আজ শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

গণহত্যা অস্বীকার আইন এখন সময়ের প্রয়োজন

ফরিদ আহমেদ  

কোনো দেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি থাকতে পারে, এটি সহজে বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু, সব সম্ভবের এই বাংলাদেশে এটা সম্ভব হয়েছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে, বিতর্কিত করা হয়েছে, করা হয়েছে অবমূল্যায়ন। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দূর অতীতের কোনো ঘটনা নয়। আধুনিক কালে, নিকট অতীতে ঘটেছে এটি। প্রিন্ট মিডিয়া, অডিও, ভিডিও সবকিছুই তখন ছিল। তারপরেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে এই চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, এর পিছনে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির বিশাল একটা ভূমিকা রয়েছে।

এই পরাজিত শক্তির অন্যতম একটা অংশ বিএনপি নামের একটা দল গঠন করে এর পিছনে আশ্রয় নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি শুরু হয় পঁচাত্তর সালের পনেরোই অগাস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক গংদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মাধ্যমে। একই বছরের নভেম্বর মাসের ৭ তারিখে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেকে চীফ মার্শাল ল এডমিনিস্ট্রেটর এবং সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নভেম্বর মাসের দশ তারিখে প্রেসিডেন্ট সায়েম জিয়াউর রহমানকে উপপ্রধান সামরিক আইনকর্তা হিসাবে নিযুক্তি দেন। ১৯৭৬ সালের অগাস্ট মাসের প্রথম দিকে তিনি রাজনীতিতে জড়ানোর জন্য আগ্রহ পোষণ করেন। পরের মাসেই প্রেসিডেন্ট সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ সেনাবাহিনীর প্রধান জিয়াউর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন। পরের বছর অর্থাৎ সাতাত্তর সালের ২১শে এপ্রিল প্রেসিডেন্ট সায়েম ভগ্ন-স্বাস্থ্যের দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ত্যাগ করেন এবং এই দায়িত্ব তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন। এই হস্তান্তর যে স্বেচ্ছায় ছিল না, বরং চাপের মুখে করা হয়েছে, সেটা বুঝতে বেগ পেতে হয় না। ২রা মে-তে জিয়াউর রহমান মে মাসে ৩০ তারিখে গণভোটের জন্য একটা আইন জারি করেন। এরা বিএনপির পূর্বসূরি। জাগ দল হয়ে পরবর্তীতে এরাই বিএনপির ছায়াতলে জমায়েত হয়েছে। এই গণভোট হবে তাঁর নীতি এবং কর্মসূচীর উপর জনগণের আস্থা আছে কিনা তার উপরে। এজন্য তিনি উনিশ দফা নামের এক কর্মসূচীর ঘোষণা দেন মে মাসের ২২ তারিখে। এই উনিশ দফা জনগণ সমর্থন করে, কি করে না এই নিয়েই অনুষ্ঠিত হয় এক তামাশার গণভোট। তামাশার বলছি এ কারণে যে, এই নির্বাচনে তাঁর এই নীতি এবং কর্মসূচীর প্রতি হ্যাঁ ভোট পড়ে প্রায় একশো ভাগ। এক কোটি বিরানব্বই লাখ ভোট পড়েছিল সেই নির্বাচনে। এর মধ্যে এক কোটি নব্বই লাখই ভোট দিয়েছিল হ্যাঁ ব্যালটে আর মাত্র দুই লাখ পনেরো হাজার ভোট পড়েছিল না-তে। তামাশা ছাড়া একে বলার আর কিছু নেই।

১৯৭৮ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) সরকারি অনুমোদন পায়। এটাই বিএনপির পূর্বসূরি। এপ্রিল মাসে জিয়াউর রহমান ঘোষণা দেন যে তিনি রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করবেন এবং নির্বাচনে অংশ নেবেন। তাঁকে চেয়ারম্যান করে জাগদল এবং আরো পাঁচটি সমমনা দল নিয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ গঠন করা হয়। ৩রা জুনের নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জেনারেল (অব) ওসামানীকে পরাজিত করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয় লাভ করেন। এর পরই অগাস্ট মাসে জাগদল এবং এর সব অঙ্গ সংগঠনকে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয় এবং সেপ্টেম্বর মাসে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র জন্ম দেন। জন্মের আগে এবং পরে এই দুই সময়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী এবং আওয়ামী বিরোধীদের প্রিয় দলে পরিণত হয় এটি। একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রায় সকলে দলে দলে আশ্রয় নেয় এখানে। কিছু মুক্তিযোদ্ধাও যে এখানে ছিল না, সেটা অবশ্য বলা যাবে না। এদের সাথে সাথে বামপন্থী, বিশেষ করে চৈনিক বামদের একটা অংশ এসে জড়ো হয় এখানে। এদেরও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ খুব একটা ছিল না।

একটা স্বাধীন দেশে রাজনীতি করেছে বিএনপি, সে কারণে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থা নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু অন্তরে তারা কখনোই মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে নি। ভাগ্যক্রমে এই দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তার এই পরিচয়কে ব্যবহার করেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃতি করার, বিতর্কিত করার প্রথম মিশন। জিয়াউর রহমানকে জোর করে এনে বসিয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে। অথচ যুদ্ধ শুরু হবার আগে ইনি যে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে এক পাও রাখেন নি, সেটা তাদের মাথায় কাজ করে নি মোটেও। একটা দেশের মুক্তিযুদ্ধ একজন লোক চোঙা ফুঁকে রাতারাতি শুরু করতে পারে না। এর জন্য লাগে দীর্ঘ প্রস্তুতি। অসংখ্য ধাপ পেরিয়ে একটা গণ আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছে। সেই দীর্ঘ সংগ্রামে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত কোনো ব্যক্তির পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব নয় তার চাকুরীগত বাধ্যবাধকতার কারণেই। এটি একটি গণ আন্দোলন এবং জনগণের মুক্তির সংগ্রাম, এর চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে সশস্ত্র যুদ্ধ। বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষেই একমাত্র সম্ভব এমন একটি আন্দোলন-সংগ্রামকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সামরিক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ আসে একেবারে শেষ ধাপে, যুদ্ধের পর্যায়ে।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নিয়েছিলেন বন্দুকের জোরে। এই ঘোরতর অপকর্ম করলেও, তিনি নিজে কখনো নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে দাবি করেন নি। এই দাবির অবাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা পরিষ্কার ছিল বলেই মনে হয়। কিন্তু, তাঁর চেলাচামুণ্ডারা এরকম বুঝবান ছিল না। সূর্যের চেয়ে বালি সবসময়ই উত্তপ্ত থাকে। এরাও তাই। এরাই স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে তাঁকে সামনে নিয়ে আসে। না নিয়ে এসে তাদের উপায়ও ছিল না। শেখ মুজিবের হিমালয়সম ব্যক্তিত্ব এদের শঙ্কায় ফেলে দিয়েছিল। ক্ষমতায় থেকেও অহর্নিশ অনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে তারা। মুজিবের বিরুদ্ধে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে কাউকে দাঁড় করানোটা তাদের অস্তিত্বের জন্যই বড় প্রয়োজন ছিল। সে কারণে ড্রামতত্ত্বের মতো হাস্যকর তত্ত্বও বাজারে ছাড়তে দ্বিধা করে নি তারা। মেজর জেনারেল (অব) শওকত আলীর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নাকি তেলের ড্রামের উপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে নিষিদ্ধ করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে। দীর্ঘ একুশ বছর রাষ্ট্রের কোনো পর্যায়ে শেখ মুজিবের নাম নেওয়া হয় নি। মুছে করে দেওয়া হয়েছিল তাঁর উপস্থিতিকে সর্বতোভাবে। এই একুশ বছরের পুরোটা সময় অবশ্য বিএনপি ক্ষমতায় ছিল না। নয় বছর শাসন করেছে জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি। কিন্তু বিএনপির ইচ্ছাকেই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল স্বৈরাচারী এরশাদের জাতীয় পার্টিও। এরা দলে আলাদা হলেও, চিন্তা-চেতনা এবং বিশ্বাসে সব একই গোয়ালেরই গরু।

পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই পর্যন্ত ইতিহাস বিকৃতির স্বর্ণযুগ, মুক্তিযুদ্ধকে অগৌরাবন্বিত, হীন এবং ক্ষীণ করার মোক্ষম সময়। এই একুশ বছরে এরা বিপুল একটা জনগোষ্ঠীর মগজ ধোলাই করে ফেলতে সক্ষম হয়েছে এই চিন্তা দিয়ে যে, মুক্তিযুদ্ধ মহান কিছু নয়, বিশাল কোনো গৌরবের বিষয় নয় আমাদের জন্য। একাত্তরের ঘাতকদের এরা কোলে তুলে নিয়েছে, আশ্রয় দিয়েছে, প্রশ্রয় দিয়েছে, এদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়াতে দিয়ে তীব্র অপমান আর লজ্জার মধ্যে ফেলেছে আমাদের।

আগে বিএনপি ইতিহাস বিকৃতি করেছে ঠারে ঠোরে। এখন তাদের মরণদশা। মরণদশায় সাপ নাকি শেষ কামড় দেয়। এরাও তাই দিচ্ছে। এই তো সেদিন খালেদা জিয়া তিরিশ লক্ষ শহীদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। গত একুশ তারিখে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশন মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশ ও আলোচনা সভায় খালেদা জিয়া মন্তব্য করেন যে, ‘বলা হয়, এত লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে যে, আসলে কত শহীদ হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে, এটা নিয়েও বিতর্ক আছে।’ (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ ডিসেম্বর)

মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় কোন কারণে এটা আমরা সবাই বুঝি। মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লাখ মানুষ মারা গেছে না তিন লাখ মানুষ মারা গেছে, সেটা নিখুঁতভাবে হিসাব করে আমরা কেউই বলতে পারবো না। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটিরও আহ্বায়ক ডাঃ এম, এ, হাসান যেমন বলেছেন, ‘এতবড় একটা যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।কিন্তু সার্বিক দিক বিবেচনায় এনে যে সংখ্যাটি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে, সেটি নিয়ে বিতর্ক করা উচিত নয়।‘

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা বাংলাদেশে সরকারিভাবে ত্রিশ লক্ষ। খালেদা জিয়া দুই দুইবার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কাজ করেছেন। তখন তিনি এর বিরুদ্ধাচরণ করেন নি। আশ্চর্যজনকভাবে এখন এসে এই সংখ্যাকে তিনি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। এই সংখ্যাকে যখনই চ্যালেঞ্জ জানানো হয়, বলা হয় যে, এটা ভুল সংখ্যা, তখনই আমরা বক্তার মনোভাবটা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই। খালেদা জিয়ার মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ কতখানি পরিসংখ্যানগত সঠিকতা নিরূপণ করা থেকে এসেছে, আর কতখানি তাঁর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অশ্রদ্ধা থেকে, অস্বীকার করা থেকে এসেছে, সেটি বুঝতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না আমাদের। একাত্তরের নয় মাস তিনি পাকিস্তানি সৈনিকদের সাথেই বেশি সংশ্লিষ্ট ছিলেন, যদিও তাঁরা স্বামী তখন মুক্তিযুদ্ধে। পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানি মানসিকতা দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছেন ভালোভাবেই তখন। সেই ভয়ানক প্রভাব এখনো কাটে নি তাঁর, এটা পরিষ্কার।

খালেদা জিয়ার বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা ‘নির্বোধের মতো মারা গিয়েছিলেন’ বলে মন্তব্য করেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে গত পঁচিশ তারিখ শুক্রবার বিকালে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন যে, ‘একাত্তরে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা পাকিস্তানের বেতন ভাতা খেয়েছে তারা নির্বাধের মতো মারা গেল। আর আমাদের মতো নির্বাধেরা শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে ফুল দিই। আবার না গেলে পাপ হয়। তারা যদি এতো বুদ্ধিমান হয়, তাহলে ১৪ তারিখ পর্যন্ত নিজের ঘরে থাকেন কীভাবে?’ তিনি আরো বলেন, ‘নেতৃত্বের অজ্ঞতা ও আগাম সতর্কতার অভাবে ২৫ মার্চ যারা মারা গেছেন, তারা না জানার কারণে মারা গেছেন। কিন্তু ১৪ ডিসেম্বর যারা মারা গেছেন, তারা অজ্ঞতার কারণে মারা যায়নি। তারা জ্ঞাতসারেই ছিলেন। কারণ তখনও তারা প্রতিদিনই তাদের কর্মস্থলে যেতেন এবং পাকিস্তানের বেতন খেয়েছেন।’ (সূত্র: ভোরের কাগজ, ২৬ ডিসেম্বর)

খালেদা জিয়ার শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ এবং বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে নোংরা বক্তব্য একই সূত্রে বাঁধা। এরা আসলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে এরা কখনোই ভালবাসে নি, কখনোই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গৌরব বোধ করে নি। মুক্তিযুদ্ধ এদের কাছে গলায় বেধা কাঁটার মতো। না পারে গিলতে একে, না পারে উগড়ে দিতে। পারে শুধু সময়ে সময়ে এর গায়ে বিষ ঢেলে দেবার কাজটি করার।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণা হবে, এর সত্য-মিথ্যা আমরা যাচাই করা হবে গবেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে, কিন্তু একদল লোক এর প্রতি ঘৃণার কারণে দুইদিন পর পর একে অবমূল্যায়ন করে বক্তব্য দেবে, এটা হতে পারে না। এই দেশটা আকাশ থেকে একদিন টুপ করে পড়ে নি। নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী, প্রাণঘাতী যুদ্ধের মাধ্যমে এর জন্ম। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস, সেই নাড়ি ছেড়া সময়ের ঘটনাবলীকে, সেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জনপদ, এর সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষজনকে নিয়ে আজকে এতো দিন পরে এসে কয়েকজন কুলাঙ্গার মানুষ যা ইচ্ছা তাই বলে যাবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গণহত্যার জন্য যদি ডিনায়াল ল থাকতে পারে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, যার ক্ষয়ক্ষতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুলনায় খুব একটা গৌণ নয়, তার জন্য কেন থাকবে না?

দুর্গন্ধময় বিষাক্ত মুখ সেলাই করে বন্ধ করে না দিলে, এদের বিষ নিঃশ্বাসে বাতাস শুধু ভারিই হতে থাকবে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সংসদে পাশ করা ‘ল এগেইনস্ট ডিনায়াল অব হলোকাস্ট’ ইউরোপের অনেকগুলো দেশে চালু রয়েছে।। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানির নাৎসি বাহিনী ইউরোপে যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তাকে অস্বীকার কিংবা এর তীব্রতাকে হালকা করে দেখার যে কোনো হীন প্রচেষ্টাকেও আইনগতভাবে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই আইনে। গণ হত্যায় মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা, এমনকি প্রশ্ন তোলাকেও ক্রিমিনাল অফেন্স হিসেবে বিবেচনা করা হয় এই আইনে।

আর্নস্ট জুন্দেল একজন জার্মান। হলোকাস্ট ডিনায়ালের প্রকাশক হিসাবে স্বীকৃত তিনি। ১৯৫৮ সালে তিনি জার্মানি থেকে ক্যানাডায় চলে আসেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৯। সেই থেকে ক্যানাডাতে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রকাশনা সংস্থা খুলে বসেন। নাম সামিসদাত প্রকাশনা। এখান থেকেই প্রকাশিত হয় তাঁর নিজের লেখা ‘দ্য হিটলার উই লাভড এন্ড হোয়াই’ এবং রিচার্ড ভেরালের পুস্তিকা ‘ডিড সিক্স মিলিয়ন ডাই? দ্য ট্রুথ এট লাস্ট’। নাজি এবং নিও নাজি প্রচারণার বই-পুস্তক, পুস্তিকা প্রকাশ করে তা ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে সামিসদাত।

১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে বিপুল সংখ্যক বই, জার্নাল, নাজি প্রতীক, চলচ্চিত্র, ক্যাসেট এবং অন্যান্য সামগ্রীর প্রায় দুইশো চালান হস্তগত করে পশ্চিম জার্মানির পুলিশ। এর বেশিরভাগই আসছিলো ক্যানাডা থেকে। ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে পশ্চিম জার্মানির সরকার ক্যানাডিয়ান জুয়িশ কংগ্রেসকে চিঠি লিখে জানায় যে, এই সব জিনিস সব আসছে সামিসদাত প্রকাশনী থেকে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে জুন্দেলের চিঠিপত্র পাঠানোর অধিকারকে খর্ব করে দেয় ক্যানাডিয়ান সরকার। তাদের যুক্তি ছিল যে, জুন্দেল ঘৃণার প্রচারণা চালাচ্ছেন। ঘৃণা প্রচারণা ক্যানাডায় ফৌজদারি অপরাধ হিসাবে চিহ্নিত। ক্যানাডা থেকে এগুলো পাঠাতে না পেরে, জুন্দেল সীমান্তের ওপারে নায়াগ্রা ফলস থেকে পাঠানো শুরু করে।

১৯৮৩ সালে হলোকাস্টের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া সাবিনা সাইট্রন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়। নানা ঘাট পেরিয়ে ১৯৮৮ সালে অন্টারিও কোর্ট তাঁকে পনেরো মাসের জেল দেয়। কিন্তু, ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্ট এতে নাক গলায়, মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে তাঁর শাস্তিকে বাতিল করে দেয়।

২০০০ সালে তিনি টেনেসিতে চলে যান। ২০০৩ সালে ইমিগ্রেশন আইন ভঙ্গ করার জন্য গ্রেফতার হন। আমেরিকান কর্তৃপক্ষ তাঁকে ক্যানাডায় ডিপোর্ট করে দেয়। জুন্দেল প্রায় চল্লিশ বছর ধরে ক্যানাডায় থাকলেও তাঁর নাগরিকত্ব ছিল না। এই সুযোগ নিয়ে ২০০৫ সালে ক্যানাডা তাঁকে ফেরত পাঠায় জার্মানিতে।জার্মানিতে তাঁর বিচার হয় এবং ২০০৭ সালে পাঁচ বছরের জেলদণ্ড হয় তাঁর। যেহেতু আগেই দুই বছর জেল খেটেছেন তিনি, সে কারণে ২০১০ সালে মুক্তি পান। ক্যানাডায় ফেরার ব্যাপারে এখনো তাঁর উপরে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আর্নস্ট জুন্দেল শুধু একা নয়, গণহত্যাকে অস্বীকার করার জন্য আরো বহু লোকই জেল খেটেছে কিংবা অর্থদণ্ড প্রদান করেছে। সাব্বির খান সিলেট টুডে ডট কমে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘চক্রান্ত চলমান: ‘বার্গম্যান থেকে খালেদা; মজহার থেকে গয়েশ্বর’-এ লিখেছেন, “দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নাৎসি বাহিনী কর্তৃক গণহত্যাকে (হলোকাস্ট) ঠিক ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করতে চাননি বলে ডেভিড আর্ভিঙ নামের পশ্চিমের একজন খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ ১৩ মাস জেল খেটেছিলেন। অন্য এক ঘটনায় ‘প্রফেসর বার্নার্ড লুইস একজন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, যিনি যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তিনি ফরাসী পত্রিকা Le Monde তে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন ‘গণহত্যার সংজ্ঞায় পড়ে না বলে আর্মেনিয়ায় গণহত্যা হয়েছে বলা যাবে না।’ তাঁর এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আর্মেনিয়ানরা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় এবং এর সূত্র ধরে ফরাসি এক আদালত তাঁকে এক ফ্রাঙ্ক জরিমানা করেছিলো। আরেক ঘটনায় মার্কিন অধ্যাপক ও আইনজীবী পিটার আর্লিন্ডার রুয়ান্ডার গণহত্যাকে অস্বীকার করে এটাকে যুদ্ধের একটি বাই প্রোডাক্ট বলে অভিহিত করেছিলেন। এ কারণে গণহত্যা বিষয়ক মামলায় একটি পক্ষের আইনি পরামর্শক হওয়া সত্ত্বেও রুয়ান্ডার আদালত তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল।“

মাত্র এক প্রজন্ম আগে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে সীমাহীন সাহস দেখিয়েছেন, যে দৃশ্যমান দেশপ্রেম দেখিয়েছেন তার তুলনা মেলা ভার। মৃত্যুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, তার কোলে মাথা রেখে তারা অনবরত জীবনের গল্প লিখে গিয়েছেন আমাদের জন্যে। একটি অসম যুদ্ধে যে বিপুল বিক্রম নিয়ে তারা লড়েছেন তার তুলনা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া বিরল। এই সমস্ত অসমসাহসিক বীরদের কথা আমরা প্রায় সময় বলি ঠিকই, কিন্তু কখনোই সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করি না যে ঠিক কীসের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদেরকে, ঠিক কতখানি কষ্টসাধ্য ছিল তাদের যুদ্ধকালীন সময়গুলো, কতখানি জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল তাদেরকে বৈরী সময়ে।

একটি দেশকে জন্ম দিতে গিয়ে একাত্তরে কত কত অসংখ্য তরুণ প্রাণ হারিয়েছে এ দেশের কত কত অজানা অচেনা জায়গায়। দেশকে ভালবেসে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গিয়েছে কত শত তাজা প্রাণ। তাঁদের শরীরের রক্ত নির্যাস দিয়েই শ্যামল থেকে শ্যামলতর হয়েছে এই ভূখণ্ড। এদের রক্ত ঋণে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছি আমরা চিরতরে।

একাত্তরের লক্ষ লক্ষ শহীদ, যাঁরা তাদের সোনালি বর্তমানকে বিসর্জন দিয়েছিলেন আমাদের ভবিষ্যতের জন্য, তাঁদের কথা ভেবেই এই সব পাকিপ্রেমী পঙ্কিল লোকগুলোকে এক বিন্দু ছাড় দেওয়া উচিত না আমাদের।

ফরিদ আহমেদ, কানাডা প্রবাসী লেখক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ