আজ মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

এক ঢিলে তিন পাখি: প্রসঙ্গ যুদ্ধাপরাধের বিচার

সাব্বির খান  

শিরোনাম দেখে ভাবার কোন কারণ নেই যে, আমি বিরোচিত কোন কাজের বর্ননা দিচ্ছি। একই লেখায়, সম্পূর্ন ভিন্ন অবস্থানের তিনজন বিশিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে কিছু কথা লিখবো বলে এই শিরোনামের আশ্রয় নিয়েছি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের মত মারাত্নক স্পর্শকাতর বিষয়ে গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন ভাবে এই তিন ব্যক্তির নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। একই লেখায়, তিনটি সংখ্যানুক্রমের ধারা বজায় রেখে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গকে বিন্দুতে রেখে শিরোনামটি নির্ধারন করেছি। স্বভাবতই শিরোনামের অন্য যে কোন ব্যাখ্যা অগ্রহনযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
 

এক.  

গত ১ নভেম্বর ২০১৪, শনিবার পাকিস্তানের স্বরাস্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান একটি বিবৃতি দিয়েছেন যা সে দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয়েছে এবং বাংলাদেশের মিডিয়াগুলোতেও তা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। বিবৃতিতে তিনি যা বলেছেন তার কিছু অংশ তুলে দিচ্ছিঃ
 

“নিজামীর মৃত্যুদন্ডের শোকার্ত সংবাদ শুনে আমি খুব দুঃখ পেয়েছি। বাংলাদেশ সরকার জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে আইনের অপব্যবহার করছে এবং এটাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে, ৪৫ বছর আগে যে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ সরকার এখনো সেটাকে সামনে নিয়ে আসছে। তাঁরা ভুলে যাওয়া ও সাধারন ক্ষমার সাধারন গুন থেকে দূরে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা একান্ত তাঁদের ব্যাপার হলেও ১৯৭১ এবং এর পরের ঘটনা সমূহ থেকে দূরে অবস্থান নিতে পারে না পাকিস্তান।“ সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর ২ নভেম্বর, ২০১৪
 

বিবৃতির লাইনগুলো বার বার পড়েও এর যৌক্তিকতা বুঝতে পারিনি। পাকিস্তান একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র। সেদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে চৌধুরী নিসার আলী খানের অবশ্যই জানা উচিত যে, অন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরিন বিষয়ে কতটুকু এবং কোন কোন বিষয়ে নাক গলানো যায়। ওনার অতীত ঘেটে যতটুকু জেনেছি, উনি অবশ্যই সদ্য নির্বাচিত হওয়া কোন সাংসদ বা মন্ত্রী নন। ইতিপূর্বে তিনি আট বার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তিন বার মন্ত্রী হয়েছেন। এক দেশের মন্ত্রী হয়ে অন্য দেশের কোন সাবেক বা বর্তমান মন্ত্রীর কোন দুঃসংবাদে বা মৃত্যুতে শোক বা দুঃখ প্রকাশ করতেই পারেন। কিন্তু অন্য একটি দেশের বিচার বিভাগ নিয়ে যখন মন্তব্য করেন, তখন তাঁর মন্ত্রী হিসেবে ন্যুনতম জ্ঞানগরিমা বা যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা কোন অপরাধের বিষয় বলে মনে হয় না।
 

৪৫ বছর আগের ঘটনাকে তিনি মর্মান্তিক ঘটনা বলেছেন। অথচ এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য কারা দায়ী এবং তাঁর সাজা কি হওয়া উচিত, তা বেমালুম ভুলে গেলেন এই পাক-মন্ত্রীমহোদয়। অবিবেচকের মত একটা কথা তিনি বলেছেন যাতে সত্যিই ভব্যতার কোন লেশ খুজে পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ নাকি ভুলে যাওয়া ও সাধারন ক্ষমার সাধারন গুন থেকে দূরে অবস্থান করছে। হাস্যকর হলেও এই কথা শোনার পরে কোন সুস্থ্য মানুষের পক্ষে রাগ সংবরন করা সম্ভব নয়। যেই একাত্তরের জন্য পাকিস্তানের কোন সরকার বা জান্তা এবং তাঁদের এদেশীয় দোসর জামায়াত ইসলামী আজ পর্যন্ত ক্ষমা চাওয়া তো দুরের কথা দুঃখ প্রকাশ করার ন্যূনতম মানষিকতা দেখায়নি, তাঁদের মুখে অবশ্যই এই নীতিকথা বিষ্ঠাসম হিসাবেই প্রত্যাখ্যিত হওয়া উচিত এবং একজন বাংলাদেশী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই তা প্রত্যাখ্যান করছি।

 
তিনি আরো বলেছেন, ‘বাংলাদেশে যা ঘটেছে তা একান্ত তাঁদের ব্যাপার হলেও ১৯৭১ এবং এর পরের ঘটনা সমূহ থেকে দূরে অবস্থান নিতে পারে না পাকিস্তান।‘ বলাই বাহুল্য, এই লাইনটিই আমাকে সবচেয়ে বেশী ভাবিত এবং অবাক করেছে। একাত্তরে পাকিস্তানের বর্বরতা সম্বন্ধে নতুন করে বলার কিছু নাই। কিন্তু এই পাকস্বরাষ্টমন্ত্রী যখন বলেন যে, ১৯৭১ এর পরের ঘটনা সমূহ থেকে দূরে অবস্থান নিতে পারে না পাকিস্তান, তখন মনে হয় স্বাধীন বাংলাদেশকে এখনো তারা পাকিস্তানই মনে করে এবং প্রমান হয় পাকিস্তান নামের একটি বিষ্ঠারাষ্ট্রের কি জঘন্য কার্যক্রম এই দেশটিতে তাঁরা চালিয়েছে যুগের পর যুগ ধরে, যা বর্তমানেও চলমান।

 
জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যা করা, দেশটি মেজর জিয়া নামের এক কুলাঙ্গারের হাতে তুলে দিয়ে বিএনপি নামের এক অপরাজনীতি বাঙ্গালীদের উপর চাপিয়ে দেয়া, বাংলাভাই সহ শতাধিক ইসলামিক জঙ্গী সংগঠনের চারন ভুমিতে পরিনত করা ইত্যাদি সহ আরো কত অপবিত্র কাজে পাকিস্তান বাংলাদেশে যুক্ত তা বলার কি আর অপেক্ষা রাখে? এজন্য পাক-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলতেই পারেন যে, ১৯৭১ এবং এর পরের ঘটনা সমূহ থেকে দূরে অবস্থান নিতে পারে না পাকিস্তান।

 
একাত্তরের জন্য ক্ষমা চেয়ে আপনাদেরই সভ্য হতে হবে, বাঙ্গালীদের আপাতত সভ্যতা শেখানের দরকার নাই আপনাদের। ভুলে যাবেন না, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ন্যুরেমবার্গ ট্রায়েলের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব যে সভ্য দুনিয়ার বুনিয়াদ রচনা করেছিল, বাংলাদেশও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে সেই সভ্য দুনিয়ায় প্রবেশের চেষ্টায় রত! দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাকিস্তান সেই সভ্য-দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত কোন দেশ হতে এখনো অযোগ্য।“

 
দুই. 

ইংরেজী পত্রিকা ডেইলী স্টারের প্রকাশক ও সম্পাদক মাহফুজ আনাম তাঁর নিজের পত্রিকায় সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিশাল এক কলাম লিখেছেন। বরাবরই তিনি সুবিচার ও মানবতার কথা বলে মার্কিনী প্ররোচণায় ও স্টাইলে বিভিন্ন সময়ে এই ট্রাইব্যুনালের বিচারের এখতিয়ার নিয়ে এবং এর উপায় নিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কলম ধরেছিলেন। স্বভাবত কারণেই কলামের কোথাও তাঁর নিজস্ব স্টাইলের বাইরে গিয়ে নতুনত্বের কোন ছাপ তিনি রাখতে পারেননি।
 

যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে তিনি যা লিখেছেন, একাত্তরে স্বজনহারা পরিবারগুলো এবং এই বিচার চেয়ে অনেক বছর ধরে আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ একই কথা ট্রাইবুনাল শুরুর আগে থেকেই হাজার-লক্ষ বার বলেছেন এবং এখনো বলছেন। এই বিচারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কৃতিত্বের কথাও তাঁরা অকপটে স্বীকার করেছেন বার বার এবং শুরু থেকেই। সুতরাং নতুন করে জনাব আনামের কাছ থেকে এতোদিন পরে ‘ধন্যবাদ’ না শুনলেও জাতি বা প্রধানমন্ত্রী যে খুব একটা অপকৃত হতেন, তা কিন্তু নয়! তাহলে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এখন কেন এই লেখায় স্বপ্রণোদিত হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিলেন? মাহফুজ আনাম সাহেবের লেখা বিশাল কলামের মধ্যেও নীচের এই লাইনগুলো তিনি কেন লিখেছেন এবং এই লেখার সাথে তা কতটুকু সঙ্গতিপূর্ন তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। ওনার লেখার মূল কারনটা যে কলামের শেষের এই লাইনগুলোই হতে পারে তা আমি একেবারে উড়িয়ে দিতে পারছি না। তিনি লিখেছেন...
 

"এটা সত্য যে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জামায়াতকে মিত্র হিসেবে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের এ ভূমিকার জন্য তাদের ইতিমধ্যে সমালোচনা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ নিয়ে সমালোচনা হবে।" (মাহফুজ আনাম, ডেইলী স্টার থেকে অনুবাদকৃত)

 
যেই সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আয়োজন করেছে এবং যে কাজের জন্য তিনি সেই সরকার প্রধানকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন, আবার তাঁকেই আনাম সাহেব জামাতিদের সাথে সংশ্লিষ্টতার ট্যাগ দিচ্ছেন সম্পূর্ন নির্বিকারভাবে! স্ববিরোধী এই ট্যাগিং প্রক্রিয়াটি যে ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে, তাঁরও একটা সুস্পষ্ট হুমকীর আভাস তিনি তাঁর লেখায় দিয়েছেন।

 
এখানে একটা বিষয় স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, জামায়াত যেভাবে প্রতিনিয়ত এবং গোলাম আযমপুত্র আমান আযমী তাঁর পিতার মৃত্যুর পরে বলেছেন যে, ‘নব্বুয়ের দশকে এই জামায়াতকে সাথে নিয়েই আওয়ামী লীগ একাট্টা হয়ে আন্দোলন করেছে, তখনতো কাউকে যুদ্ধাপরাধী বলেনি তাঁরা। তাহলে এখন কেন বলা হচ্ছে?”

 
মাহফুজ আনাম সাহেবের কথার সাথে জামায়াতের কথা মিলে গেল কেন? ঠিক যেই সময়ে এবং যে যুক্তিতে জামায়াত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়াকে একটা "রাজনৈতিক প্রতিহিংসা"-মূলক প্রহসনের বিচার বলছে, ঠিক যেই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান বিচারপ্রক্রিয়াটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ তুলছে,  ঠিক একই সময়ে একই যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে আনাম সাহেবও কি তাহলে একই কথা বললেন না? এটা কি শুধুই কাকতালীয় ব্যাপার, না-কি ওনার লেখার মূল উদ্দেশ্যটাই এখানে!

 
ডেইলী ষ্টার ইংরেজী পত্রিকা বিধায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিদেশী কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এই কথাগুলো দেশের বাইরে পাঠাতে তিনি যে সক্ষম হয়েছেন তাতে কোন সন্দেহ নাই। এই ধরনের ফরমায়েশী লেখা আনাম সাহেবের এটাই প্রথম নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জামায়াতিরা মাহফুজ আনামের লেখাকে তাঁদের দাবির পক্ষে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার যে করবে, তা একটা শিশুও বোঝে, অথচ আনাম সাহেব বোঝেন না। ব্যাপারটা সত্যিই সেল্যুকাস!

 
তিন.

“বিতর্কিত সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান বলেছেন, নিরাপত্তারক্ষীরা ‘পরীক্ষা না করায়’ অন্য অনেকের মতো তিনিও মোবাইল ফোন নিয়ে আদালত কক্ষে ঢুকেছিলেন, আর পকেট থেকে সেটি বের করেছিলেন ‘অভ্যাসবশে’, যা দেখে বিচারক তাকে বের করে দেন।“ কথাগুলো ডেভিড বার্গম্যানকে নিয়ে লেখা বিডিনিউজ২৪-এর অনলাইন থেকে নেয়া।

 
বিডিনিউজ২৪ এর সংবাদদাতা সুলাইমান নিলয় তাঁর লেখা এই রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন এইভাবে যে, “... রায় পড়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ নাগরিক বার্গম্যান আদালত কক্ষেই মোবাইল ফোনে কথা বলতে শুরু করেন। বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী এ সময় তাঁকে দাড়াতে বললে বার্গম্যান উঠে দাড়ান। বিচারপতি তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আদালত কক্ষে মোবাইল নিয়ে ঢোকাই নিষিদ্ধ। আপনি মোবাইল ফোন নিয়ে ঢুকেছেন, আবার কথাও বলছেন।“ এর পর বিচারক আদালত কক্ষ থেকে বার্গম্যানকে বেরিয়ে যেতে বলেন।

 
এর ঘণ্টাখানেক পর নিজের ফেইসবুক পৃষ্ঠায় বার্গম্যান ইংরেজিতে লেখেন, “অভ্যাসবশেই পকেট থেকে ফোন বের করেছিলাম, আর বিচারপতি মানিক (বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী) হঠাৎ করেই ধমকে উঠলেন। বললেন, আদালতে ফোন আনা নিষিদ্ধ, আমাকে নাকি আগেও সতর্ক করা হয়েছে। “আমি বললাম, ইয়োর অনার, আমাকে আগে সতর্ক করা হয়নি। এ সময় আমাকে বলা হলো- আদালতের বাইরেই একটি নোটিশ দেওয়া আছে।” আর এ কথার পরই বিচারক তাকে আদালত থেকে বের করে দেন বলে ফেইসবুক পোস্টে উল্লেখ করেন বার্গম্যান।

 
মিঃ বার্গম্যান ডেইলী নিউ এজ-এর একজন সাংবাদিক এবং জনাব সুলাইমান নিলয় বিডিনিউজ২৪.কম এর একজন সাংবাদিক। দুইজন সাংবাদিকের দুই ধরনের স্টেটমেন্ট (সাক্ষ্য) দেখে সত্যিই অবাক হতে হয়। তবে বিডিনিউজ২৪ এর সুলাইমান সাহেব যে রিপোর্ট লিখেছেন, তা তাঁর পেশাগত অবস্থান থেকেই লিখেছেন এবং রিপোর্টটি পড়ে তাঁর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার কথাই সাক্ষ্য দেয়। পক্ষান্তরে বার্গম্যান লিখেছেন অপেশাদার একটা সামাজিক মাধ্যম ফেইসবুকে। এক্ষেত্রে নিসন্দেহে সুলাইমান সাহেবের লেখাকেই (সাক্ষ্যকে) সঠিক হিসেবে মূল্যায় করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু একই ঘটনা বার্গম্যান কেন সঠিকভাবে লেখার সৎ সাহস দেখালেন না? উনি কেন অস্বীকার করলেন যে ফোনে উনি কথা বলেননি; শুধু ধরে বসে ছিলেন?

 
ইতিপূর্বে আদালত অবমাননার অভিযোগে ডেভিড বার্গম্যানকে দুবার সতর্ক করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তৃতীয় আদালত অবমাননা মামলাটি বর্তমানে চলমান এবং আগামী ১ ডিসেম্বর এই মামলার রায় দেয়ার কথা রয়েছে। এই মামলায় বার্গম্যান তার নিজস্ব ব্লগে (বাংলাদেশ ওয়ারক্রাইমস ডট ব্লগস্পট ডট কম) তিনটি লেখায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘ট্রাইব্যুনালের রায়ে দেওয়া এসব তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। ১৯৭১ সালের ২৩ ডিসেম্বর দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার একটি সম্পাদকীয় থেকে এই সংখ্যাটির উৎপত্তি। রাষ্ট্রপক্ষ এসব তথ্য প্রমাণ করেনি, কিন্তু ট্রাইব্যুনাল সেগুলো সাধারণ জ্ঞান (কমন নলেজ) হিসেবে আমলে নিয়েছেন।‘

 
একটি চলমান মামলার রায়ের আগেই কিছু বলা সমীচিন হবে না। কিন্তু কেন মিঃ বার্গম্যান বার বার এধরনের আচরন করছেন, তা বোধগম্য নয়। ফোন ব্যবহারের ঘটনাটি যেহেতু প্রমাণিত যে তিনি অকপটে মিথ্যে বলতে পারেন, তাহলে অন্যান্য ব্যাপারে যৌক্তিকভাবেই তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে।

 
তিনি ফেইসবুকে দাবি করেছেন, “আদালতের ফটকে নিরাপত্তারক্ষীরা যেহেতু পরীক্ষা করেনি, সেহেতু আমার মনে হয় সবার পকেটেই একটা করে ফোন ছিল। আর আমি নিশ্চিত নই, ওই নোটিসের বিষয়ে কেউ জানে কি না, জানলেও মানে কি না। “যাই হোক, পকেট থেকে বের করে আমিই কেবল বেকুব হলাম!!” (সূত্রঃ বিডিনিউজ২৪.কম)।

 
এখানেও দেখা যায় যে, মিঃ বার্গম্যান নিজের ভুল বা অন্যায় ঢাকতে অন্যরা কি করেছেন বা করতে পারেন, তার উপর ধারনা করে কথা বলছেন, যা সম্পূর্ণ অপেশাদারমূলক আচরন। তিনি একজন বৃটিশ। তাঁর নৈতিকতা, আদর্শ, সততা ও সভ্যতা বিষয়ক শিক্ষাগুলো নিঃসন্দেহে অনেকের চেয়ে অনেক উচ্চ মার্গীয় এবং সলিড। একটি আদালতে ফোন বহন বা ব্যবহারের যে নৈতিক রীতিনীতি থাকে, তা কি তিনি বোঝেন না? কেন ওনাকে অসৎদের মত আচরন করতে হবে! ধরে নিলাম অন্যরা অন্যায় করেছে, তাই বলে মিঃ বার্গম্যানের মত একজন প্রতিথযশা ব্যক্তিত্বের একই অন্যায় করতে হবে? উনি কি হতে পারতেন না অন্যদের জন্য একজন সততার দৃষ্টান্ত?
 

মিঃ বার্গম্যানের এই বক্তব্য পড়ার পর আমার মনেও প্রশ্ন জেগেছে, উনি সত্যিই বাংলাদেশের এই আদালত এবং বিচারিক ব্যবস্থার প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধাবোধ রাখেন কি-না! আমার যুক্তি হচ্ছে, যেই ব্যক্তি একটা নামকরা ইংরেজী দৈনিকে সাংবাদিক হিসেবে কর্মরত, যিনি ইতিপূর্বে ডেইলী স্টারের মত একটা সম্মানজনক পত্রিকায় কাজ করেছেন, যেই পত্রিকার উদ্বৃতি দিয়ে এই লেখা লিখছি (বিডিনিউজ২৪.কম) এখানেও তিনি কাজ করেছেন  এবং যার বিশাল ব্যক্তিত্ব, প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানের ভান্ডার উজাড় করে ব্লগে প্রতিনিয়ত লিখে যাচ্ছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারবিষয়ক কঠিন কঠিন সব বক্তব্য ও মতবাদ-, সেই তিনিই কি-না ‘যেহেতু’, ‘সেহেতু’, ‘নিশ্চিত নই’, ‘কেউ জানে কিনা’, ‘মানে কিনা’, ‘যাইহোক’ ‘বেকুফ হলাম’ ইত্যাদি শব্দসমগ্র ব্যবহার করে অকপটে অসত্য রচনা করে চলেছেন? মিঃ বার্গম্যানের মত একজন মানুষের জন্য বিষয়টি নিশ্চয়ই সম্মানজনক নয়।

 
মিঃ বার্গম্যান কত বড় সাংবাদিক সেটা কখনোই বিবেচিত হয়নি বাংলাদেশের মিডিয়ায় বা আলোচনায়। তিনি বিয়ে করেছেন বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর শ্বশুর বাংলাদেশের অন্যতম সংবিধান প্রণেতাদের একজন ও খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন। বার্গম্যানের স্ত্রী ব্যারিস্টার সারা হোসেন জাতিয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে একজন সম্মানিত মানবধিকারনেত্রী ও আইনজীবি। এটা নিঃসংকোচে বলা যেতে পারে যে, এই পরিবারটির অফুরন্ত ভালবাসা ও প্রেরনায় তিনি বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। মিঃ ডেভিড বার্গম্যানের নিশ্চয়ই উচিত হবে না এই পরিবারটিকে দেশ ও জাতির সামনে হেয় করা। রাজনীতিতে মত পার্থক্য থাকতেই পারে। ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার সারা হোসেন এদেশে দুটো শ্রদ্ধা মেশানো নাম। বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত।



সাব্বির খান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক ও সাংবাদিক। ইমেইল : [email protected]

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৩ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ