আজ রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়েশ্বরবাদ

মাসকাওয়াথ আহসান  

পৃথিবীর যে কোন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একজন নেতা-নেত্রী বা সরকারের বিকল্প থাকে অর্থাৎ তারা কেউ ইনডিসপেনসেবল নন। বিকল্প থাকেনা রাষ্ট্র এবং জনমানুষের; অর্থাৎ তারাই ইনডিসপেনসেবল। এই সহজ বিষয়টি বুঝতে না পেরে আমরা যারা ধর্মান্ধ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং মাজার সংস্কৃতির ভোক্তা; তারা কোন একজন নেতা বা নেত্রী ও তাদের পরিবারের ওপর প্রায় ঈশ্বরের আস্থা স্থাপন করলে; আধুনিক গণতন্ত্রে পদার্পণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এইখানে ধর্মের নামে রাজনীতি করা লোকেদের সঙ্গে কথিত প্রগতিশীল মাজার কেন্দ্রিক বুদ্ধিফেরিওয়ালাদের মিলের জায়গাটি প্রকট।

ধর্মের নামে রাজনীতির চাপাতিবাজেরা যেমন কুরান পড়ে; কিন্তু তাদের হুজুরের ফতোয়াকেই জীবন বিধান মনে করে; মাজারবর্তী চাপাবাজরাও তেমনি সংবিধান পড়ে; কিন্তু তাদের নেতা বা নেত্রীর ফতোয়াকেই রাষ্ট্রবিধান মনে করে। অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা বা পাশ্চাত্য শিক্ষা এই দুটি গোষ্ঠীর মনোজগতে মুক্তচিন্তার ও সুস্থ চিন্তার বিকাশে তেমন সহায়ক হয়নি।

রাষ্ট্র একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মতো; এর অধীনে যখন সড়ক নির্মিত হয়; এই সড়ক নির্মাণের সঙ্গে কোন ধর্মীয় বিষয় যুক্ত থাকে না; কে ঐ রাষ্ট্রের নেতা বা কোন সরকার ক্ষমতায় তার কোন সম্পর্ক থাকেনা। অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার সঙ্গে কোন ধর্মীয় বা দলীয় আবেগ সম্পৃক্ত নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টি। কিন্তু ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে এ কথা প্রতিদিন শুনতে হয়না; রিপাবলিকানরাই এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা; সুতরাং ডেমোক্র্যাটদের কোন প্রয়োজন নেই। এই দুটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে যে গণতন্ত্রের চর্চা দৃশ্যমান তা খুবই শিক্ষণীয়।

যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোতেও গণতন্ত্রের চর্চা প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা পেয়েছে। এই যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্য বা অন্যান্য পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলের সংগে সম্পৃক্ত, দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের সংস্কৃতির অভিজ্ঞতালব্ধ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতদেরই দেখা যায়; তারা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রায়েশ্বরবাদের মাজার সংস্কৃতি চর্চা করেন।

নেতা ও সরকারের পারফরমেন্সই একমাত্র বিবেচনার বিষয়। ব্যক্তিগত আবেগের কাসুন্দি আধুনিক গণতন্ত্রের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায়।

পারফরমেন্সের সূচক কেবলই অর্থনৈতিক উন্নয়ন; এটি তামাদি হয়ে যাওয়া ধারণা। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার গাণিতিকহারে বাড়লে আর জননিরাপত্তার আশংকা জ্যামিতিক হারে বাড়লে; সে উন্নয়নকে মানুষের জন্য উন্নয়ন বলা যুক্তিসঙ্গত নয়।

গণতান্ত্রিক সরকারের কাছ থেকে সুশাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যয় ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা খুবই জরুরী। সরকারের কাছে এই জবাবদিহিতার দাবী রাখলেই যদি মাজার-ভাবনার প্রায়েশ্বর কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী ব্রিগেড এসে সুনির্দিষ্ট সংকটের প্রসঙ্গটিতে ইনিয়ে বিনিয়ে তাদের প্রায়েশ্বর নেতার নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নেয়া ভুল পদক্ষেপগুলো জাস্টিফাই করতে থাকেন তোতা-পাখীর মতো; তখন প্রায়েশ্বরের নিজেকে নির্ভুল মনে হয়; অনেক ভুলের বীজ সেখানেই বোনা হয়ে যায়।

বাংলাদেশ বাস্তবতায় দুটি মাজার আঁকড়ে কিছু লোক ধর্ম নিয়ে ব্যবসার আফিম সেবকদের মতো হুজুর বা প্রায়েশ্বর বন্দনায় দীর্ঘ সময় অপচয় করেছে। গণতান্ত্রিক বোধের ছিটে ফোটাও যদি বাংলাদেশের কথিত সচেতন সমাজের থাকতো তাহলে তারা অনুধাবন করতে পারতো দলের মধ্যে গণতন্ত্র না থাকলে; সেটি একটি মাজারের প্রায়েশ্বরকেন্দ্রিক যুক্তিহীন আবেগী বিষয় হলে; সরকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অগণতান্ত্রিকতা ভর করতে বাধ্য।

ভারতে আম-আদমি সহ অসংখ্য আঞ্চলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে। পাকিস্তানেও পিটি আই-সহ একাধিক আঞ্চলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার দল গড়ে উঠে দ্বিদলীয় মাজার ব্যবসাকে চ্যালেঞ্জ করেছে। জার্মানিতেও গ্রিন পার্টি, লিংকস (বাম) পার্টি সহ বেশ কিছু দল বিকশিত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আজো সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ'র লালসালু উপন্যাসের মাজারকেন্দ্রিক অন্ধকার বাস্তবতায় রয়ে গেলো। যেখানে নিজেদের অযুত ভ্রান্তি না খুঁজে ষড়যন্ত্রসূত্রের ঠাকুর মার ঝুলির ভুতের গল্প; বহিঃশক্তির ওপর দোষ চাপিয়ে মৃত্যু উপত্যকার ভীত মানুষকে ঘুম পাড়ানো হয়। ফলে নিজস্ব ভ্রান্তির গোলকধাঁধায় রাষ্ট্রসহ ঘুরপাক খেতে থাকে প্রাণেশ্বরেরা। অসহায় ও সরল জনমানুষ কন্সপিরেসি থিওরির রোলার কোস্টারে চেপে বেদনা ও বিনোদন নেয়।

এরফলে যুক্তিহীন, অসাড়, অসহিষ্ণু এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে অমিত সম্ভাবনার এই জনপদ। সেখানে প্রায়েশ্বরে প্রায়েশ্বরে যুদ্ধ হয়; উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। জনমানুষকে এই উলুখাগড়ার জীবন থেকে মানুষের মর্যাদায় উন্নীত করা খুবই জরুরী। কারণ প্রায়েশ্বরের মাজারের লোকেদের ক্ষমতা কামড়ে পড়ে থাকা ও ক্ষমতায় যাবার ষড়যন্ত্রের স্প্যানিশ ট্র্যাজেডিতে প্রতিদিন খুন হচ্ছে স্বজন এবং স্বপ্ন।

মাসকাওয়াথ আহসান, সাংবাদিক, সাংবাদিকতা শিক্ষক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ