আজ বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

সিরিয়া শরণার্থী: পরিবর্তিত কৌশলে দখলদারিত্বের খেলা

সাব্বির খান  

বৈশ্বিক ভূরাজনীতির বর্তমান আলোচিত বিষয়টি নিঃসন্দেহে সিরিয়ান শরণার্থী। ইসলামিক স্টেট, আইএস-এর সন্ত্রাসবাদের সরাসরি উৎপাদন হচ্ছে এই শরণার্থী সংকট। বিশ্বে বিভিন্ন সময়ে উৎপাদিত বিভিন্ন সংকটগুলো সৃষ্টি হয়েছিল সরাসরি দুইটি পরাশক্তি রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তিমত্তা পরীক্ষার খেলা হিসেবে। সিরিয়াতে বর্তমানে যা হচ্ছে, তা এক নতুন ধরনের খেলা। কৌশলে পরিবর্তন আনা হয়েছে শুধু। লক্ষ্য সেই একটাই, পশ্চিমা শক্তির বিশ্বে ভূরাজনীতিতে আধিপত্যকে সুরক্ষা দেয়া।

পরিবর্তিত কৌশলের অংশ হিসেবে এবার পরাশক্তিদের কেউই সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়ে, অথবা ইরাক-ইরানের মত দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে না দিয়ে সরাসরি আকাশ থেকে আইসিস এর মত একটা "দুষ্টু ফেরেস্তা"-র দল দিয়ে সিরিয়ার দখলদারিত্বে উস্কানী দেয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, সিরিয়া থেকে রাশিয়ার ধমক খেয়ে মার্কিনীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল বছর কয়েক আগে, যার হজম করা পশ্চিমাদের সহজ হয়নি।

পরিবর্তিত কৌশল হলেও না বুঝার কোন কারণ নেই। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশারকে মার্কিনী ও পশ্চিমারা গদিচ্যুত করতে ব্যর্থ হয়েছিল রাশিয়ার বাঁধা দেয়ার কারণে। সিরিয়া প্রশ্নে মূলত রাশিয়ার সরাসরি আঙ্গুলী ডোবানো না থাকলে বাশারও হয়ত এতোদিন থাকতেন না, আইএসেরও আকাশ থেকে নেমে আসার দরকার হতো না। আর হাজার লক্ষ শরণার্থী উৎপাদনেরও প্রয়োজন হতো না।

সিরিয়ার অর্ধেকের বেশি ভুমি বর্তমানে দখল করে আছে আইএস। পশ্চিমাদের মদদে কোনভাবে যদি আইসিস সিরিয়া দখল করে বাশারকে গদিচ্যুত করতে পারে, তাহলে পরবর্তীতে পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে আশ্রিত শরণার্থীদের দিয়ে একটা "প্রবাসী সরকার" বানানো খুব সহজ একটা ব্যাপার হবে। সেই সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর স্বীকৃতিও তারা লাভ করবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই প্রবাসী সরকারের অনুরোধে মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমারা জঙ্গী-মৌলবাদী আইএস-এর হাত থেকে সিরিয়াকে মুক্ত করবে, ঠিক সাদ্দামের হাত থেকে যেই প্রক্রিয়ায় ইরাকের দখলদারিত্ব নিয়েছিল মার্কিনীরা। গল্পটা ঘুরেফিরে সেই একই হয়ে গেল!

উল্লেখ্য যে,পশ্চিমা শক্তিগুলোই একসময় সাদ্দামকে সৃষ্টি করেছিল, আবার সাদ্দামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রবাসের ইরাকী শরণার্থীদের দিয়ে এই ধরনের একটা প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়েছিল, যার মদদদাতা ছিল পশ্চিমা শক্তিগুলো। পশ্চিমাদের স্বীকৃতি পেয়েছিল এই ধরণের একটা সরকার, যাদের অনুরোধের একটা চিঠিও জাতিসংঘে প্রেরিত হয়েছি সাদ্দামের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানের জন্য, যদিও রাশিয়া আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছিল তখন। আল-কায়েদা ও বিন লাদেনের গল্পটাও একই ধরনের প্রায়।

অন্যদিকে, সিরিয়া শরণার্থী ইস্যুতে আরবদের অনুচ্চারিত শব্দগুলোতে কান পাতলে এটা বোঝা যায় যে, মার্কিনীদের চক্রান্তে উৎপাদিত শরণার্থীদের দায়ভার আরবরা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাঁদের আচরণকে অনুবাদ করলে এরকম দাঁড়ায় যে, “যাদের চক্রান্তে শরণার্থী উৎপাদিত হয়েছে, তারাই এর দায়ভার নেবে, আরবরা নয়”।

বাস্তবেও আমরা তাই দেখেছি, যদিও অনুচ্চারিত শব্দগুলো সরাসরি শোনার কোন উপায় বর্তমানে নেই। বহুল আলোচিত এই ঘটনাগুলোর পেছনের সত্যগুলো হয়ত ভবিষ্যতে আমরা আরো বিশদভাবে জানতে পারব। তবে, আরবদের এই অনুচ্চারিত শব্দগুলো এবং তাঁদের পশ্চিমাবিরোধী সিদ্ধান্তগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সৌদি আরব সহ বেশ কয়েকটি আরব দেশের মসজিদে বোমাবাজির ঘটনা হুট করেই শুরু হয়ে যেতে দেখেছি, যা ইতিপূর্বে একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার ছিল। এমনকি দুর্ধর্ষ বিন-লাদেনের সময়ও এই ধরনের ভয়ংকর ঘটনা আল-কায়েদাও ঘটাতে পারেনি, যদিও বিন-লাদেন স্বঘোষিত সৌদি রাজতন্ত্রবিদ্বেষী ছিলেন।

এছাড়াও আরবদের শরণার্থী ইস্যুতে স্বজাতিবিরোধী সিদ্ধান্তের কারণে আরো একটা বিষয় পরিস্কার হয় যে, আরব দেশগুলোতে ভিতরে ভিতরে বর্তমানে রাশিয়াই প্রাধান্য বিস্তার করছে, যা ইতিপূর্বে ঘটেনি। যদি তাই হয়, তাহলে কি ধরে নেয়া যায় যে, আরব দেশগুলো বর্তমানে রাশিয়ার পলিসিই অনুসরণ করছে এবং আগামীতে তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান অংশিদার হিসেবে রাশিয়াকেই দেখা যাবে।

যাইহোক, খেলার সবেমাত্র শুরু হয়েছে বলেই ধারণা করা যেতে পারে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকে রুশ ফেডারেশনের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের আচরণ নিয়ে মস্কোর ক্ষোভ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ। শুধু পোল্যান্ড ও রুমেনিয়ার মতো প্রাক্তন সহযোগী দেশ নয়, লাটভিয়া, লিথুয়েনিয়া ও এস্টোনিয়ার মতো সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তিনটি সাবেক প্রজাতন্ত্রও ন্যাটোর সদস্য পদ লাভ করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাড়তে বাড়তে রাশিয়ার দোরগোড়ায় হাজির হয়েছে। এমনকি সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে ইউক্রেনকেও কাছে টানার চেষ্টা চালিয়েছে ইইউ। অর্থাৎ রাশিয়াকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এবং ন্যাটো চারিদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছে। এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাশান ফেডারেশনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে আমরা দেখেছি চীনের সাথে মৈত্রতা স্থাপন এবং একাধিক যৌথ সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে। এরপূর্বে মার্কিনীদের সরাসরি হস্তক্ষেপেও রাশার কাছে ধরাশায়ী হয়েছে জর্জিয়া এবং ইউক্রেনে। সার্বিক বিশ্লেষণে এটাই বলা যেতে পারে, বিশ্বের ভূরাজনীতির দখলদারিত্বের খেলায় রাশিয়া নিঃসন্দেহে আরবে প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইবে, চীন যেমন আফ্রিকার অধিকাংশ দেশগুলোতে ইতিমধ্যে তাঁদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে।

সিরিয়াতে বর্তমানে যা কিছু ঘটছে, তা যে শুধু বিশ্বের ভূরাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তারের খেলার পূর্নবিন্যাসেরই এক ধরনের চেষ্টা, তা বোঝা যাবে হয়ত আরো কয়েক বছর পরে। তবে সে পর্যন্ত খুব ছোট আকারে হলেও এক ধরনের বৈশ্বিক অস্থিরতা নৈমত্তিক ঘটনায়ই পরিণত হবে। বৈশ্বিক অস্থিরতার পরবর্তি রূপ হিসেবে এশিয়ার, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক অংশগ্রহণের কারণে হতে পারে বড় ধরনের যুদ্ধের সূত্রপাত, যেখানে সারাবিশ্ব সরাসরি দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। সে যুদ্ধে ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হবে চোখে পড়ার মত। এধরনের একটা অনাকাঙ্খিত যুদ্ধ এড়ানো না গেলে পক্ষান্তরে বিশ্বসভ্যতাই হুমকীর সম্মুখিন হবে। বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ হবে নতুন আঙ্গিকে, যেখানে সাবেক বড় শক্তিগুলোর অস্তিত্ব বা গ্রহণযোগ্যতা নাও থাকতে পারে।

সাব্বির খান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক ও সাংবাদিক। ইমেইল : [email protected]

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৪ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ