আজ শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০১৯ ইং

মেডিকেল ভর্তিপরীক্ষা: একটি দীর্ঘশ্বাস

মুহম্মদ জাফর ইকবাল  

এই বছর আমার পরিচিত একজন মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষা দিয়েছে। পরীক্ষা শেষে আমি তাকে ফোন করেছি, জিজ্ঞেস করেছি পরীক্ষা কেমন হয়েছে। সে বলল, পরীক্ষা যথেষ্ট ভালো হয়েছে, এই রেজাল্ট দিয়ে তার কোনো একটা পাবলিক মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার হবে না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেন হবে না? সে বলল, মেডিকেলে ভর্তিপরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, যারা সেই প্রশ্ন পেয়েছে তারা নব্বই-একশ করে উত্তর করেছে। আমরা যারা লেখাপড়া করে পরীক্ষা দিই, তারা খুব বেশি হলে সত্তর-আশি উত্তর দিই।

ফলাফল প্রকাশ হবার পর আমি তার একটি টেলিফোনের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম, সেই টেলিফোন এল না। আমি বুঝে গেলাম, সে যেটা আশংকা করেছিল সেটাই ঘটেছে। যারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন দিয়ে নব্বই-একশ’ করে উত্তর করেছে, তারা বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছে। যারা পড়াশুনা করে পরীক্ষা দিয়েছে তারা প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে। হয়তো শব্দটা প্রতিযোগিতা নয়, হয়তো শব্দটা নৃশংসতা। যারা এই বয়সের কিশোর-কিশোরী কিংবা তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন ধ্বংস করে দেয়, যারা জেনেশুনে সেটা সহ্য করে, এই দেশে তাদের থেকে বড় নৃশংস অপরাধী আর কে আছে?

পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে আগে আমি অনেক চেঁচামেচি করেছি, কোনো লাভ হয়নি। মন্ত্রণালয় কখনও স্বীকার করেনি, কোনো পরীক্ষা কখনও বাতিলও করেনি। যদিও কিছুদিন আগে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সংসদে বলেছেন যে, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এই সরকারের জন্য জীবন-মরণ সমস্যা! যদি সত্যি এটা এই সরকারের ‘জীবন-মরণ’ সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে কেন এর সমাধানে কোনো চেষ্টা নেই? জীবন-মরণ সমস্যা সমাধানের জন্যে কি জীবন-মরণ চেষ্টা করতে হয় না? আমরা কি সেটা দেখছি? যেন কিছুই হয়নি ঠিক সেইভাবেই কি দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই ব্যবহার করে যাচ্ছেন না?

পরীক্ষার পর থেকে আমার কাছে অসংখ্য টেলিফোন এসেছে, এসএমএস এসেছে, ই-মেইল এসেছে। আমি যখন আমার টেলিফোন ধরেছি, তখন শুনেছি অন্য পাশে একজন হাউ মাউ করে কাঁদছে। সরকারের নির্লিপ্ততার সুযোগ নিয়ে যখন কিছু দুর্বৃত্ত কারও সারাজীবনের স্বপ্ন ধ্বংস করে দেয়, তখন তার কান্নার শব্দের থেকে কষ্টের আর কিছু থাকতে পারে না। কিশোর, কিশোরী, তরুণ, তরুণীর এসএমএস আর ই-মেইলের হাহাকার আমি শুনে যাচ্ছি, দেখে যাচ্ছি, কিন্তু কিছু করতে পারছি না। একটি অভুক্ত শিশু যখন তার হতদরিদ্র মায়ের কাছে খাবার চায়, মা যখন তার মুখে কিছু তুলে দিতে পারে না, তখন সেই অসহায় মায়ের কেমন লাগে আমি সেটা অনুভব করতে পারি।

আমি নিজে সারাজীবন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে এসেছি। আমার জীবনে সেই স্বপ্ন সত্যি হতে দেখেছি। স্বপ্নপূরণের আনন্দের কথা আমি যে রকম জানি, ঠিক সে রকম স্বপ্নভঙ্গের কষ্টের কথাও জানি। মানুষ কষ্ট সহ্য করে এক সময় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু স্বপ্নভঙ্গ যদি হতাশায় রূপ নেয় তখন সে আর কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। এই সরকার পুরো দেশের দায়িত্ব নিয়েছে, দেশের এই তরুণ প্রজন্মের দায়িত্বও তাদের নিতে হবে। প্রশ্নফাঁসের এই ভয়ংকর অন্যায় মেনে নিয়ে তারা এই প্রজন্মকে হতাশায় ঠেলে দিতে পারবে না। এখন পুরো ব্যাপারটি অস্বীকার করে দুই বছর পরে তারা বলতে পারবে না এটি ছিল ‘জীবন-মরণ’ সমস্যা!

দেশের সবাই জানে কী ঘটেছে, ইন্টারনেটে প্রশ্নফাঁসের অসংখ্য প্রমাণ আছে। কিছু দুর্বৃত্তকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। লক্ষ লক্ষ নয়, কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। ঠিক করে তদন্ত করা হলে তার সব কিছু বের করা যাবে। একটি রাষ্ট্র প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে পারবে না কিংবা আমি সেটা বিশ্বাস করি না। যে সব বড় বড় কর্মকর্তার এই দেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের সাধারণ ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন তাদের নিজেদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে তাদের কোনো ভাবনা নেই। অর্থ আর ক্ষমতার জোরে তারা ঠিকই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যায়তনে লেখাপড়া করবে। তাই দেশের সাধারণ ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের এত বড় অবহেলা।

একটা দেশের সবচেয়ে বড় সর্বনাশ করা সম্ভব সেই দেশের তরুণ সমাজকে হতাশার মাঝে ঠেলে দিয়ে– এই সরকার কি জানে? জেনে হোক না জেনে হোক, তারা ঠিক এই কাজটিই করে ফেলেছে। আমি আশাবাদী মানুষ, জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে এসেছি। আমি সরকারের কাছে করজোরে প্রার্থনা করি, উটপাখীর মতো বালুর ভেতর মাথা গুজেঁ থাকবেন না, কী ঘটেছে সেটা তদন্ত করে দেখুন। যদি সত্যি প্রশ্ন ফাঁস হয়ে থাকে তাহলে দুর্বৃত্তদের ধরুন, পরীক্ষা বাতিল করে আবার পরীক্ষা নিন। এ জন্যে যে বাড়তি যন্ত্রণাটুকু পোহাতে হবে সেটি এই দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যতের তুলনায় কিছুই না।

এই দেশটি আমাদের অনেক ভালোবাসার দেশ। যে তরুণ-তরুণীরা এই দেশটি গড়ে তুলবে তাদেরকে হতাশার মাঝে ঠেলে দেবেন না। এই পৃথিবীতে সত্যের জয় হয়, অসত্য অন্যায় যত ক্ষমতাশালীই হোক ধুলায় মিশে যায়, তাদেরকে সেই বিশ্বাস নিয়ে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিন।

দোহাই আপনাদের।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৮ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৪ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৪ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৬৮ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৪৪ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৪ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ৯৮ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১০৮ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৮৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৩ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ