচিহ্ন; মানবিকতার বিপর্যয়ের চূড়ান্ত প্রামাণিক চিত্র। বিচারহীনতার কু-সংস্কৃতিকে ও গ্যাং-কালচারকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে দিতে গ্যাংরিন আক্রান্ত সমাজটি ক্রমশঃ পচনশীল। কামরুল গ্যাং-এর মতো অসংখ্য পুঁতিগন্ধময় গ্যাংরিন চারপাশে কিলবিল করছে।



জামাতের বাঁশের কেল্লা গ্যাং, আওয়ামী লীগের সিপি (ক্রিমিনাল প্যারাসাইটস) গ্যাং আর বিএনপির টিপি (টেন-পার্সেন্ট) গ্যাং-এর ডার্ক ট্রায়াঙ্গল বা কালো ত্রিভুজের মাঝে আমাদের অসহায় সন্তান ও নারী সমাজ অবরুদ্ধ। ভূমি বাস্তবতায় রাজনকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে; ফেসবুকে একই নিষ্ঠুরতায় আমাদের কন্যাসম অনেককেই অকথ্য বর্বর গালাগালে মানসিকভাবে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু BTRC গ্যাং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই গ্যাং-দের বর্বরতা না দেখার ভান করে; প্রতিবাদী সত্য কন্ঠ স্তব্ধ করার ভিলেজ পলিটিক্সে যোগ দেয়, প্রভাবশালী গ্যাং-স্টারদের আর্থিক ও ক্ষমতার আফিম প্রণোদনায়। বিশেষ ক্ষমতা আইনের মত '৫৭ ধারা'র কালো আইনে কালো গ্যাং বাঁচিয়ে নিরাপরাধ মানুষদের শাস্তি দিতে উদ্যত BTRC গ্যাং।



দক্ষিণ এশিয়ার বিজন গ্রামাঞ্চলটি এখন পুরোপুরি গ্যাংরিনে আক্রান্ত। পাকিস্তানে শিশু-নারী হত্যা দৈনন্দিন কাজ মৌলবাদী গ্যাং-এর। সেখানেও পলিটিক্যাল গ্যাং ও পুলিশ গ্যাং টাকা খেয়ে মোল্লা গ্যাং-টিকে এই বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে। এরপর সেখানে আছে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা গ্যাং যারা পাখীর মত নিরাপরাধ মানুষ মেরে বেড়ায়। প্রতিবাদী কন্ঠ স্তব্ধ করতে আই এস আই গ্যাং এক ঘৃণ্য নাম।



ভারতে নারীশিশু ভ্রুণ হত্যা দিয়ে আদিম গ্যাং তাদের হত্যার রিরংসা শুরু করে। এরপর সেখানে আছে বিশ্বখ্যাত ধর্ষক গ্যাং। বলিউডের বেবিডল আইটেম নাম্বার দেখে পিতলের দুনিয়ার নারীর স্বর্ণশরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধর্ষক গ্যাং। বজরং গ্যাং ভারতে মুসলমানদের গরু জবাইয়ের অপরাধে পিটিয়ে তক্তা বানায়। পারলে মুসলমানদের ধরে ধরে ভ্যাসেকটমী করে দেয়। আর ভারতের গোয়েন্দা গ্যাং-টি নামেও ‘র’ কাজেও ‘র’। পাখীর মত নিরাপরাধ মানুষ হত্যায় তারা পাকিস্তানের আই এস আই-এর জমজ ভাই যেন।



পাকিস্তানে হিন্দুদের পূজা করার অপরাধে পিটিয়ে দেশ থেকে বের করে দেয়ার কাজটি জামাত গ্যাং আগেই সেরে ফেলেছে। বাংলাদেশেও হিন্দুদের মন্দির ভাঙ্গা-তাদের নির্যাতন করে দেশত্যাগে বাধ্য করার জামাত-বিএনপি গ্যাং কোন কোন ক্ষেত্রে সর্বদলীয় গ্যাং তাদের বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে; জমিদখল ইস্যুতে একটি গ্যাং ঐকমত্যতো রয়েছেই।



গ্যাংরিনে দ্রুত পচনশীল দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশেই মানবতাকে যাদুঘরে পাঠিয়ে এখন গ্যাং-প্যারেড চলছে। বাংলাদেশ সমাজকে এ পচন থেকে উদ্ধার করা খুবই কঠিন। প্রতিদিন এতোসব ঘটনা ঘটছে যে কোনটা ছেড়ে কোনটার দিকে মনোযোগ দেবো আমরা। ওদিকে গ্যাং-রিনের ক্ষত ফাইল চাপা দিতে বিচার বিভাগের গ্যাং খুবই পারদর্শী। লঘু অপরাধে গুরুদন্ড দেবার নক্সা কষার ফাঁকে ফাঁকে এই গ্যাং-টি গুরু অপরাধের গ্যাং-স্টারদের কেসগুলো ধামাচাপা দেয়। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।



রাজনের দুর্ভাগ্য সে বাংলাদেশের কোন গ্যাং-স্টার পরিবারে জন্মেনি। তাই সে এমেরিকায় বা বৃটেনে পড়েনা। ন্যুনতম ঢাকা শহরেই প্রাডোতে চড়ে ইলাস্টিকা স্কুলে যায় না; কারণ সে কোন এনজিও গ্যাং-স্টারের ছেলে নয়। ফলে সে রাস্তার ক্ষ্যাপা সারমেয় কামরুল গ্যাং-এর পাল্লায় পড়ে যায়। অকথ্য নির্যাতনে তার মৃত্যু ঘটে।



সারাদেশে এমন অনেক যমরুল গ্যাং-এ থৈ থৈ করছে। আমরা জানিনা আমরা সাধারণ মানুষ যাদের গ্যাং-ট্যাং কিছু নেই তারা কী করে রক্ষা করবো আমাদের সন্তানদের এই বর্বর গ্যাংগুলোর হাত থেকে। কবে যে মাদকাসক্ত কোন বখতিয়ার রনি (পলিটিক্যাল গ্যাং-নেত্রী পুত্র) জ্যামে বিরক্ত হয়ে গুলি করে মেরে দেয় আমাদের মত ছোট খাট মানুষকে কে জানে!

 

মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৫ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭০ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫১ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১০ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৬ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৫ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ