আজ সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

শান্তির সন্ধানে সংখ্যালঘু : সংখ্যালঘু নির্যাতনে সংখ্যাগুরুর দায়িত্ব

জুয়েল রাজ  

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলাদেশ। মেধা শ্রম দিয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে বাংলাদেশকে উজ্জ্বল করে তুলছেন আমাদের প্রবাসীরা। বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আজ ২৮ বিলিয়ন রিজার্ভের মালিক। বিশ্বকে তাক লাগিয়ে জিডিপি ৭% এর উপরে । ক্রিকেট খেলায় বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে আমাদের ক্রিকেট টিম। ৪৫ বছরের কলঙ্ক মুছে দিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের রাজাকার আলবদর সহ মানবতা বিরোধী অপরাধের অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। সাহিত্য সংস্কৃতিতে, শিল্পে সমান গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের প্রতিটা অর্জনে, সাত সাগর তের নদীর ওপারে খুশীতে উদ্বেলিত করে আমাদের। মাত্র এক রানে বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম যখন হেরে যায় চোখের পানি টলটল করে মনের অজান্তেই। বাড়ি গাড়ি মাস শেষে পাউন্ডের ঘ্রাণ যতোটা না আকুল করে, তার থেকে বেশি ব্যাকুল করে বাংলাদেশ। ধুলা মাখা পথ, মরা নদীর জল, পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা শরত, বসন্ত বুকের ভিতর নিয়ে পরবাসী জীবন বয়ে চলি আমরা প্রবাসীরা।

আজ বড় দুঃসময় পাড়ি দিচ্ছে বাংলাদেশ। ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। পত্রিকা টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমজুড়ে শুধু সংখ্যালঘু নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মান্তরিত করণ, লুটপাট, জমি দখল ঘরবাড়ি দখলের সংবাদ। যেন দানবের উন্মাতাল তাণ্ডব চলছে ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে। যার প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।

বাংলাদেশের সংখ্যালঘু
১৯৪১ সালে এই দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছিল মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৯.৭% ভাগ, ১৯৫১ সালে শতকরা ২৩.১% ভাগ, ১৯৬১ সালে শতকরা ১৯.৬% ভাগ, ১৯৭৪ সালে শতকরা ১৪.৬% ভাগ, ১৯৮১ সালে শতকরা ১৩.৩% ভাগ, ১৯৯১ সালে শতকরা ১১.৭% ভাগ এবং ২০০১ সালে শতকরা ১০.৩% ভাগ ২০১১ সালের জরিপ অনুযায়ী ৯.৬ ভাগ (সূত্র: জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো)।২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এর পরিমাণ আরও কয়েক শতাংশ কমে গেছে বলেই ধারণা করা যায়। এর ভিতরে হিন্দু,বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ছাড়াও কমপক্ষে আরো ৪৫টি আদিবাসী জাতির বসবাস বাংলাদেশে। তাদের সংখ্যা আনুমানিক ৩০ লক্ষ- যা পৃথিবীর অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশী। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় তাঁদের লোকসংখ্যা স্বল্প এবং তাঁদের রয়েছে ভিন্ন সংস্কৃতি। প্রতিটা সংখ্যালঘু দিনদিন কমে যাচ্ছে। তাই এর দায় কোনভাবেই আমরা এড়িয়ে যেতে পারিনা। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ১.৫৬৬%। কিন্তু সেখানে সংখ্যালঘু জনসংখ্যা বৃদ্ধি না পেয়ে দিনদিন কমছে।

গতবছর  ২০শে নভেম্বর ওয়াশিংটনে ফরেন রিলেশনস কমিটির হিয়ারিংএ এর চেয়ারম্যান এড. রয়েস জানিয়েছেন , 'বাংলাদেশ থেকে ১৯৪৭ থেকে এপর্যন্ত ৪৯ মিলিয়ন হিন্দু মিসিং হয়েছে।

আর এর প্রধান  কারণ নির্যাতন, নিপীড়ন, ধর্ষণ, হামলা মামলা, জবর দখল, ধর্মান্তরিতকরণ। দেশ স্বাধীন হবার পর, বাহাত্তর-পরবর্তী বিভিন্ন হামলা-নির্যাতনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬ শতাধিক সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। সংঘবদ্ধভাবে হামলা, নির্যাতন, লুটতরাজের ঘটনায় লক্ষাধিক সংখ্যালঘু সদস্য নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। ২০০১ সাল-পরবর্তী ১৩ বছরে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ২০ সহস্রাধিক ঘটনা ঘটেছে। ২০০১-০৬ মেয়াদ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে সংঘটিত সর্বাধিক বর্বরোচিত নৃশংসতা তদন্তের জন্য গঠিত কমিশনের একাধিক রিপোর্টেও সংখ্যালঘু নিপীড়ন-নির্যাতনের নানা চিত্র ফুটে ওঠে। সংখ্যালঘু পল্লীগুলোয় ৫ সহস্রাধিক হামলার ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করা হলেও কাউকেও শাস্তির আওতায় নেওয়া যায়নি। ফলে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজের ঘটনা ঘটেছে । হামলা, লুটপাট, ধর্ষণের পাশাপাশি বেপরোয়াভাবে হত্যাকাণ্ডও সংঘটিত হয়েছে। সেসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও দোষীদের কারও শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। কখনো ব্যক্তিবিরোধকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ দেওয়ার মতো ভয়াবহতাও ঘটেছে বিভিন্ন স্থানে। এতে হামলা, ভাঙচুর, লুটতরাজের শিকার হিন্দু পরিবারগুলো আরও বেশি নৃশংসতার মুখে পড়ে নিঃস্ব অবস্থায় এলাকা ছাড়তেও বাধ্য হয়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন নেমে আসে তা কল্পনাতীত। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে গঠিত তদন্ত কমিশন ৫ হাজার ৫৭১টি অভিযোগ পায়। 

জোট সরকারের আমলে হামলা-সন্ত্রাস লুটতরাজসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাবলিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে ৫ হাজার ৮৯০টি মামলা প্রত্যাহারও করা হয়। ফলে এসব মামলার ১২ হাজার অপরাধী শাস্তি ছাড়াই বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেসব অপরাধী আবারও সংখ্যালঘু নির্যাতনের হোলিখেলায় মেতে উঠেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের শেষ চার মাসে আরও প্রায় দেড় হাজার হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে চিহ্নিত দুর্বৃত্তরা। বিভিন্ন সময়ে হামলা-অত্যাচারের নির্মমতায় ভুক্তভোগীরা জানান, রাজনৈতিক পালাবদল, প্রতিহিংসা, সহায়-সম্পদ জবরদখলের লোভ আর নানা কূটকৌশলের ঘুঁটি হিসেবে বারবার সংখ্যালঘুরা নৃশংসতার শিকার হন। ২০০১ সাল থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধ বিচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত হামলার শিকার হয়েছেন সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়সহ পাহাড়ি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষ। এ সময়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগের ২০ সহস্রাধিক ঘটনা ঘটেছে। দুই শতাধিক এলাকায় মুসলমানদের পাশাপাশি খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের অবস্থান থাকলেও সারা দেশেই কম-বেশি বসবাস রয়েছে হিন্দুদের।  ২০০১ সাল-পরবর্তী সংখ্যালঘুরা আইন ও প্রশাসনের আশ্রয় নিতে চাইলেও কোনো ফল পায়নি বরং নিপীড়নের মাত্রা বেড়েছে।

২০১৫ সালের বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর কমপক্ষে ২৬২টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এ সবের অধিকাংশ একক ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি, পরিবার ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার সংখ্যা কমপক্ষে ১৫৬২টি। এ সময়ে বিভিন্ন হামলার ঘটনায় ২৪জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ২৩৯জন, অপহরণের শিকার হয়েছেন ২৪ জন সংখ্যালঘু নারী যাদের মধ্যে ৯টির ক্ষেত্রে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের অভিযোগ রয়েছে। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৫ জন। তাদের মধ্যে ১০জন গণধর্ষণের শিকার, ২জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছেন ৪জন, তাদের মধ্যে একজনকে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এসিড সন্ত্রাসের শিকার ১জন। জমিজমা, ঘরবাড়ি, মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, দখল ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ২০৯টি। এর মধ্যে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে ৬০টি পরিবার। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ৩১টি। প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে ১৮০ টি. এই রিপোর্ট পেশ করে বাংলাদেশ মহিলা ঐক্য পরিষদ।

২০১৬ সালে বাকেরগঞ্জের কবাইতে সন্ত্রাসীদের কাছে জিম্মি এক সংখ্যালঘু পরিবার। নারীপ্রধান এই পরিবারটির উপর অত্যাচার করে এলাকা ছাড়া করার পরে তাঁদের জমি দখলের চেষ্টা দিয়ে শুরু হয়েছিল।   এর পর থেকে এমন কোন দিন নেই পত্রিকায় পাতায় সংখ্যালঘু নির্যাতন, ধর্ষণ হামলা, খুন কিংবা অপহরণের কোন সংবাদ নাই।সর্বশেষ হরিবাসরে খুন হলেন নববিবাহিত সনাতন। এই দায় সরকার যেমন এড়াতে পারেনা তেমনি আমাদের সুশীল সমাজ কিংবা সাধারণ মানুষের ও এড়িয়ে  যাওয়ার সুযোগ নেই।

১৯৭১ সালে সেই আঘাত শুরু হয়েছিল; আজও সময়ে-সুযোগে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুরা অনুরূপ আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে। নির্বাচন প্রতিবাদ, দলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ- সবকিছুই শেষে গিয়ে ধাক্কা খায় হিন্দুদের বাড়িঘর-সম্পত্তির ওপর।

অন্যান্য সময় সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা বাধা হয়ে দাঁড়াতেন। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন।  আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় থাকতে দেখা গেছে। কোন কোন স্থানে আওয়ামীলীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও এসব ঘটনা ঘটাচ্ছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে স্বাধীন করা অসাম্প্রদায়িক একটা দেশে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের বিরুদ্ধে নীরবতাই বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস পাচ্ছে হাতেগোনা কিছু মানুষ। রাজাকারের ফাঁসির দাবীতে, শাহবাগ এই বাংলাদেশেই জেগে উঠেছিল, সম্প্রীতি তনু হত্যার সর্বজনীন প্রতিবাদ বাংলাদেশিই হচ্ছে এই দেশের মানুষই করছেন। তবে সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে নয় কেন?

দানবের কাছে মানব হেরে যাওয়ার কথা নয় নিশ্চিত। আজকের বাংলাদেশ ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ না। আজকের বাংলাদেশ ৫২র ভাষা আন্দোলনের বাংলাদেশ না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে সরকার পরিচালিত হলেও সংখ্যালঘুরা হামলা থেকে রেহাই পাননি। দেশের সকল প্রান্তে থেমে থেমে হামলা পরিচালিত হয়েছে এ সরকারের আমলেও। সকল ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কমবেশি হামলার শিকার হয়েছে। তবে গেল (২০১৩) ২৮ ফেব্রুয়ারি অন্যতম শীর্ষ ও নৃশংসতা যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষিত হওয়ার পর সংখ্যালঘুদের উপর দেশব্যাপী একযোগে সবচেয়ে বড় হামলা পরিচালিত হয়।

সেই থেকে অদ্যাবধি প্রতিনিয়ত দেশের কোনো না কোনো স্থানে তাদের উপর হামলা চলে আসছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট বিভিন্ন কর্মসূচি পালনকালে তাদের উগ্র এবং সন্ত্রাসী কর্মীবাহিনী সংখ্যালঘুদের উপর হামলে পড়ছে। কোথাও কোথাও আবার সরকার সমর্থক সন্ত্রাসীরাও এ ধরনের হামলা পরিচালনা করছে। ব্লগার অনলাইন এক্টিভিষ্টদের একের পর একের খুন করা হচ্ছে প্রকাশ্যে রাস্তায়। সেই বিচারগুলো আমাদের আশার আলো দেখাতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপর ক্ষোভ নেই, তবে অভিমান আছে ।কারণ, যিনি বাংলাদেশকে কলঙ্কমুক্ত করতে,  নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজেকে অনিরাপদ করে তুলেছেন। সেই ভয়টা ও আমাদের আছে। তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ আছে। যদি ও বারবার বলছেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সবাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। নিরাপদে বসবাস করবে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

সুতরাং শুধু কথায় নয়,  কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে তাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন। বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় বৈচিত্র্য রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে সরকারকে নিম্ন বর্ণিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে ধর্মীয় নৃগোষ্ঠীর অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

১. ধর্মীয় নৃ গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন এবং মন্ত্রী পরিষদ ও সংসদে ১৫% সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা ।
২. প্রশাসনিক উচ্চপদে আনুপাতিক হারে ধর্মীয় নৃগোষ্ঠীর নিয়োগ দান,
৩. বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ১৯৯০-২০১৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের  হোতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
৪. পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণ ও সাজার ব্যবস্থা করুন,
৫. নীতিনির্ধারক গোষ্ঠিতে ধর্মীয় নৃগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্তিকরণ,
৬. সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের বিচারের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন,
৭. পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, বিজেপি ও গ্রামরক্ষী বাহিনীতে ১৫% সংখ্যালঘু হিন্দুর নিয়োগ দান,
৮. সন্ত্রাসীদের অর্থের উৎস ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, শিক্ষালয় সরকারের বাজেয়াপ্তকরণ,
৯. সংখ্যালঘু এলাকায় সংখ্যালঘুর দ্বারা সশস্ত্ররক্ষী বাহিনী গঠন,
১০. ২০০১ সালে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের  জন্য ড. সাহাবুদ্দীনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করা।
১১. রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাতিল করে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিস্থাপন করা ( ৭২ এর মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া)

উপসংহার:  
বাংলার হিন্দু, বাংলার মুসলিম, বাংলার বৌদ্ধ ,বাংলার খ্রিষ্টান আমরা সবাই বাঙালি । এই দেশে প্রতিটি মানুষের অধিকার সমান। এই দেশে প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক অস্তিত্বকে নষ্ট করে দেবে, আর আমাদের সরকার  রাষ্ট্র, সাধারণ জনগণ, সুশীল সমাজ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবেন ? নগরে আগুন লাগলে যেমন দেবালয় অক্ষত থাকেনা তেমনি আজকে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হয়েছে আগামী দশ বছর পর আপনিও আক্রান্ত হবেন। তাই এখনি রুখে দাঁড়ানোর সময়। আপনার আমার সকলের।

আমরা সেকুলার বাংলাদেশ মুভমেন্ট ইউকে  মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত একটি বাংলাদেশ দেখতে  চাই।  বাংলাদেশে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক কোন বিলাস চরিতার্থ করতে আসব না কোনদিন। আমাদের তৃতীয় প্রজন্ম যারা প্রবাসে বেড়ে উঠছে তাঁদেরকে আমরা আমাদের গর্বিত ইতিহাসের পরিচয়ে বাংলাদেশি হিসাবে বাঙালি হিসাবে পরিচিত করতে চাই। যারা বাংলাদেশের পরিচয়ে প্রবাসে বাংলাদেশকে উজ্জ্বল করবে। তাই সংখ্যাগুরুকে সেই দায়িত্ব নিতে হবে। নির্যাতিত সংখ্যালঘুটি আপনার প্রতিবেশী, আপনার  স্বপ্ন দেখা সময়ের সারথি, সাঁতার কাটা সময়ে ডুবতে ডুবতে যে হাত ধরে টেনে তুলেছে আপনাকে। যার সাথে হাতে হাত ধরে মাছ ধরেছেন, গোল্লাছুট, কানামাছি ভোঁ ভোঁ করেছেন।

আমাদের শৈশব কৈশোরের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ কে ফিরে পেতে চাই। জননী জন্মভূমির টানে, নাড়ির টানে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে বারবার ফিরে আসতে চাই লালন, হাসন, রাধারমণ, শাহ আব্দুল করিমের ভাঁটির দেশে। বসন্তের দেশে, উৎসবের দেশে, নবান্নের দেশে, ভাইয়ের মায়ের স্নেহের দেশে। পদ্মা,  মেঘনা সুরমা, কুশিয়ারা, বিবিয়ানার জল ছুঁয়ে,  ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা মাটি, আমাদের অস্তিত্বজুড়ে। দানবরা হেরেছে যুগে যুগে, মানুষই পেরেছে, মানুষই পারে, মানুষই পারবে বিজয়ী হতে।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। সংখ্যালঘুরা সেই  বিশ্বাস নিয়েই এখনো টিকে আছে।  

তথ্য সূত্র: বিভিন্ন পত্রিকা,  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এর প্রতিবেদন

গত শনিবার, ৯ এপ্রিল ২০১৬, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে,  ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মানুষদের উপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতন বন্ধের  দাবীতে এবং  সমাজে   সব ধর্মের  মানুষদের মধ্যে সমঅধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান (Coexistence) নিশ্চিত করার লক্ষ্যে "শান্তির সন্ধানে সংখ্যালঘু" শিরোনামে সেকুলার বাংলাদেশ মুভমেন্ট এবং সিপিআরএমবি (ক্যাম্পেইন ফর রিলিজিয়াস মাইনরিটিস ইন বাংলাদেশ) কর্তৃক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পুস্পিতা গুপ্ত, আহ্বায়ক ও মুখপাত্র সেকুলার বাংলাদেশ মুভমেন্ট, ইউকে ।

জুয়েল রাজ, ব্রিটেন প্রবাসী সাংবাদিক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ