আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

মাহফুজ আনামের প্যান্ডোরার বাক্স

মিলন ফারাবী  

প্যান্ডোরার বাক্সটি খুলে দিয়ে স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ভালই করেছেন। সত্য বলার নানা বিপদ। সেকথা  সবারই জানা। কিন্তু জেনে শুনে অর্ধসত্য, অর্ধমিথ্যা প্রচারেরও যে বিপদ কম নয়; হেনস্থা-হয়রানি কম নয়, সেটাও এই তারকা সম্পাদক হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।

আমরা মিডিয়াকর্মীরা ধরেই নিয়েছিলাম, কটুসত্য প্রকাশের চেয়ে মহলবিশেষের বহুরূপী অর্ধসত্যকে প্রচার-প্রকাশ অধিকতর লাভজনক। রাষ্ট্র-সরকার-বাহিনি-রাজনৈতিক দল, প্রেশারগ্রুপ-সোশ্যাল গ্রুপ- এদের সঙ্গে লেনদেন দহরম মহরমটা তখন জমে ভাল যখন মিডিয়াকর্মীরা অর্ধমিথ্যাকে রঙচঙ চড়িয়ে লেখেন।  সত্যের সন্ধানে প্রতিদিন বা যাহা বলি সত্য বলি- তকমা লাগিয়ে স্কুপ বা স্পেশাল রিপোর্ট বানিয়ে প্রকাশ করেন কাগজে।   

কিন্তু শেষ রক্ষা সর্বদা সর্বথা হয় না। কখনও বিবেক তাড়না দেয়। কখনও আরো ফোকাস, আরও চাঞ্চল্য তৈরির লোভে পুরানা দিনের রহস্যময় রিপোর্টের   ইনার স্টোরি বা আসল গোমর ফাঁস করি। ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করি- এরকমটা করলে সবাই বাহবা দেবে। বলবে, লোকটা কতবড় বিপ্লবী। কত বড় তার বুকের পাটা। নিজের অতীতের ভুল ও পাপ প্রকাশে মোটেও সে পিছপা নয়। এতে ইমেজ আরও বেড়ে হিমালয় হবে।

তারকা সাংবাদিক মাহফুজ আনাম সজ্জন। সদালাপী। নিপাট, নিখাদ ভদ্রলোক।  সদ্বংশীয়। উচ্চবংশীয়। তাঁর পিতা আবুল মনসুর আহমেদ সাহেবও চোস্ত কথাদুরস্ত ছিলেন। নইলে মন্ত্রী-অমাত্য হয়েও কেমন করে লেখেন ফুড কনফারেন্স। পিতার রাস্তায় মাহফুজ আনামও চমৎকার একটা দৃষ্টান্ত রাখলেন। একদা ভুল করেছিলেন, জেনে শুনে বিষ তুলে দিয়েছিলেন পাঠকদেরও কাছে। তাতে কি! এখন তিনি সেই ভুল সবার সামনে কবুল করে পাপস্খলনে মোটেও ভীতু নন।

আমি বিশ্বাস করতে চাই, আরও লাইমলাইট বা আরও খ্যাতি পাওয়ার লোভে নয়; তিনি বিবেকের তাড়নাতেই সেনাশাহী আমলে তল্পি-সাংবাদিকতার গোপনগল্প সবার কাছে তুলে ধরেছেন।

সেনাশাহী আমল- সেটা ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন জমানা কেন; স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম হারাম বাদশাহির মসনদদার জিয়াউর রহমান; তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি এরশাদ, সকল আমলেই নানা অর্ধসত্য রিপোর্ট মিডিয়াকে খাওয়ানো হয়। কখনও  জোর করে গেলানো হয়। অডিও ভিডিও , মতলবি নানা গোপন নথি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেয়া হয়। আমরা মিডিয়া কর্মীরা অনেকেই এক পায়ে খাড়া থাকি। ক্ষমতার মসনদদারদের সঙ্গে দহরম মহরম, লেনদেন সেটাকে আত্মশ্লাঘা তথা গৌরবের মনে করি। ভাবি মস্ত এক জুলিয়ান এসেঞ্জ হয়ে গেছি। আর আমার কাগজ বা মিডিয়া হয়ে গেছে উইকিলিক্স। আমার হিরো হওয়াও হবে। ক্ষমতার হালুয়ারুটির স্বাদ নেওয়াও হবে।

আমাদের সম্পাদকরাও কিছু কম নন। তারা  মধ্যরাতের অশ্বারোহী হয়ে অনেকে ঘোড়ার ডিম ফাটান। দেখা গেল, বার্তা সম্পাদক রাত বারোটায় পুরো কাগজ, হেডলাইন, লিড সাজিয়ে পত্রিকা প্রসবের অপেক্ষায় তখন বিপ্লবী সম্পাদক ছুটে এলেন বখতিয়ার খিলজীর মত- এসেই পুরো প্রথম পাতা উড়িয়েই দিলেন। পাঁচ কলাম  লিড লাথি মেরে হটিয়ে দিলেন; সেটা দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় জায়গা পায় কি পায় না অবস্থা।  অত রাতে কেমন করে এত তছনছ সামলানো সম্ভব। নতুন লিড কে লিখবে। স্টার রিপোর্টাররা কেউ নেই। আলহামদুলিল্লাহ। সম্পাদক সাহেব রেডিমেড রিপোর্ট সঙ্গে করে এনেছেন। এসব রিপোর্ট কোথাও না কোথাও তৈরি হয়; সে রহস্য অজানাই থেকে যায় মিডিয়া-মজুর বার্তাকেরানীদের। যত বড় ঝানু বার্তা সম্পাদকই হোক- এমন রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা কমবেশি সবার আছেই।

পবিত্র বাইবেলের শপথ, মাহফুজ আনাম এমন লিড ছত্রখান করা সম্পাদক একদমই নন। আর সেটা তিনি নন বলেই তো বিলম্বে হলেও অপ্রিয় সত্য নির্ভিকচিত্তে বলেছেন। তার সাহসকে অকুণ্ঠ চিত্তে সাবাসি দেই আমি।

অবশ্য এজন্য তাকে মাশুলও গুনতে হচ্ছে কম নয়।
সত্য মিথ্যা জানিনা, এক প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে বলছিলেন, আরিচা-দৌলতদিয়া দ্বিতীয় পদ্মা ব্রিজের কাজ সরকার আগামী বছরে শুরু করছে। স্কুপটা কাউকে খাইয়ে দাও। অবাক হলাম শুনে।

মাওয়ায় প্রথম পদ্মাব্রিজ করতেই সরকার হিমশিম। দ্বিতীয়টার টাকা পাবে কোথায়।
তিনি আমাকে রীতিমত হতভম্ব করে বললেন, দ্বিতীয় ব্রিজের টাকা দেবে মাহফুজ আনাম।
এতো টাকা স্টার সম্পাদকের। তার টাকায় আস্ত একটা ব্রিজ বানান সম্ভব। মাই গড।
বুঝলাম, সিনিয়র রগড় করেই কথাটা বললেন। তিনি হয়তো মাহফুজবৈরী। তাকে দেখতে পারেন না দুচোখে।

কিন্তু টাকার হিসেব যখন ভেঙে বললেন, আমার খাবি খাওয়া দশা। জানালেন, মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত টাকা আদায়ের মামলা হয়েছে- সেটা আমাদের বাজেটের তিনভাগের একভাগ। তা দিয়ে তিনটা ব্রিজ সম্ভব।

দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলাবাজি চলছেই। ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে সারাদেশে ৪৯টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি মানহানির মামলায় ৬১ হাজার ৫২২ কোটি ৫০ লাখ টাকার মানহানির অভিযোগ করা হয়েছে। বাকি ১১টি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ । এই টাকা একবার যদি আদায় করা যায়, অর্থমন্ত্রীর নিশ্চয়ই পোয়াবারো।


কি বলেছিলেন মাহফুজ আনাম। তিনি বাগাড়ম্বর করেছেন। কেউ কখনও জানতো না, এমন কোন ঐশী প্রত্যাদেশ কি তিনি বর্ণনা করেছেন!
এখানে রেফারেন্স দেখে আসা দরকার।
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ের দেওয়া সূত্রবিহীন খবর যাচাই না করে প্রকাশের বিষয়টিকে সহাস্য মুখে  সাংবাদিকতার ‘ভুল’  বলে স্বীকার করেছেন তিনি সম্প্রতি । তারপরই তোলপাড়।
তিনি বলেন, এটা আমার সাংবাদিকতার জীবনে, সম্পাদক হিসেবে ভুল, এটা একটা বিরাট ভুল। সেটা আমি স্বীকার করে নিচ্ছি।

স্টারের রজত জয়ন্তী মানে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এটিএন নিউজে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রশ্নের মুখে মাহফুজ আনামের এই  বিরল স্বীকারোক্তি আসে।

সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ডেইলি স্টারের বিতর্কিত ভূমিকার প্রসঙ্গ শুরুতেই সঞ্চালক তুললে তা অস্বীকার করেন মাহফুজ আনাম।

অনুষ্ঠানের আলোচক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ‘হেড অফ কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ও এডিটোরিয়াল পলিসি কো-অর্ডিনেটর’ গাজী নাসিরউদ্দিন আহমেদও তখন ডেইলি স্টার নিয়ে নানা অভিযোগের বিষয়টি তোলেন।

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা হস্তক্ষেপে গঠিত ফখরুদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ডেইলি স্টারের ‘সমর্থন’ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে।

তার আগে সিপিডির উদ্যোগে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের সহযোগিতায় দেশজুড়ে নাগরিক সংলাপে ‘বিরাজনীতিকরণের’ প্রচার চালিয়ে অসাংবিধানিক সরকারের প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছিল বলে সমালোচকদের যুক্তি।

আলোচনা সভায় বিষয়গুলো তোলা হলে মাহফুজ আনাম অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সুনির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করতে বলেন।

গাজী নাসিরউদ্দিন তখন শেখ হাসিনার ‘ঘুষ নেওয়ার’ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন, যা বন্দি আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের স্বীকারোক্তিতে এসেছে বলে কোনো সূত্রের উদ্ধৃতি ছাড়াই প্রকাশ করা হয়েছিল।

দুই প্রধান রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিতাড়িত করতে ওই সময় ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে তাদের চরিত্র হননের চেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রথমেই মাহফুজ আনাম বলেন, তখন ‘সবাই’ এই কাজ করছিল।

এরপর সূত্রবিহীন খবর যাচাই না করে প্রকাশকে ‘বিরাট ভুল’ হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, তখন এই খবর প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই তাদের সরবরাহ করেছিল।

ডেইলি স্টারের ওই সময়কার ভূমিকা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার দৈনিকটির অবস্থান নিয়ে সমালোচনা করেন।

এই স্লোগান ধরে অনুষ্ঠানে গাজী নাসিরউদ্দিন ডেইলি স্টার সম্পাদককে প্রশ্ন করেন, “তাহলে কি আপনারা ফিয়ার (ভয়) থেকে তখন (জরুরি অবস্থার সময়) ওই ধরনের সংবাদ ছেপেছিলেন। আর ফেভার (আনুকূল্য) থেকে বিদেশি দাতা সংস্থা কিংবা এনজিওদের বিরুদ্ধে কোনো খবর ছাপেন না।”

তবে মাহফুজ আনাম এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।  


মাহফুজ আনাম ভেবে চিন্তেই এই বিবেকের দংশন প্রকাশ করেন বলে ধারণা করা যায়। তবে, পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তিনি আন্দাজ করেছেন বলে মনে হয় না। তার বিবেক-দংশনের জের এখন ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। সরকারি দল কোমর বেধে ডেইলি স্টার শায়েস্তার  জেহাদে শামিল হয়েছে।  আর এই জিকো ভাইরাসে আক্রান্ত মন্ত্রী, এমপি, নেতা-ফিতা সবাই।

মিডিয়া কর্মীদের মাঝেও আলোড়ন কম নয়। আমরা আত্মবিশ্লেষণের মওকা পেয়ে মাতোয়ারা। আরও কিছু চাঞ্চল্যকর স্কুপ জানা যাচ্ছে এই উসিলায়। ডেইলি স্টারের সাবেক কর্মী ও সেনাজমানায় নির্যাতিত সাংবাদিক তাসনীম খলিল সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন-
এক-এগারোর সময় ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সঙ্গে ডিজিএফআইয়ের (সেনা গোয়েন্দা সংস্থা) বিশেষ ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ ছিল। সে কারণেই সংস্থাটির পছন্দ হয়নি বলে ডেইলি স্টারের ‘ফোরাম’ নামের ম্যাগাজিনের একটি সংখ্যা তখন বাজার থেকে প্রত্যাহারও করা হয়েছিল। ওই সংখ্যায় তারেক রহমান, ডিজিএফআই এবং জঙ্গি মদদের ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছিল। তাসনীম খলিল এক-এগারোর সময় ডেইলি স্টারের সম্পাদনা সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি এক পর্যায়ে ডিজিএফআইয়ের হাতে আটক হয়ে নির্যাতনের শিকার হন। ডেইলি স্টারের ফোরাম ম্যাগাজিনে ‘তারেক রহমান, ডিজিএফআই এবং জঙ্গি মদদের’ বিষয় নিয়ে প্রতিবেদনটি তিনিই করেছিলেন। তাসনীম ছাড়া পাওয়ার পর বাংলাদেশ ছেড়ে দেশের বাইরে চলে যান। এখন তিনি সুইডেন থেকে প্রকাশিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট ওয়ার্ল্ড রিপোর্ট’ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক।

তিনি বলেন, ‘মাহফুজ আনামের উচিৎ হবে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার স্বার্থে ওই সময়ে তার পত্রিকায় যা হয়েছে তা পুরোপুরি প্রকাশ করা। ডেইলি স্টারে সেই সময় ডিজিএফআইয়ের কনডুইট বা প্ল্যান্ট কে বা কারা ছিলেন তা জানানো। এজন্য একটি কমিশনও করা যেতে পারে।’

তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জানুয়ারি থেকে মে মাসে বিভিন্ন রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের চরিত্র হননকারী যে খবরগুলি ডেইলি স্টারে ছাপা হয়েছিল, সেগুলো কাদের অনুমতি বা প্ররোচনায় প্রকাশিত হয়েছিল? এ প্রশ্নের জবাব সম্ভবত মাহফুজ আনামই ভালো দিতে পারবেন।’

তিনি দাবি করেন, ‘রাজনীতিবিদদের নির্যাতন করে আদায় করা বক্তব্য তখন ডেইলি স্টারসহ আরও অনেক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বলা হচ্ছে তারা অডিও টেপ শুনে লিখেছেন। কিন্তু এগুলো ছিল ভিডিও টেপ। আর তাতে নির্যাতনের চিত্র স্পষ্ট ছিল। আর এ কারণেই চালাকি করে অডিও টেপের কথা বলা হচ্ছে।’

তাসনীম খলিল জানান, তাকে  গ্রেপ্তারের অনেক অনেক আগে থেকেই আমি নামে-বেনামে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পাচ্ছিলাম। এ ব্যাপারে আমি মাহফুজ ভাইকে বারবার অবহিত করেছি। তিনি খুব একটা আমলে নেননি, বরং আমাকে এই বলে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন, ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে তার এক ধরনের ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ আছে, তাকে না জানিয়ে ডেইলি স্টারের কোনও সাংবাদিকের ব্যাপারে সংস্থাটি কোনও পদক্ষেপ নেবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাহফুজ আশ্বাসে তাসনীমের রেহাই মেলেনি। বরং তাকে টর্চার সেলে নেয়া হয়।

এক-এগারো পরবর্তী সময়ে ডিজিএফআই কর্তৃক সরবরাহকৃত বানোয়াট খবর ছাপানোর ব্যাপারটি কিন্তু নতুন কিছু ছিল না। বিশ্বের অনেক জাতীয় নিরাপত্তাবাদী রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন সংবাদপত্রে গোয়েন্দা সংস্থাগুলির বশংবদ বা পালিত কিছু সাংবাদিক থাকেন। এরাই গোয়েন্দা সংস্থাগুলির ফরমায়েশি খবরের কনডুইট হিসেবে কাজ করেন। তারা বিভিন্ন সুযোগসুবিধার বিনিময়ে (আর্থিক সুবিধা, ‘স্কুপ’ এর লোভ) গোয়েন্দা সংস্থাগুলির ফরমায়েশ মতো খবর তৈরি করেন এবং প্রকাশ করেন। এটি তারা এক-এগারোর আগেও করেছেন, এক-এগারো পরবর্তী সেনা শাসনকালেও করেছেন ।


তাসনীম খলিলের তথ্যাদি বিষাদের ; তেমনি  কৌতূহল উদ্দীপকও। তার যে দু:খজনক অভিজ্ঞতা , তা অবশ্য মিডিয়ায় নতুন কিছু নয়। কিছু উদ্যমী সাংবাদিক যেমন লুকানো সত্য প্রকাশে মুখিয়ে থাকেন; পুল সিরাতের মত বিপদজনক রজ্জুপথে হাঁটেন, সেটা যেমন সত্য তেমনি মসনদদারদের একটু আনুকুল্য, দহরম মহরম পেতে ব্যাকুল সাংবাদিকও কম নন।

এখন সম্পাদকরা হলেন পত্রিকার লাবণ্য; ফেসক্রিম। তারা রাতের  পার্টি, ডিনার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ক্ষমতার  টপ লিঙ্কস মেইনটেইন করেন বার্তাক্লার্কদের ঘাড়ে চড়ে।

আগে সম্পাদক ছিলেন ইন্সটিটিউশন। জহুর হোসেন চৌধুরী, বজলুর রহমানরা এখন কেবল গল্পের চরিত্র। আর তাদের ইমেজের উপর ভর করে আমরা অনেকে সম্পাদক/বার্তা সম্পাদক হয়েছি সত্য, কিন্তু অধিসত্য হল- বার্তা সম্পাদক/ সম্পাদক এখন  সংবাদপত্রের প্রধান ব্যবস্থাপক/ মহাব্যবস্থাপক মাত্র। সংবাদপত্র ব্যবস্থাপনাকে এখন ব্যাঙ্কিং টার্মে ঢেলে সাজানোই ভাল। ব্যাঙ্কের মূল টার্গেট হল টাকা। অঢেল টাকা কামানোই ম্যানেজমেন্টের লক্ষ্য। সেসব হালাল করতে কিছু জাকাতি কর্মকাণ্ড- যেমন ছোট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, মেধাবৃত্তি।

সংবাদপত্রেরও মূল টার্গেট হল মুনাফা। টাকা, বিজ্ঞাপন, স্কিম,ব্যবসা বাণিজ্য। সেসবের হাতিয়ার হল কিছু অর্ধসত্য খবর। আর জাকাতি ফান্ড হল; কিছু হিউম্যান রিপোর্ট।

স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম নতুন কিছু বলেন নি। মিডিয়ার সবাই এইসব সত্য জানে। তিনি কেবল প্রতিষ্ঠিত গোপন সত্যে আলো ফেলেছেন। স্বীকার করেছেন মাত্র।

কেন তিনি এটা করলেন। হতে পারে, টিভি স্টেশনের সেই  আলাপনে বসে হঠাৎ তার মনে হয়েছে- তিনি কেবল  একটি ইংরেজি দৈনিকের মহা-ম্যানেজার নন। তিনি প্রতিষ্ঠানসম সম্পাদকদের উত্তরাধিকারও বহন করেন।  তিনি অধুনা-অপ্রচল সম্পাদক ইন্সটিটিউশনের প্রতি তার শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অপ্রিয় সত্য বলে। স্টার পত্রিকার রজতবার্ষিকীতে এই উপলব্ধি তার হয়েছে- এটা কেবল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়। সামাজিক দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানও বটে।

বিবেকের তাড়নায় কাজটা করে তিনি একা ফেঁসে যাবেন কেন। সেনা জামানায় এসব রিপোর্ট কোন পত্রিকা ছাপে নি। জবরদস্তি সরকারের আনুকূল্য ও আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য সব পত্রিকায় বিশেষ রিপোর্টার টিম বা সেল গঠন করা হয়েছে।  অনেকে এই টিমকে সকৌতুকে জলপাই সেল বলে ডেকেছি।

মাহফুজ সেই সত্য বলেছেন বলে  এখন সব দোষ তার হয়ে যাবে কেন ।  বাংলা ইংরাজি দৈনিকগুলোর সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকরা এই দায় ও লজ্জা কেমন করে অস্বীকার করবো।

সম্পাদক পরিষদ রয়েছে। সংবাদপত্র মালিক পরিষদ রয়েছে। ইদানিং এইসব প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত করে সংবাদপত্র মালিক-সম্পাদক পরিষদ বলাই উত্তম। এই সম্পাদকবৃন্দ কি করছেন। তারা কেন একযোগে মাহফুজ আনামের পাশে  দাঁড়াচ্ছেন না।  কাগজের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে  তাদের ঐক্য আছে। জঙ্গিবাদী ভুঁইফোড় সম্পাদক গ্রেপ্তার হলে তাদের মানপত্র মার্কা বিবৃতি আছে। কিন্তু যে সত্য তারকা মাহফুজ একা কাঁধে নিলেন, সেই সরল  সত্য কবুলে তাদের এত অনীহা কেন।

আট বছর আগে যে কাজ তারা সবাই একযোগে জোটবদ্ধ হয়ে করেছেন; সে দায় মাহফুজের একার নয়। সে দায় সকলের।

মিলন ফারাবী, সাংবাদিক।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ