আজ সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

নেহাত কতিপয় আমলার ষড়যন্ত্র নয়, সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক

ড. কাবেরী গায়েন  

কিছু আমলা ভুল বুঝিয়েছেন' বলেই অর্থমন্ত্রী আর প্রধানমন্ত্রী ক্রমাগত শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে হেনস্থামূলক বক্তব্য দিচ্ছেন বা প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের বিসিএস দিতে বলেছেন বলে যাঁরা বুঝেছেন এবং বুঝাচ্ছেন আমাদের, তাঁদের বলি, অনেক হলো। বরং, বিষয়টিকে এতো ছোট করে দেখাই বড় ভুল। ‘কিছু আমলার’ সাধ্য নেই এতোবড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার।


স্বাধীনতার পর থেকে যে সমতামূলক বেতন-কাঠামো (যদিও পাকিস্তান আমলে শিক্ষকদের বেতন-কাঠামো কয়েক টাকা বেশি ছিলো) গত ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে এসেছে, সেটি কেবল কয়েকজন আমলার চক্রান্তে নেমে যেতে পারে না। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক। প্রজাতন্ত্রের বেতন-কাঠামো নির্ধারণ অবশ্যই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।


সরকারের উপর বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সংকোচন নীতির যে 'পরামর্শ', যা ইউজিসির কৌশলপত্রে বলা আছে, যা সরকার গ্রহণ করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে, সেই রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের দায়িত্ব বরং পড়েছে আমলাদের উপরে সরকারের তরফ থেকে। আমলাদের দায়িত্ব যখন যে সরকার যেভাবে করতে বলে, সেই অনুযায়ী কাজ করা। আর তাই, সিনিয়র সচিবদের হাতে রাখার পুরস্কার হিসেবে দুই গ্রেড বাড়িয়ে এ কাজ করিয়ে নেয়া হচ্ছে।


এমনকি এরশাদ আমলেও ভিসি নির্বাচিত হয়েছেন শিক্ষকদের ভোটে। তথাকথিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হবার সাথে সাথে এই পদগুলোর চূড়ান্ত রাজনীতিকরণ হয়েছে। তাঁরা সরকারের আনুকূল্যে ক্ষমতায় বসেন এবং গোটা প্রশাসন সেই অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। তাই ছাত্রবেতনসহ ছাত্রদের যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রদের মুখোমুখি দাঁডিয়ে যান। সরকারী ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ব্যবহার করা হয় আন্দোলনকারী ছাত্রদের শায়েস্তা করতে। সান্ধ্যকালীন কোর্স বা অন্যান্য বাণিজ্যিক কোর্স চালানোর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধির পরামর্শও ইউজিসির কৌশলপত্রে রয়েছে। যা নিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যান প্রায়ই শিক্ষক-শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী-শিক্ষার্থী। এভাবে ক্ষমতাসীন সরকার (যখন যে ক্ষমতায়) শিক্ষকদের সাথে ছাত্রদের এবং ছাত্রদের সাথে ছাত্রদের একটি বিভেদ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই আজ শিক্ষকদের ন্যায্য আন্দোলনেও ছাত্রদের পাওয়া যাচ্ছে না সাথে।


বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এমনকি শিক্ষক সমিতিগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সরকার দলীয়। ফের বলছি, যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে। কাজেই সরকারের সাথে শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলন আর বেগ পায় না। কোনোভাবে সরকারের ভাবমূর্তি টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব তাঁদের উপরেই বর্তায়। কারণ সরকারের পতন হলে তাঁদের অসুবিধা।


গত ২৫ বছরে কোন ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। কোন সরকারই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর দায় নিতে সাহস করেনি। কারণ এসব ছাত্রসংগঠনের নির্বাচনে সবচেয়ে তরুণ জনগোষ্ঠীর পছন্দের প্রতিফলন হয়। আর অনির্বাচিত শিক্ষক-প্রশাসন সেই দায় নিতে ভরসা পায়নি। কারণ তাঁদের প্রশাসন চলাকালে যদি ছাত্রসংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারে সরকার সমর্থিত ছাত্রসংগঠন তবে ক্ষমতাসীন শিক্ষকরা ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। আরো একটি কারণে ছাত্রদের নির্বাচন দেয়া হয় না। সেটি হলো, সেই নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে, যাঁরা শিক্ষাসংকোচন নীতি এবং বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারে।


ফলাফল হলো, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং অন্যান্য দাতা গোষ্ঠীর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সংকোচন নীতি বাস্তবায়নের এক পর্যায় পর্যন্ত অনুগত শিক্ষকদের প্রয়োজন হলেও একটা সময় আসে, যখন তাঁদেরকেও ধাক্কা মারতে হয়। প্রক্রিয়াটিই এমন। আজ তাই-ই হচ্ছে।


একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলোধূনো করা হচ্ছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে, এইসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষা দেয়া হয় না বলে জনপরিসরে মতামত গড়ে তোলা হচ্ছে, ঠিক তখন নতুন ৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আর শিক্ষার মূল বাহক হবে না, হবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।


প্রধানমন্ত্রী বিসিএস দিতে বলার একদিনের মধ্যেই পত্রিকায় দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের চার দফা দাবি দুই দফা দাবিতে পরিণত হয়েছে। (কালের কণ্ঠ, ১৩ জানুয়ারি,২০১৬) কেবল ৭৬ অধ্যাপকের মর্যাদা সিনিয়র সচিবের সমান করার প্রস্তাব বহাল রয়েছে। এভাবে চললে, আশংকা করি, প্রধানমন্ত্রী আরো ভর্ৎসনা করলে, এই আন্দোলন অচিরেই থেমে যাবে। সত্যি কথা বলতে কি, প্রধানমন্ত্রীর মরীয়া বক্তব্যে মনে হয়, তিনিও কোথায় বাঁধা পড়েছেন, নয়তো কোনো প্রধানমন্ত্রীর এমন রুক্ষ বক্তব্য দেবার কথা না।


আমি মনে করি, বর্তমানের এই সমস্যা কেবল কয়েকজন আমলার ষড়যন্ত্রের সমস্যা কিছুতেই না। বরং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংকট। যা রাষ্ট্রের সাথে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং আগামীদিনের শিক্ষা-দর্শনের মোকাবেলার সংকট। এটি একটি ঐতিহাসিক ক্ষণ। উচ্চশিক্ষায় সাধারণের দুয়ার উন্মুক্ত রাখার জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের যৌথ আন্দোলন এবং উচ্চশিক্ষা ও সার্বিক শিক্ষায় রাষ্ট্রের বিনিয়োগ নিয়ে কথা বলার মাহেন্দ্র ক্ষণ। এই লড়াইয়ে হেরে গেলে পাবলিকের বিশ্ববিদ্যালয় অগত্যা রাষ্ট্রের সরকারী প্রাইমারী বিদ্যালয়ের মতো অবস্থায় উপনীত হবে। অতএব, সরকার দলীয় শিক্ষক নেতৃবৃন্দ এ পর্যন্ত যা করেছেন, সে'জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে, তাঁদেরকে সাথে রেখেই বা যে পয়েন্টের পরে তাঁরা আসলে আর যেতে পারবেন না আন্দোলন নিয়ে, সেখানে সাধারণ শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কনভেনশন গড়ে তুলে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে।

১০
এই আন্দোলনটি হবে রাজনৈতিক, তবে দলীয় রাজনীতির নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর রাজনীতির। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ষা করার রাজনীতি। উচ্চশিক্ষা সাধারণের আওতায় রাখার রাজনীতি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে 'গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়'-এ পরিণত করার জন্য রাষ্ট্রের সাথে সংলাপের রাজনীতি। ৪৫ বছর দেশ স্বাধীন হয়েছে, এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র কোন গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় বানানোর উদ্যোগ পর্যন্ত নেয়নি। শিক্ষকরা সবচেয়ে ভালো পড়িয়ে, সারাদিন বিভাগে বসে থেকে মাথা কুটে মরে গেলেও গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি না হলে কোনদিন বিশ্বব্যাংকে নাম উঠাতে পারবে না। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় না হওয়া পর্যন্ত আসলে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে না। ভালো কিংবা মন্দ ট্রেনিং ইন্সটিটিউট হয়।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাধারণ শিক্ষক হিসেবে মনে করি, আমার মতো যাঁরা সাধারণ শিক্ষক এবং রয়েছেন যাঁরা শিক্ষার্থী, ছাত্র সংগঠন- তাঁদের যৌথ আন্দোলন এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে পারতে পারে। মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার আন্দোলনকেও চলমান আন্দোলনের সাথে একাত্ম করে নেবার জোর দাবি জানাই। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা এই পারা-না-পারার সাথে ভীষণভাবে সম্পর্কিত।

কেবল ৭৬জন অধ্যাপকের বেতন সিনিয়র সচিবের সমান করার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা নিশ্চিত করা যাবে না।

ড. কাবেরী গায়েন, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬১ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৩ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৯ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ