আজ রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৯ ইং

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী! হ্যাঁ, আপনাকেই বলছি

সঙ্গীতা ইয়াসমিন  

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের বিশাল অঙ্কের অর্থ কেলেঙ্কারী প্রসঙ্গে বহুল পরিচিত একটি প্রবাদ এ মূহুর্তে যথার্থ বলেই মনে হচ্ছে-“মস্তিষ্কে যখন পচন ধরে তখন তা ছড়িয়ে পড়ে দেহের সকল অঙ্গে।” শরীরের যে কোন অঙ্গে ক্যান্সার একবার বাসা বাঁধলে তা অবধারিতভাবেই ছড়িয়ে পড়বে শরীরের অন্য যে কোন সুস্থ অঙ্গে। আর সে যদি হয় মস্তিষ্ক তবে তার ভয়াবহতা মারাত্মক, যন্ত্রণা অত্যাধিক। তবে, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এই ভয়াবহ ক্যান্সারকে পুরোপুরি জয় করতে না পারলেও উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে খুব ভাল চিকিৎসায় আপাত মৃত্যু রোধ করা সম্ভব করেছে।

বস্তুত চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, ক্যান্সারের চিকিৎসা মানে এর দ্রুত প্রসারমানতা স্তিমিত করে রোগীর বেঁচে থাকার মেয়াদ দীর্ঘায়িত করা। তবে শেষতক রোগীকে ক্যান্সারেই মরতে হয়। ক্যান্সার নিরাময়ের ক্ষেত্রে একথা যেমন চরম সত্য এবং বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত; ঠিক একইভাবে কোন দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তার আইনীকাঠামোয় দুর্বলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়াটাই সেই দেশের শাসন ব্যবস্থার জন্য ক্যান্সারস্বরূপ। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আইনের ব্রিচ হওয়া, খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাইয়ের বিচার হয়না, থানায় মামলা গৃহীত হয়না, অপরাধী ধরা পড়েনা, পড়লেও ছাড়া পেয়ে যায়; আর এইসকল দুর্বল আইনী চর্চাই আজকের এই পরিস্থিতি তৈরিতে সহায়তা করেছে যা দিনের আলোর মত স্পষ্ট। এক খুনের মাফ হয়ে গেলে অচিরেই আরও দশ খুন হবে যা আমরা দেখে আসছি, দেখছি, এবং অপেক্ষা করছি আগামীতে আরও কত ভয়াবহ মাত্রায় দেখতে হবে সেই আশংকা নিয়ে। এবং, খুবই হতাশার সাথে লক্ষ্য করছি, দেশ পরিচালনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ দেশের শাসন ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়া এই ক্যান্সার চিকিৎসার বিষয়টি আদতেই আমলে আনছেন না কিম্বা এর চিকিৎসা ব্যবস্থায় তারা অদক্ষ সে প্রশ্নের অনুসন্ধান জটিল গুঢ় রহস্যের জালে আবৃত এবং স্বভাবতই এটি জটিল গবেষণার বিষয়।

পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, শেয়ারবাজারের অর্থ কেলেঙ্কারি, ডেস্টিনি অর্থ কেলেঙ্কারি, মনে আছে বিজিবি কর্তৃক মন্ত্রীর গাড়িতে বস্তাভর্তি টাকা আটকের কথা, সোনালী ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখায় জালিয়াতি সহ হলমার্ক কোম্পানী কর্তৃক ৪০০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির কথা। যা আমাদের মত গরীব দেশের আর্থিক সম্পদের ওপর একটি বিশাল বড় ঝুঁকি। আর্থিক লুটপাটের ঘটনাগুলিই আমাদের জন্য আগাম এক সতর্কবার্তা নিয়ে এসেছিল; এবং একইসাথে জনগণের প্রত্যশা ছিল,  সরকার এগুলি বরদাস্ত করবেন না। কারণ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান সরকারেরই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমরা অতি আশ্চর্য হয়ে দেখতে থাকি, সময়ের স্রোতে সেসব ঘটনা চাপা পড়ে যায়, নীরব হয়ে যায় মিডিয়া, তদন্ত নামক হাস্যকর কার্যক্রমের কোন ফলাফল যথারীতি আজও জনসমক্ষে প্রকাশিত হয় না। হয়নি প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা, হয়নি চোরের বিচার, বাড়েনি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি প্রতিষ্ঠা পায়নি আইনের শাসন!

একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বলতা মানেই হল রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থা নামক দেহের অভ্যন্তরে কোনধরণের বিশেষ শক্তিশালী জীবানুর অনুপ্রবেশ। আর এই জীবানু হল ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থের প্রভাব, স্বজনপ্রীতি আর আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে সুবিধেবাজ লুটেরা শ্রেণীর ব্যবসা। সুতরাং, এসব জীবানুবাহী ভেক্টর যে বা যারাই হউন না কেন এই শক্তিশালী জীবানুদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে সঠিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাগ্রহণ তথা এর উত্থান, প্রসার, ও এর সম্ভাব্য ভয়াবহতা বিষয়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করাই একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের অন্যতম কাজ হওয়া উচিৎ। যদি কিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা গোষ্ঠী নিজেই এই জীবানু বহনকারী ভেক্টর না হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যদি সর্ষের মধ্যেই ভুত না থেকে থাকে তবে ভুত তাড়াতে কোন সমস্যা হবার কথা নয়। যদিও, আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন শাসকেরা আইনের শাসন কিম্বা সুশাসন বলতে আদতেই কোন বস্তু আছে বলে জানেন এবং মানেন কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমাদের দেশের প্রতিটি খাতে দুর্নীতি আর রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে জনগণের সম্পদ লুটের এই দৃশ্য সত্যজিতের “হীরক রাজার দেশ”কেই মনে করিয়ে দেয় কেবল। বাস্তবের এই দেশ, এর শাসনব্যবস্থা সিনেমার হীরক রাজাকেও হার মানিয়েছে এ কথা আজ নির্দ্বিধায় বলা যায়!    

আমরা আরও বিস্ময়ের সাথে অবলোকন করি, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক বিশেষ রীতি অনুযায়ী সবসময়ই যে কোন ঘটনার দায় এড়াতে উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে নামক কিছু মহান বক্তব্য আসে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকা প্রধান কর্তাব্যক্তিটির কাছ থেকে। যা জনগণকে কেবল বিভ্রান্তই করেনা, তৈরি করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আস্থাহীনতা এবং সর্বক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা।

পাঠক নিশচয়ই ভুলে যাননি, হলমার্কের ৪০০০ কোটি টাকার জালিয়াতিকে অর্থমন্ত্রী ‘তেমন কিছু নয়’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর এই বক্তব্য হাসির রসদ হিসেবে যতটা উপাদেয় ঠিক ততটা অদায়িত্বসুলভতার পরিচায়কও বটে। প্রকৃতপক্ষে, এ জাতীয় বক্তব্যের মানে দু’রকম;
১। তিনি এসব সমস্যার সমাধান করার মত যথেষ্ট সক্ষমতা রাখেন না।
২। তিনি আদতেই এগুলোকে কোন সমস্যা মনে করেন না; জনগণের সম্পদ লুটেপুটে খাওয়াটাই যেন রীতি।

আর সে কারণেই দেশের নিরীহ নির্বোধ জনগণকে ঘটনা থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরাতে তিনি এ জাতীয় বক্তব্য দিয়ে থাকেন। এবারেও তাঁর ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি; তিনি অভিমানের সাথেই ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের গভর্নরের চেইন অফ কমান্ড না মানার কথা, ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাপনার চেয়ে বিদেশ ভ্রমণকে গুরুত্ব প্রদানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তাকে না জানানোর কথা। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এই আবেগতাড়িত বক্তব্যের সাথে এবারে তিনি আরো এক হাত এগিয়ে গিয়ে গভর্নরকে পদত্যাগে বাধ্য করলেন। সেকারণে অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি সাধুবাদ পেতেই পারেন! কিন্তু এই সমস্যার সমাধান বা এর কারণ অনুসন্ধানে তিনি কী পদক্ষেপ নিয়েছেন আর গভর্নরের পদত্যাগই কী এর প্রকৃত সমাধান কিনা সে প্রশ্ন আজ দেশের সকল মানুষের।

খুব সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের এত বিশাল অঙ্কের অর্থ জালিয়াতির ঘটনা ঘটলে এর দায় কার ঘাড়ে বর্তাবে? যদি এই ঘটনার সাথে গভর্নরের সংশ্লিষ্টতা থেকেই থাকে তবে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিপ্রদানের জন্য সেটি প্রমাণের অপেক্ষা রাখে বলেই মনে করি। এবং প্রমাণসাপেক্ষে এর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব না হলে একই দায়ভার কেন অর্থমন্ত্রী নেবেন না কিংবা দেশের প্রধানমন্ত্রীও নেবেন না সেটি জিজ্ঞাসিতে জনগণের বুকের পাটা এতটুকুও কাঁপবে বলে আমি মনে করিনা।

যে দেশে ৩৭% মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করছে সেই দেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার চুরি যাওয়ার পরেও রাষ্ট্রের তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনোরূপ তৎপরতাও পরিলক্ষিত হচ্ছেনা। উপরন্তু, তদন্ত কমিটির আইটি বিশেষজ্ঞকে নিজেরই বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। এক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে কে বা কারা তাকে অপহরণ করেছিল? কাদের ক্ষমতার হাত এতো লম্বা যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী চাইলেও সেই হাতকে খর্ব করা সম্ভব নয়। আইনের চেয়ে, দেশের মানুষের চেয়ে, দেশের সম্পদের চেয়ে ব্যক্তি আর ব্যক্তিস্বার্থ কী এতোই বেশি ক্ষমতাধর এই প্রশ্ন এখন জনমনে সৃষ্টি করছে গভীর হতাশা, জন্ম নিচ্ছে তীব্র ক্ষোভ আর ক্রমশঃ বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা।

অতীব দুঃখের সাথে বলতে হয়, আমাদের রাজনৈতিক চর্চা ও এর সংস্কৃতি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের ‘শাসন ব্যবস্থা’ বললে সেটি সম্পূর্ণতা প্রকাশ পায়না, এর পূর্বে ‘সু’ যোগ করতে হয়; অর্থাৎ সু-শাসনের অভাব; ঠিক তেমনই আইনের প্রয়োগ বললে শব্দটি অপূর্ণ থেকে যায়; বলতে হবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ; কারণ, আমরা সুবিধেমত স্বার্থের প্রয়োজনেই আইনের প্রয়োগ করে থাকি; ক্ষমতার ব্যবহারের স্থলে অপব্যবহারই আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে গোচরীভুত হয়। সুতরাং আমাদের সবকিছুকেই একটু বাঁকাভাবে দেখা দরকার। ঠিক সোজা আঙ্গুলে ঘী না ওঠার মত করে আমরা ঠিক সহজ কথাটি সহজভাবে বলে বোঝাতে পারিনা। এখানে খুব সোজাভাবে বলা দরকার যে, ক্ষমতার মসনদে বসে আইনের শাসন না প্রতিষ্ঠিত করে আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে কীভাবে আরও বেশি অর্থ প্রতিপত্তির মালিক হওয়া যায় সেটিই এখন দেশসেবা, সেটিই এখন রাজনীতি।

কোন এক অজানা কারণে আমাদের সরকারগুলোর এক বিশাল মমতামাখা হাতের ছায়ায় সবধরনের রাষ্ট্রীয় সম্পদের অবৈধ ব্যবহার, লুন্ঠন, চুরি বৈধতা পেয়ে যায়। আর এভাবে বৈধতা পেয়ে যায়, খুন, হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ। নিজের বাসায় সাগর-রুনি হত্যার রহস্য আমরা আজও জানিনা, আমরা জানিনা কিশোর ত্বকী হত্যা রহস্য, আমরা আইনের আওতায় আনিনা নাস্তিক তকমা লাগানো কিছু স্বাধীন মতপ্রদানকারীদের হন্তারকদের, আমরা শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি থেকে আজকের ব্যাঙ্ক জালিয়াতি পর্যন্ত ঘটনাগুলোর নীরব সাক্ষী কেবল। আমরা সাক্ষী আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য আমাদের রক্ষাকবচ সুন্দরবন কর্পোরেট খেলার ক্রীড়নক হয়ে আজ ধবংসের জন্য প্রস্তুত। আর এখানেও আমাদের রাষ্ট্র নীরব। রাষ্ট্রের বরাবরই লুটেরার সাথে আঁতাত। এ কেমন দেশ আমার! এ কেমন তুমি মা আমার!

যদিও বলা বাহুল্য, আজকের গোলকায়নের বিশ্বে সাইবার ক্রাইম কোন নতুন ইস্যু নয়; ২০১৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ইস্ট ইউরোপের অনেক দেশ এবং রাশিয়াও এই ধরনের সাইবার ক্রাইমের শিকার হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্যাকারদের ক্ষমতার হাত অনেক বেশি শক্তিশালী; যা কিনা সাতদিনে একবার বিশ্বের যে কোন প্রান্তে থাকা যে কোন কম্পিউটারে আক্রমণ চালিয়ে সকল তথ্য নিয়ে নিতে সক্ষম; যার মূল উদ্দেশ্য ডাকাতি, ঘরে বসেই বিনে পুঁজিতে অধিক ব্যবসা। আর এর ফলাফল হতে পারে মুহূর্তের মধ্যেই কোটি কোটি ডলার লোপাট; যা সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য দুশ্চিন্তার কারণই বটে। কিন্তু তাই বলে সারা বিশ্বে কেউই প্রযুক্তি ব্যবহার বন্ধ করে সেই আদিম যুগে ফিরে যাননি। কেউই হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেননি। রাস্তায় দুর্ঘটনা থাকলে ঘরে বসে থেকে যেমন জীবন বাঁচানো যায়না, তেমনই হ্যাকারের দোহাই দিয়েও রাষ্ট্রীয় কোষাগার রক্ষা হয়না। এর জন্য প্রয়োজন, যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ। আর এই সাইবার ক্রাইম থেকে রাষ্ট্রকে তথা জনগণের সম্পদকে নিরাপদ রাখার দায় রাষ্ট্রেরই। আধুনিক প্রযুক্তির সাথে নিত্য নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন, সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষিতকরণ ও এর ব্যবস্থাপনায় যথাযথ গোপনীয়তা রক্ষাকরণই হল এর জন্য করণীয় প্রধান কার্যক্রম। আর এসব ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা, জবাবদিহিতা, দায়িত্বশীলতা, এবং দেশের সম্পদ সুরক্ষায় আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা। খুব দুখঃজনক হলেও প্রমাণিত সত্য যে, এর সবকটিতেই ঘাটতি রয়েছে আমাদের সরকারের।

বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থার সঙ্কটের ফলাফল কিম্বা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অভাবে রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গ যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে সে বিষয়ে বিশেষ কোন গবেষণা ছাড়াই সরল সমীকরণে উন্নীত হওয়া যায়। ক্যান্সারের লক্ষণের সাথেই এর তূলনা যথার্থ হয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের গুরুত্বপূর্ণ সকল অঙ্গই বিকল হয়ে যায়; একইভাবে বাংলাদেশেও সুশাসন প্রতিষ্ঠার অভাবে রাষ্ট্রের গুরুত্বপুর্ণ খাতসমূহ সর্বোচ্চ ঝুঁকির সীমা বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে। এখন সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে বিজ্ঞজন, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক সকলের একই জিজ্ঞাসা, একই আশঙ্কা; এর পরে আর কী...?

এহেন পরিস্থিতিতে, দেশের একজন অতি সাধারণ মানুষ হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমীপে আমার বিনীত জিজ্ঞাসা, দিনে দিনে বাড়ছে যে অন্যায় আর অবিচারের বোঝা, আইনের শাসনহীনতা, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অবহেলার ফলে আজ দেশ যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; তার কোনটির দায় আপনি অস্বীকার করবেন? আর আপনি চাইলেই কি এর দায় এড়াতে পারবেন?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সময়েই দেশ মধ্য আয়ের দেশ হয়, আপনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি কুড়ান, আপনিই নিজেদের খরচে পদ্মাসেতু তৈরির উদ্যোগ নিয়ে সফলতার সাথে তা বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনিই শত বাধা উপেক্ষা করে সপরিবারে বংগবন্ধু হত্যাসহ যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছেন। আমরা আপনার সকল ভাল কাজের জন্য সাধুবাদ জানাই। আমরা আপনার অকুতোভয় একাগ্রতাকে শ্রদ্ধা করি, আপনার দেশপ্রেমকে সরল শিশুর মতই দেখি, আপনার মধ্যেই আশ্রয় খুঁজি। আমরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দেখি আপনারই ভেতরে। সেই দেখায় রোমাঞ্চ আছে, আছে বিস্ময়, আবার শঙ্কায়ও থাকি! মন কেমন দ্বিধাহীন হয়ে উঠতে চায়, বলতে চায় তবে কী তিনি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে ব্যর্থ? তিনি কী খবর রাখেন না কী হচ্ছে দেশে? কেন তিনি কঠোরহস্তে সব দমন করছেন না? তবে কী আমরা ধরে নেব আসল ভুত সরিষায়?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বিস্মৃত হয়ে থাকলে আপনাকে কয়েকটি ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিই, তাজরিন ফ্যাশানের অগ্নিকাণ্ড, রানাপ্লাজার ইতিহাসের জঘন্যতম ধবংস, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড, মন্ত্রীর গাড়িতে লক্ষ লক্ষ টাকার বস্তা, সোনালী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি, এসবের পেছনের রথি মহারথি কে বা কারা? এবং কেন এইসব ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়না, কেন এসব অপরাধ আইনের মারপ্যাচে কেবল মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে যখন আপনি, বঙ্গবন্ধু তনয়া, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায়?

আর হ্যাঁ, সুন্দরবনে কয়লাচালিত বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপনা বিষয়ে এত আলোচনা, পরামর্শ ও আন্দোলনের পরেও আপনার উন্নাসিকতা আমাদেরকে সন্দিহান করে। আমরা দুঃখিত হই আটবছর আগে ভুলবশত কৃত অপরাধের দায় স্বীকারে দেশের একজন বিশিষ্ট, বর্ষীয়ান সাংবাদিকের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকার মানহানির মামলা হলে, আমরা আরো অধিক দু:খিত ও ব্যথিত হই আপনার পোষা ছাত্রলীগ নামের নোংরা কীটগুলো যখন টেন্ডারবাজির নামে আমাদের প্রিয় শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলে, আর আপনি থাকেন নীরব, নির্বিকার!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি মাতা, আপনি ভগ্নি, কিন্তু আপনি রাষ্ট্রনায়ক। তাই দেশের চরম সঙ্কটের মুহূর্তে একজন রাষ্ট্রনায়কের কান্নাও জাতির কাছে এক বিশাল জিজ্ঞাসা। যা প্রমাণ করে আপনি প্রয়োজনে কঠোর হতে পারেন না। আপনি আইনের সাহায্যে নয়, আবেগ দিয়ে শাসন করতে চান দেশ। সময় আপনাকে পরিহাস করছে বড়। ক্ষমতার কাছে নত হওয়া, অন্যায়ের সাথে আপোষ করা আপনাকে মানায় না। আপনাকে সবিনয়ে বলছি, বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ ডাকাতির এই ঘটনার অতিসত্বর পূর্ণ তদন্ত করে এর আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করুন। অবিলম্বে রামপালে কয়লাচালিত বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প বাতিল করে দেশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করুন।

আমাদের ষোল কোটি (চোর বাটপার বাদে) অসহায় মানুষ কেবল আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে। আপনি আরেকবার প্রমাণ করুন আপনি ‘শেখের বেটি’! অন্যথায় কোথায় গিয়ে দাঁড়াব আমরা? আমাদের জলে কুমীর, ডাঙায় বাঘ! কার পানে চেয়ে থাকবে আমাদের এই দুঃখিনি মাতা?

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, কানাডা প্রবাসী লেখক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৬ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭১ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৫ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫৩ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১১ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ