আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

গরিলা-থ্রি গণতন্ত্র!

শেখ মো. নাজমুল হাসান  

একটা বাস্তব ঘটনা বলি।

 ওয়ালটন একটা এ্যাড দেয়- “দেশি পণ্য কিনে হও ধন্য”। খুবই ভাল কথা। ধন্য হতে কে না চায়। তাছাড়া আমার মধ্যে এমনিতেই একটা দেশি চেতনা কাজ করে। ফলে আমি এ্যাডটারে গুরুত্বসহকারে নিলাম। দেশি জিনিস কিনে ধন্য হবার সিদ্ধান্ত নিলাম।

 আমার বড় ভাই আমার চেয়ে আরও এক ডিগ্রি উপরে। আমি যখন কিনব করছি, তিনি তখন তা কিনে ফেলেছেন। দেখতে-শুনতে ভারী সুন্দর। ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম- সার্ভিস কেমন? ভাই বললেন- খুব ভাল।

 তাহলেতো আর কথাই নেই। আমার পরিবারে ওয়ালটন মোবাইল কিনে ধন্য হবার ধুম পড়ে গেল। ভাইয়ের ছেলে এসএসসিতে ভাল ফলাফল করার পরে তারেও একটা ওয়ালটন মোবাইল কিনে গিফট করা হলো। আমিও নিজের জন্য সবচেয়ে বেশি দামের ওয়ালটন মোবাইলটা কিনে ফেললাম। আমার মেয়েকেও একটা দিলাম। পুরো ওয়ালটন মোবাইল পরিবার হয়ে গেলাম।

 ভিতরে ভিতরে খুব গর্ব অনুভব করি, আমি দেশি পণ্য ব্যবহার করছি। পরিচিত মহলে একটু ভাব-টাবও নেবার চেষ্টা করলাম। দেশপ্রেম ঝাড়া আর কি! সবাইরে পরামর্শ দেই, ভাই দেশি পণ্য কিনেন। ভাল জিনিস, দ্যাখেন আমি ব্যবহার করছি।

 ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের ব্যাপারে আমি খুব আনাড়ি। আমার দুই বাচ্চা যা সিদ্ধান্ত দেয় আমি তাই করি। তো, ওয়ালটন মোবাইল যেদিন কিনতে গেলাম সেদিন আমার দুই বাচ্চাও সাথে গেল। তারা আমার এ্যডভাইজার। শর্ত, তাদেরকে খাওয়াতে হবে। কোন অসুবিধা নাই। পুরো পরিবার চলে গেলাম ওয়ালটন মোবাইল কিনতে। বসুন্ধরা সিটির ওয়ালটনের শো রুমে ঢুকলাম।

 আমার বাচ্চারা ওয়ালটনের লেটেস্ট ভার্সন পছন্দ করলো। লিটারেচার পড়ে আমার ছেলে বলল- “বাবা হেভি তো, এইটার স্ক্রিন গরিলা গ্লাস থ্রি!”। আমি বললাম সেইটা আবার কী জিনিস বাবা? আমার ছেলে আমার আনাড়ি অবস্থা জানে। সে আমারে উদাহরণ দিয়ে বোঝালো-

ছেলে বলল- “নোকিয়া মোবাইলের স্ক্রিন হচ্ছে ‘গরিলা গ্লাস ওয়ান’। আমার বন্ধুরা বলে, ‘নোকিয়া মোবাইল দিয়ে ক্রিকেট খেলা যায়।’ একটা ফান আছে, সেখানে বলেছে- নোকিয়া মোবাইল যেন কখনও হাত থেকে পড়ে না যায়, যদি পড়ে তাহলে মোবাইলের কিছু হবে না কিন্তু ফ্লোর ফেটে যাবে। ফ্লোরের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।”। এবারে বোঝ! গরিলা গ্লাস ওয়ান যদি এইরকম শক্ত হয়, তাহলে গরিলা থ্রি গ্লাস কীরকম শক্ত হবে। তুমি এইটা দিয়ে পেরেক পুঁততে পারবা। হাতুড়ী লাগবে না।

 আমি গদগদ হয়ে পঁচিশ হাজার পাঁচশ টাকা দিয়ে গরিলা গ্লাস থ্রি ওয়ালা ওয়ালটন মোবাইল কিনে ফেললাম। কাভার-টাভার মিলিয়ে খরচ পড়ল ছাব্বিশ হাজার টাকারও বেশি। আমার মত গরীব মানুষের জন্য সেরের উপরে শোয়াসের। আমি গেছি সর্বোচ্চ দশ/বারো হাজার টাকার মধ্যে মোবাইল কিনতে। তবু বাচ্চাদেরকে খুশী রাখতে শেষ পর্যন্ত এতো দামের মোবাইলটাই কিনে ফেললাম। যা থাকে জীবনে।

 কেনার নবম দিনে মোবাইলের স্ক্রিনে সমস্যা দেখা দিলো। স্ক্রিন ফাটা। ছোট ফাটা থেকে দিনে দিনে ফাটা বড় হয়। সার্ভিস সেন্টারে যাবার সময় করা মুশকিল, তারপরেও সময় বের করে গেলাম ওয়ালটনের সার্ভিস সেন্টারে। সে কী অবস্থারে ভাই। ভিড়ের জ্বালায় দাঁড়ানো যাচ্ছে না। মাত্র কিছুদিন হলো তারা বাজারে মোবাইল ছেড়েছে, এর মধ্যে মনে হয় তাদের সব মোবাইলই নষ্ট হয়ে গেছে।

 সার্ভিস সেন্টারের মধ্যে এক কাস্টমfর ধুমায় চিল্লা-চিল্লি করতেছে। আমার মনে হল, লোকটা কী অভদ্র রে বাবা। এমন সুনসান যায়গায় এমনি করে চিল্লায়! সার্ভিস সেন্টারে কর্মরত ব্যক্তিরসাথে ভদ্রলোকের কথা-বার্তা এরকম-

 - ভাই আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই না। আপনি আপনার কাস্টমার ম্যানেজারকে ডাকুন। আমি তারসাথে কথা বলব।
- না, স্যার আপনি যা বলার আমাকে বলুন। আমি সমাধান করে দিচ্ছি। তার তো এখানে আসার নিয়ম নাই। তিনি আসতেও পারবেন না।
- রাখেন আপনার নিয়ম। তারে আসতে কন, নইলে আমি ভাঙচুর শুরু করবো।

 কিছুক্ষণ পরে কাস্টমার ম্যানেজার আসলেন। ভদ্রলোক এবারে সপ্তমসুরে চিল্লানো শুরু করলেন। কথাগুলি এইরকম-

ওই মিয়া, ফাইজলামী করেন! মোবাইল কেনার দুই সপ্তাহের মাথায় ডিস্টার্ব দিছে। এইখানে আনছি, আমারে এক সপ্তাহ পরে আসতে কইছেন, আমি আসছি। আসার আগে ফোন করে আসছি। এসে দেখি আমার মোবাইল ঠিক হয় নাই। আবার পরের সপ্তাহে আসতে কইছেন, আমি আসছি। সেবারেও ফোন করে আসছি। এসে দেখি সেদিনও মোবাইল ঠিক হয় নাই। আবার আজকে আসতে কইছেন, আজও আমি আগে ফোন দিয়ে নিশ্চিত হয়ে তারপরে আসছি। আজও আমার মোবাইল ঠিক হয় নাই। কাস্টমারের সাথে ইয়ার্কি মারেন মিয়া। থাপড়ায়ে চোয়াল ভেঙ্গে দেবো। কাজ না হলে বলবেন হয় নাই, ব্যাস কথা শেষ। এই রকম ভঙবাজ করেন ক্যান?

ভিড়ের জ্বালায় বসার যায়গা নাই। সোফা-টোফা যা আছে তা সব ভরা। দাঁড়ায়ে থাকতে থাকতে কোমর ব্যথা হয়ে গেছে। একসময়ে আমার ডাক পড়ল। কাউন্টারে চলে গেলাম। মোবাইলটা দেখালাম। কথাবার্তা যা হলো তা এরকম-

 - স্যার, এটাতো ঠিক করা যাবে না।
- (আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। কয় কী! এতোগুলো টাকার মোবাইল। মাত্র নয়দিন হইছে কিনছি। এখন এটা ঠিক করা যাবে না! মাথা ঠাণ্ডা রেখে জিজ্ঞেস করলাম..) কেন ঠিক করা যাবে না, জানতে পারি?
- স্যার, এই গ্লাস এখনও সার্ভিস সেন্টারে আসেনি।
- আসেনি তবে এই মোবাইল বাজারজাত করছেন কেন?
- স্যার, সেটা কোম্পানির ব্যাপার। আমরা সার্ভিস সেন্টারে কাজ করি। ওটা আমাদের ব্যাপার না।
- কবে আসবে?
- তা বলতে পারবো না স্যার।
- বিষয়টা তো আমার জানা দরকার। কতোদিন লাগবে সেটা অন্তত আমাকে না জানালে আমি এটা ঠিক করবো কীভাবে?
- (কোথায় যেন ফোন করে কথা বলে, আমাকে বলল..) স্যার, কমপক্ষে দু মাস লাগবে। তবে সেটা নিশ্চিত না।
- (আমি এমনিতেই মাথা-গরম মানুষ। আমার মেজাজের কী অবস্থা বোঝেন। তবু মাথা ঠাণ্ডা রেখে জানতে চাইলাম..) তো, একজন কাস্টমার এই দুই মাস মোবাইল ছাড়া থাকবে?
- আমার তো কিছু বলার নাই।
- আচ্ছা আপনাদের অন্য কোন অফিস আছে যেখানে আমি বিষয়টা আলাপ করতে পারি।
- আছে স্যার।
- আমাকে তার নাম্বারটা দিন। (ছেলেটা আমাকে একটা নাম্বার দিলো।)। আচ্ছা, একটা বিষয় জানতে চাচ্ছি বলতে পারবেন?
- জি বলুন?
- আমার এই মোবাইলের স্ক্রিনটা কী গ্লাস দিয়ে তৈরি বলতে পারবেন?
- স্যার, গরিলা গ্লাস থ্রি।
- আপনি শিওর, নাকি এখানে চাকুরী করেন বলে বলতে হচ্ছে?
- স্যার, আমি শিওর।
- আপনি শিওর হতে পারেন, তবে আপনি ভুল। এইটা গরিলা গ্লাস থ্রি দিয়ে তৈরি না।
- কি বলেন স্যার!
- এইটা গরিলা গ্লাস থ্রি দিয়ে তৈরি তো না-ই, এমনকি গেরিলা গ্লাস টু-ও না, ওয়ান-ও না। এইটা কোন গেরিলা গ্লাসই না। এইটা হচ্ছে বান্দর গ্লাস, একবারে দেশি বান্দর গ্লাস। ধেড়ি বান্দরও না, মেড়ি বান্দর গ্লাস।
- স্যার স্যার।
- চুপ করেন। বহুত হইছে।

 আমাদের তথ্যমন্ত্রী ইনু সাহেব বলেছেন, দু/চার জন ব্লগার মরলে তাতে গণতন্ত্রের কিছু হয় না। গণতন্ত্র তো কাঁচের গ্লাস না যে ভেঙ্গে যাবে।

 মাননীয় মন্ত্রীকে বলতে চাই- এদেশের গরিলা গ্লাস থ্রি-ও খামোখা ভেঙ্গে যায়। ভাঙ্গে তো ভাঙ্গে তা আর ঠিকও করা যা না। আর এ দেশের গণতন্ত্র কিন্তু দু নম্বরি গ্লাস দিয়ে তৈরি। পুরো ভেজাল দেশি মশলা!

পাদটীকা: বাসায় কেনা ওয়ালটনের চারটে মোবাইলকেই ফেলে দিতে হয়েছে। কোনটাকেই আর ঠিক করা যায়নি। দেশি পণ্যের স্বাদ ভালই পেয়েছি। ওয়ালটন কাষ্টমারের সাথে বাটপাড়ি করেছে। সে শিখিয়েছে, দেশি পণ্য কিনে হও ফকির।

ইনু সাহেব কী শেখালেন সেটা ঠিকমত বুঝতে পারতেছি না।

শেখ মো. নাজমুল হাসান, চিকিৎসক, লেখক।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ