আজ শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনই ডিসির একমাত্র অপরাধ নয়

দেবজ্যোতি দেবু  

মানুষ তার ব্যক্তিগত অবস্থান সম্পর্কে কতটুকু সচেতন সেটা বুঝা যায় তার কর্মকাণ্ড এবং কথাবার্তা দিয়ে। ছোট করে বললে, মানুষের ব্যক্তিত্ব জানা যায় তার কর্মে। সে কে, তার অবস্থান কী, সে কোন অবস্থান কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছে সেটা যদি সে নিজে থেকে না বুঝে তাহলে তার করা ছোট ছোট ভুলও সমাজে অনেক বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই সহজ কথাটা বোঝার মত জ্ঞান বোধ করি সবার থাকে না। যে কারণে, পদধারী ব্যক্তির বালখিল্য আচরণের প্রতিবাদ করতে গেলে অনেক সময়ই তিরস্কারের শিকার হতে হয়।

যেমন ধরুন জামালপুরের জেলা প্রশাসক। তার পদমর্যাদা সম্পর্কে তিনি কতটুকু সচেতন ছিলেন সেই বিষয়ে অবশ্যই প্রশ্ন তোলা যায়। নিজের কামুক চরিত্রের কারণে তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন তিনি একজন জেলা প্রশাসক। বেডরুম আর অফিসরুমের মাঝে তিনি পার্থক্য করার মত ন্যূনতম জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যে সম্পর্ককে অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অনৈতিক এবং অসামাজিক বলে দাবি করেন, জামালপুরের জেলা প্রশাসক নিজেও সেই সম্পর্কের ঊর্ধ্বে যেতে পারেননি!

আবার, তার এমন অপকর্ম সমাজে কতটুকু নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে সেই বিষয়ে সাধারণ মানুষ কতটুকু সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে সেটা জানা যায় যখন প্রশ্ন করি, ডিসি সাহেবের দোষটা কী? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যেসকল উত্তর শুনেছি তার ভাষাগত ব্যবহার এতোই নোংরা ছিল যে সেগুলো লেখার মত রুচি হচ্ছে না। প্রায় সকলের বক্তব্যের সুরই ছিল, ডিসি সাহেব এমন একজন নারীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক করেছেন যিনি তার স্ত্রী নন।

যখন জিজ্ঞেস করি, স্ত্রী নন তো কী হয়েছে? জোর করেতো কিছু করেন নি! তাহলে সমস্যা কী? উত্তর আসে, আপনি তাহলে যৌনতাকে সমর্থন করছেন?

সবাই ডিসির যৌনতা নিয়ে ব্যস্ত। যেন যৌনতা একটা অপরাধ! অথচ যৌনতার ঊর্ধ্বেও যে তার অপরাধের পরিমাণটা বিশাল, সেই বিষয়ে কারো কোন মাথা ব্যথা নেই। সে বিষয় নিয়ে কেউ কথাই বলে না। ভাবটা এমন যে, এদেশের সকল পুরুষ সাধু, শুধু ঐ ডিসিই একমাত্র কামুক পুরুষ! যে সমাজে বাবা-চাচা-মামা প্রতিটি সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে আছে একেকজন ধর্ষক, সেই সমাজের বাসিন্দা হয়ে একজন ডিসির যৌন সম্পর্ক নিয়ে ব্যঙ্গ করার আপনি কে?

শিক্ষক থেকে শুরু করে সরকারি আমলা পর্যায় পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা দেয়ার লোভ দেখিয়ে মেয়েদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেয় না এমন পুরুষের সংখ্যা কতজন আমাদের দেশে? কত কবি, লেখক, শিক্ষকের কামুক চেহারা এই ফেসবুকের কল্যাণেই উন্মোচিত হয়েছে বহুবার। কখনো প্রেমের ফাঁদে ফেলে, কখনো চাকরির লোভ দেখিয়ে, কখনো আবার প্রমোশনের লোভ দেখিয়ে কত মেয়েদের রোজই লালসার শিকার বানানো হয়। কারা করে এসব? ঐ ডিসির দিকে আঙুল তোলা এই আমরাই করি, তাই না? সেসবকে কি যৌনতা না বলে অন্যকিছু বলে? এমন কতজন পুরুষ আছেন যারা জোর গলায় বলতে পারবেন যে ঐ ডিসি থেকে আপনি বা আপনারা উত্তম? আদৌ আছেন কি এমন কেউ?

আমার কাছে ঐ ডিসি সাহেব যতটা অপরাধী, ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিশেষ সুযোগ নিতে চাওয়া সকল ব্যক্তিই ততটাই অপরাধী। অপরাধটা যৌন সম্পর্কে নয়, অপরাধ ক্ষমতার অপব্যবহারের। অপরাধ, একটা নোংরা সংস্কৃতি চালু করায়। অপরাধ, নিজের দাপ্তরিক এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন না থাকায়। অপরাধ, সরকারি দপ্তরের অমর্যাদা করায়। অপরাধ, নিজেদের পরিবারকে সামাজিক ভাবে হেয় করায়।

পাশাপাশি আপনারাও অপরাধী যারা দু'জন মানুষের পারিবারিক অবস্থান এবং পরিবারের কথা বিবেচনায় না নিয়েই অকথ্য ভাষায় নিজেদের বিকৃত রুচির প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। অপরাধী সেই ব্যক্তিটিও যে একজন নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে তার একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভিডিও করে এবং তা প্রকাশ করে। অপরাধী তারাও যারা খুব মজা নিয়ে সেই ফুটেজ দেখেছেন। এই অতি আগ্রহ নিয়ে ফুটেজটি দেখাও কিন্তু আপনাদের কামুক মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।

যে দেশে শতকরা ৯০ ভাগ পুরুষই সুযোগ সন্ধানী ধর্ষক, সেই দেশে দু'জন মানুষের স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্কে জড়ানো নিয়ে মাথাব্যথা দেখানোর কোন আগ্রহ আমার নেই। আমার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে আমাদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে আমরা কতটুকু সচেতন, সেই প্রসঙ্গে। সমাজে এবং সমাজের মানুষের কাছে আমাদের কর্মের এবং বক্তব্যের প্রভাব সম্পর্কে আমরা কতটুকু সচেতন, সেই প্রসঙ্গে।

শুধু প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন, বিভিন্ন সুনামধন্য রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের পদধারী নেতা হিসেবেও আপনার কর্মকাণ্ড এবং বক্তব্যের সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে আপনি কতটুকু সচেতন, সেগুলোই আমার মূল আলোচ্য বিষয়। তেলবাজ সব জায়গাতেই থাকে। তাদের তোষামোদিতে মজে থাকলে একদিন আঙুলগুলো আপনার দিকেও যে উঠতে পারে, সেটা কি জানেন? নিজেরা মানুষ না হয়ে অন্যকে অমানুষ দাবি করা হিপোক্রেসি। সেই বোধটুকু যার নাই সেও কি মানুষ?

দেবজ্যোতি দেবু, সংস্কৃতি কর্মি, অনলাইন এক্টিভিস্ট

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ