আজ সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯ ইং

বাড়ি ছেড়ে পালানো বালক

এমদাদুল হক তুহিন  

অভিমান কিংবা ক্রোধে; এমনকি চাপা উত্তেজনায় ১২ বছরের বালকও ঘর ছাড়ে। পালিয়ে বেড়ায় নতুন আশায়। শুক্রবার এমন এক বালক দেখেছি যে সদুর ভোলা থেকে পালিয়ে এসেছে ঢাকায়। খুব সম্ভবত পকেটে আছে পনের টাকা।

সে বাংলামোটর থেকে হেঁটে হেঁটে যাত্রাবাড়ী যাবে। যাত্রাবাড়ী কোন পথে যেতে হয়, তা জানতে চাইলো আমাদের অফিসের ঠিক সামনের গলিতে এক অপরিচিত মানুষের কাছে। আর ঠিক সে সময়ে ওখানে আমি, অফিসে ঢুকার জন্যে প্রচণ্ড তাড়া।

ছেলের নাম জিজ্ঞেস না করা হলেও বাড়ির ঠিকানা জিজ্ঞেস করতেই বলল, ভোলা থেকে এসেছি। গ্রামের নাম খুব সম্ভবত বোরহান উদ্দিন। ছেলের কাছ থেকে ওর পরিবারের ফোন নং জিজ্ঞস করে ডায়াল করলাম, ফোন বন্ধ। ছেলেটিও বলেছিল বন্ধ আছে ফোন। হতাশ হয়ে অল্প কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, সোজা বাংলামোটর যাও।

সেখান থেকে বাসে চড়ে যাত্রাবাড়ী। আর লঞ্চে ঘটনা খুলে বললে তোমাকে নিয়ে যাবে। বিপদের কোন আশঙ্কা নেই। ভাবি নি তখন আরও বেশি কিছু করার দরকার ছিল। হয়ত ভিন্ন কিছু করা যেত। তাড়া থাকায় ভুল এক সিদ্ধান্তে ছেলেটিকে অল্প সাহায্য করে বিদায় করেছি ঠিকই, ভেতরে এক প্রবল অপরাধবোধ কাজ করছে সন্ধ্যার পর থেকেই। এ অপরাধবোধ আবারো জেগে উঠলো একটি আর্টিকেল পড়ে।

পথশিশু নিয়ে অনেকেই কাজ করেন। দেখেছি একদিনের জন্যে পথশিশুদের গায়ে লেগে যায় আভিজাত্যের ছাপ! পথশিশুদের নিয়ে কোন এক অনুষ্ঠানে এক ছোট ভাইয়ের আমন্ত্রণে বাধ্য হয়েই যেতে হয়। তবে অনুষ্ঠানস্থলে আমাকে বেমানানই লাগছিলো। আর ওই শিশুদের পাশে দাঁড়ানো তরুণ তরুণীরা উচ্চবিলাসী শ্রেণীত্বের প্রকাশ অতি সহজেই ঘটে। কিছু করার নেশায় উদগ্রীব গুটিকয় তরুণের মাথায় যে বিপ্লব খেলা করে; তা প্রশংসনীয় বটে।

আমার মস্তিষ্কে কী আছে জানি না; পথশিশু আমাকেও তাড়না যোগায়। অনুপ্রেরণা দেয়, ভালবাসতে শিখায়। আর সেই ভালোবাসাকে পুঁজি করে বাণিজ্যও ঘটে অহরহ। চলে সাময়িক উচ্চবিলাসী ভোগ বিলাস। গাড়ি থেকে বউ সহ নেমে এসে পথশিশু নিয়ে লম্বা বক্তৃতা। প্রশংসায় পঞ্চমুখে জয় ধ্বনি উঠে; অথচ প্রশংসিত ব্যক্তিটার হিসাবেও দেখি ঢের অমিল। কিংবা তথ্য প্রদানে টালবাহানা!

তাহলে কোথায় নিরাপদ ওই পথের শিশু! আমার কাছে, আপনার কাছে, এনজিওর কাছে? কিংবা তার পরিবার? হ্যাঁ কারো কারো আছে। কেউ ফুটপাতে পরিবারের সাথেই থাকে। তবে নিরাপদ নয়, অনিরাপদ বলেই তো পথশিশু। ভয় নেই, ভীতি নেই। আশা নেই, করুণা আছে। করুণা নিয়ে কতকাল বেঁচে থাকবে ওরা?

শুনেছি, পথশিশু নিয়ে কাজ করা এক তরুণকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। আমি ওই তরুণের নামও জানি না, জানতে চাই নি। ওরা যে ভুল করে না এমন হওয়ার কথা নয়, মানুষ যেহেতু ভুল করে; ওরাও। তবে ছেলেগুলো কাজ করছে, মানুষের পাঁশে দাঁড়াচ্ছে। মানুষের পাঁশে দাঁড়ানোকে বোধ করি সুস্থ মস্তিষ্কে কেউ বলবে না অন্যায়! তো, এতো বছর ধরে কাজ করে যাওয়া ছেলেরাও সংগঠিত। জানি এ পথেই অনেকের বাড়ি গাড়িও হয়ে যায়, সবাই এক হবে তা তো নয়! আমি কারো নাম নিয়ে বলছি না, বলছি সামগ্রিক কথা। বলছি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কথা। বলছি তার কথা যার হৃদয়ে আকুতি রয়েছে স্বেচ্ছা শ্রমের।

পুরো সমাজ বদলে যাবে এমন নয়, কিঞ্চিৎ বদলেছে তাই সত্য। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক বোধ কিছুকাল পূর্বে কিছুটা হারিয়ে যাওয়ার পর উঠতি যুবকের মত ফিরে এসেছে আবার। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক বোধ জাগ্রত করতে হবে। আর ওই সব তরুণেরাই দাবী করে গ্রেফতার হওয়া ওই তরুণের দ্রুত তদন্ত হোক। উদঘাটন হোক আসল ঘটনা।

ইস্কাটনে দেখা পাওয়া ভোলার ওই ছেলেটার মত; আরও অনেককেই দেখেছি বাড়ি থেকে পালাতে। আমার এক চাচাত ভাই ছোট বেলায় পালিয়েছিলো। তখন আমি ক্লাস ফাইভে। কাকার সাথে ভাইকে খুঁজতে এসেছি এয়ারপোর্ট। পেয়েও গেলাম, পিছু দৌড়। কিন্তু তাকে ধরতে পারি নি সেদিন, পরে অবশ্য বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি নেওয়া হলেও; আবারো পালায় সে। পালিয়ে বেড়ানো মানুষগুলো পালিয়ে বেড়াতেই ভালোবাসে। স্থিরতা নেই তাঁদের। জীবন যুদ্ধে চিরতরের জন্যেও পালিয়ে যায় কেউ কেউ। অভিমান কিংবা ক্রোধ অল্প বয়সে জাগিয়ে তুলতে নেই। পরিবেশ বিবেচনায় কিছু আকাঙ্ক্ষা সুপ্ত রাখাই ঢের উত্তম। স্বাধীনতার নেশায় ঘুরতে থাকা বাউন্ডুলেও কোন দিন ছিল না স্বাধীন।

সর্বোপরি মানবিক বোধ নিয়ে কাজ করা মানুষগুলোর দায়িত্ব উচিৎ প্রতিটি বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করা। মানুষকে জানিয়ে দেওয়া আমারা সুখে নেই, সুখে থাকলে দুখী মানুষের পাশে দাঁড়ানো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কষ্টকর!

এমদাদুল হক তুহিন, ব্লগার, কবি ও সংবাদকর্মী। ইমেইল: [email protected]

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫৩ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২০ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৬ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০৮ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৭ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১২৫ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ