আজ শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

অন্তহীন এক বেদনার কাল

ফরিদ আহমেদ  

এখন থেকে এক বছর আগের একটা দিন। সীমান্তবর্তী শহর সিলেট।

সকালের নরম বাতাস পূর্ব দিক থেকে বয়ে আনছে কমলালেবুর কোমল ঘ্রাণ। কর্মময় দিনের শুরুতে ব্যস্ত হতে চলেছে শহরের রাস্তা-ঘাট। স্কুলের ছেলেমেয়েরা সার দিয়ে চলেছে স্কুলের দিকে। অফিসযাত্রীদের তাড়াহুড়ো  চলছে সঠিক যানবাহন বাছাই করতে। দুই একজন হকার মাথায় সওদা নিয়ে চলেছে দিনের ব্যবসা শুরু করার আকাঙ্ক্ষায়।  শান্ত, সুন্দর এবং সমাহিত শহর।

ঠিক এরকম সময়ে শান্ত শহরের একটা অংশ হয়ে ওঠে অশান্ত। নিজের জান বাঁচানোর জন্য সবুজ ঘাস মাড়িয়ে প্রাণপণে ছুটে চলেছে আহত, আতংকিত এবং রক্তে ভেজা এক যুবক। তাকে ধাওয়া করে আসছে মৃত্যুর মতো কালো পোশাক পরা চারজন যমদূত। কালো কাপড়ে ঢাকা তাদের মুখ, খোলা চোখে কুৎসিত জিঘাংসা। হাতে ঝিলিক দিচ্ছে রক্তমাখা চাপাতি। এ রক্ত পলায়নপর যুবকেরই দেহ থেকে নিঃসৃত। প্রথম সাক্ষাতেই ছুটন্ত এই যুবকের গায়ে নির্দয়ভাবে চাপাতি চালিয়েছিলো যমেরা। সেই আঘাত নিয়েই প্রাণ বাঁচাতে ছুটে চলেছে যুবক।

আহত যুবক পঞ্চাশ, ষাট গজ ছুটেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। সামনে টলটলে জলভরা দীঘি। নিজের অজান্তে প্রাণভয়ে দীঘির সামনে চলে এসেছে সে। সাঁতার শেখে নি সে কখনো। পানিকে তার আজন্ম ভয়। পিছনে ধাবমান মৃত্যুদূতের চেয়েও জলের আতংক তার কাছে আরো বেশি। পানির মধ্যে ঝাঁপ দেবার চেয়ে নিজেকে এদের হাতেই তুলে দেওয়াটাই শ্রেয় ভেবে নেয় সে। সব উপায় বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ যেভাবে আত্মসমর্পণ করে, ঠিক সেভাবে ঘাতকদের চাপাতির কাছে নিজেকে সমর্পিত করে দেয় সে।

বিদ্যুতের ফলার মতো ঘাতকদের ধারালো চাপাতি অতি নির্মমভাবে হামলে পড়ে তার নরম দেহে। হাঁটু ভাঁজ করে ঘাসের উপর পড়ে যেতে যেতে যুবকের মনে পড়ে যায় তার একজন অতি প্রিয় মানুষের কথা। সেই প্রিয় মানুষটিও তার মতোই ঘাতকের চাপাতির আঘাত নিয়ে চলে গেছে এই ভুবন ছেড়ে।

যার কথা এতক্ষণ বললাম, তার নাম অনন্ত বিজয় দাশ। অনন্ত বিজয়ের হত্যাকাণ্ডের মাত্র আড়াই মাস আগে বইমেলা থেকে ফেরার পথে টিএসসির সামনে সোহরাওয়ার্দী পার্কের গেটের সামনে সন্ত্রাসীদের চাপাতি হামলার শিকার হয় মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায় এবং তাঁর স্ত্রী বন্যা আহমেদ। অনন্তের একজন প্রিয় মানুষ ছিল অভিজিৎ রায়। মুক্তমনা ব্লগ  প্রতিষ্ঠার সেই শুরু থেকেই দু’জনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই হামলায় অভিজিৎ রায় নৃশংসভাবে নিহত হয়, বন্যা আহমেদ গুরুতরভাবে আহত হন। তিনি চাপাতির আঘাতে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল হারান। মাথায়, ঘাড়ে কপালে মারাত্মক কোপ নিয়ে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

অভিজিৎ রায়ের এই হত্যাকাণ্ডের  মধ্য দিয়েই মূলত মুক্তচিন্তক হত্যার মূল দরজা খুলে যায়। এর আগে যদিও বা রাজীব হায়দার খুন হয়েছে ছুরির আঘাতে, কিন্তু অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে অনেকটা নিয়ম করেই প্রতি মাসে একজন করে মুক্তচিন্তার মানুষ খুন হতে থাকে। হত্যার শিকার হবে এমন তালিকা প্রকাশ হতে থাকে পত্রপত্রিকায় নিয়মিতভাবেই। বিভিন্ন মাধ্যমে হত্যার হুমকি আসতে থাকে বিভিন্ন  জনের কাছে।

গত মাসের পঁচিশ তারিখে চাপাতির আঘাতে নিহত হয়েছেন জুলহাস মান্নান নামের একজন ভদ্রলোক। তিনি একা নন, একই আক্রমণে তাঁর সাথে নিহত হয়েছেন তাঁর বন্ধু মাহবুব তনয়ও। জুলহাস মান্নান‘রূপবান’নামের একটি পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদের সদস্য ছিলেন। এই পত্রিকাটি বাংলাদেশের সমকামী অধিকার বিষয়ক প্রথম এবং একমাত্র পত্রিকা। তিনি এক সময় বাংলাদেশস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের প্রটোকল অফিসার হিসাবেও কাজ করেছেন।

অনুমান করতে খুব একটা কষ্ট হয় না যে, ‘রূপবান’ পত্রিকা চালানো এবং সমকামী অধিকার আন্দোলনের সম্মুখসারির কর্মী হবার কারণেই জুলহাস মান্নানকে এরকম করুণ মৃত্যু বরণ করে নিতে হয়েছে। বাংলাদেশের মতো ধর্মীয় রক্ষণশীল সমাজে‘রূপবান’এর মতো পত্রিকা প্রকাশ বিশাল এক সাহসী উদ্যোগ। এরকম সাহসী উদ্যোগ বিরল ঘটনাই বলা চলে। বাংলাদেশে বহু দিন ধরেই এলজিবিটি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের সমানাধিকারের দাবিতে আন্দোলন চালাচ্ছিলেন জুলহাস। ধর্মীয় মৌলবাদীরা বেশ কয়েক দিন ধরেই তাঁকে হত্যার হুমকি দিচ্ছিল। পয়লা বৈশাখের আগে থেকেই ফেসবুকে একটি ইভেন্ট পেজ খুলে বাংলাদেশের সমস্ত এলজিবিটি সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের গণধোলাইয়ের ডাক দেওয়া হয়। কুৎসিত ভাষায় চলে তাঁদের প্রতি অকথ্য গালিগালাজ, জুলহাস-সহ অন্যান্যদের খুনের হুমকিও। রিপোর্ট করার পর সেই ইভেন্ট পেজটি রিমুভ করা হয়। কিন্তু, তাদের সেই হুমকি যে কতটা ভয়ঙ্কর ছিল, জুলহাসের নৃশংস খুন তারই প্রমাণ দিল।

জুলহাস মান্নানের হত্যার মাত্র দুইদিন আগে চাপাতির আঘাতে খুব হয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক জনাব রেজাউল করিম সিদ্দিকী। রাজশাহীর শালবাগান এলাকার বটতলা মোড়ে পিছন থেকে তাঁকে আক্রমণ করে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীরা। তাঁর ঘাড়ে কোপ বসানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, রেজাউল করিম সিদ্দিকীর ঘাড়ে তিন বার কোপ মারা হয়েছিল। মাটির দিকে মুখ গুঁজে পড়েছিল নিহত অধ্যাপকের দেহ। তাঁর ঘাড় ও গলার আশি শতাংশ অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল আঘাতে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, আক্রমণের পর একটি মোটরবাইকে চেপে দু’জন তরুণকে পালিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে।

শুধু এই তিন খুনই নয়, এ মাসের সাত তারিখেই পুরাতন ঢাকায় প্রকাশ্য রাস্তায় লোকজনের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে নাজিমুদ্দিন সামাদ নামের একজন ফেসবুকে সক্রিয় নাস্তিক তরুণকে।

গত এক বছরের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে মুক্তমনা মানসিকতার এবং ভিন্ন মতের মানুষদের নিয়মিত বিরতিতে হত্যা করা হচ্ছে। এদের বেশিরভাগই আক্রান্ত হয়েছেন বাড়ির বাইরে। বাড়িতে ঢুকে হত্যাকাণ্ডের এটি দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে বাড়িতে গিয়ে চাপাতি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তমনা ব্লগের নিয়মিত লেখক নিলয় নীলকে। চার-পাঁচজনের একটা দল প্রকাশ্য দিনের বেলায় তাঁর বাসায় গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রীকে আটকে রাখা হয়েছিল বারান্দায়। শ্যালিকাকে বদ্ধ করে রাখা হয়েছিল বাথরুমে। আর নীলকে আলাদা করে ভিন্ন রুমে নিয়ে গিয়ে আল্লাহ আকবর বলে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল খুনিরা।

এই সব হত্যাকাণ্ড, হত্যার তালিকা প্রকাশ, হত্যার হুমকি বাংলাদেশের মুক্তচিন্তকদের মাঝে আতংক ছড়িয়ে দিয়েছে। আতংকিত হয় নি এরকম লোক একজনও আছে বলে মনে হয়  না। এজন্য তাঁদের অবশ্য দোষও দেওয়া যায় না। সভ্য একটা দেশে, সভ্য একটা সমাজে হত্যার হুমকি পাওয়া, প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে বসবাস করতে থাকলে মানুষজন আতংকিত হবেই। বাংলাদেশে সু-বুদ্ধিসম্পন্ন মুক্তচিন্তার লেখকদের এখন জান হাতে রেখে লেখালেখি করতে হচ্ছে। নিজস্ব মত প্রকাশে সকলেই দ্বিধাগ্রস্ত এখন। কখন কার ঘাড়ে চাপাতির কোপ এসে পড়বে কেউ তা জানে না। কেউ জানে না কখন কার জন্য মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে হাজির হচ্ছে কদাকার ইসলামি জঙ্গি সেনারা। এর থেকে বাঁচতে বহু লেখক, ব্লগার এবং মুক্তচিন্তক পালিয়ে যাচ্ছে দেশ থেকে। অবরুদ্ধ সমাজে দম আটকে কিংবা চাপাতির আঘাতে মরার চেয়ে, পালিয়ে যাওয়াটাই শ্রেয়। এদের কারো কারো কথা আমরা জানি, কারো কারো কথা জানি না।কারণ, নীরবে দেশ ছেড়েছে এমন মানুষও রয়েছে।

সবুজ এবং  কোমল একটা দেশ আজ পরিণত হয়েছে এক নৃশংস বধ্যভূমিতে। বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষই আজ বিপন্ন এবং অসহায়। প্রতিদিন রক্তের লাল স্রোত বয়ে চলেছে এর গা বেয়ে। খুনের নেশায় পাওয়ায় উন্মত্ত একদল লোক অপরিমেয় ঘৃণা বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এর অলিতে-গলিতে। তাদের সেই ঘৃণার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে কোমল সব দেহ, অসাধারণ সব মেধা, অনন্য সব মানুষগুলো। একদল নরপিশাচ পৈশাচিক উল্লাসে ধারালো চাপাতির হিংস্রতা দিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে সবকিছুকে। দুর্বিষহ এবং পচা দুর্গন্ধময় এক সময় এসে পড়েছে হঠাৎ করেই আমাদের সামনে। একে মোকাবেলা করার জন্য যে প্রস্তুতি, যে শক্তিমত্তা আমাদের থাকা উচিত, তা নেই। ফলে, গভীর হতাশা এবং হাহাকারে নিমজ্জিত হওয়া ছাড়া আর কিছু করারও কোনো বিকল্পও খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। হিংস্র চাপাতিওয়ালাদের হাত ধরে গোটা দেশ এবং সমাজ ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের মতো ছুটে চলেছে গভীর এক অন্ধকারের দিকে। এ থেকে যেন কোনো মুক্তি নেই আমাদের।

এ যেন নিঃসীম এক আঁধারে ছেয়ে যাওয়া বাংলাদেশ। এর চারিদিকে শুধু জমাট বাঁধা থিক থিক অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মাঝে কিলবিল করছে অসংখ্য প্রতিক্রিয়াশীল পুঁতিগন্ধময় পোকামাকড়। মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তার চর্চা করা এখন প্রচণ্ড রকমের বিপদজনক বাংলাদেশে। অসহিষ্ণুতা এবং ঘৃণা এমনই সর্বব্যাপী যে বিপরীত কোনও চিন্তা-ভাবনা, বিশেষ করে ধর্ম, আরও স্পষ্ট করে বললে ইসলাম ধর্ম বিষয়ে সামান্যতমও সমালোচনাও এক শ্রেণীর ইসলামি মৌলবাদী সহ্য করতে পারছে না। একদল রক্তপিপাসু ধর্মান্ধ মোল্লা ছড়ি ঘোরাচ্ছে সবার মাথার উপরে।

আমাদের সমাজটাও হঠাৎ করেই যেন হয়ে উঠেছে প্রবলভাবে ধর্মাচ্ছন্ন। পত্রিকায় নির্দোষ একটা 'মোহাম্মদ বিড়াল' নামের কৌতুকের জন্যও তরুণ কার্টুনিস্টকে জীবন নিয়ে পালাতে হয় দেশ ছেড়ে। ফেসবুকের সামান্য কোনও একটা পোস্টে লাইক দেবার অপরাধে সরকারের বাহিনী গ্রেফতার করে নিয়ে যায় তরুণদের। দিকে দিকে শুধু ধর্মানুভূতি আহত হবার আর্তনাদ আর আর্ত-চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে লেখালেখির ‘অপরাধে’ একের পর এক বীভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটছে, কিন্তু এর কোনটারই সুষ্ঠু তদন্ত হচ্ছে না, কাউকে ধরা হচ্ছে না, কোনও হত্যাকাণ্ডের বিচার হচ্ছে না। একমাত্র ব্যতিক্রম রাজীব হায়দারের হত্যাকাণ্ড। এই হত্যা মামলায় দুজনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে, একজনের জেলদণ্ড হয়েছে। বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ডের এই বিচার না হওয়াটাই হত্যাকারীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে চলেছে অবিরাম। আমরা দেখেছি, হুমায়ূন আজাদ হত্যার কোনও বিচার হয় নি, বিচার হয় নি অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর বাবু কিংবা অনন্ত বিজয় দাশদের হত্যাকাণ্ডের। কোনো কোনো খুনের মামলার আসামীরা জামিন নিয়ে বের হয়ে গিয়েছে, কেউ বা দেশ ছেড়েই চলে গিয়েছে পুলিশ তাদের ধরার আগেই। এর বাইরে সরকারের দায়িত্বশীল মহলের  অ-দায়িত্বশীল কিছু মন্তব্যও পরিস্থিতিকে আরও নাজুক এবং বিপদজনক করে তুলেছে। বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, যে কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে নোংরা কিছু লিখে হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে সেই দায় তিনি বা তাঁর সরকার নেবেন না। তাঁর বক্তব্য থেকেই উল্লেখ করি,

“আমার ধর্ম সম্পর্কে কেউ যদি নোংরা কথা লেখে, সেটা কেন আমরা বরদাশত করবো? ফ্যাশন দাঁড়িয়ে গেছে ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তারা মুক্তচিন্তার ধারক! কিন্তু আমি এখানে কোনও মুক্ত চিন্তা দেখি না। আমি দেখি নোংরামি। এত নোংরা নোংরা কথা কেন লিখবে? আমি আমার ধর্ম মানি, যাকে আমি নবি মানি তার সম্পর্কে নোংরা কথা কেউ যদি লেখে সেটা কখনোই আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ঠিক তেমনি অন্য ধর্মের যারা তাদের সম্পর্কে কেউ কিছু লিখলে তাও কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। যারা এগুলো করে তা তাদের সম্পূর্ণ নোংরা মনের পরিচয়, বিকৃত মনের পরিচয়। এটা পুরোপুরিই তাদের চরিত্রের দোষ এবং তারা বিকৃত মানসিকতার। একজন মুসলমান হিসেবে আমি প্রতিনিয়ত আমার ধর্মকে অনুসরণ করে চলি। কাজেই সে ধর্মের বিরুদ্ধে কেউ লিখলে আমি কষ্ট পাই। এসব লেখার জন্য কোনও অঘটন ঘটলে তার দায় সরকার নেবে না। সবাইকেই সংযমতা নিয়ে চলতে হবে, শালীনতা বজায় রেখে চলতে হবে। অসভ্যতা কেউ করতে পারবে না। আর তা করলে তার দায়িত্ব আমরা নেবো না।”

যদিও তিনি এর জন্য একজন আরেকজনকে খুন করবে, এই ধারণার বিপক্ষে গিয়ে বলেছেন যে, আবার একজন লিখলে আরেকজন খুন করে প্রতিশোধ নিবে এটা তো ইসলাম ধর্ম বলেনি। তারপরেও তাঁর দায় না নেবার ঘোষণাটা খুনিদের জন্য সবুজ সংকেত হিসাবে চলে গিয়েছে। রাষ্ট্র তাঁর সকল নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে দায়বদ্ধ। একজন মানুষ যদি কোনো অপরাধ করে, তবে রাষ্ট্র তাঁর বিচার করতে পারে প্রচলিত আইনে। এর বাইরে অন্য কারো অধিকার নেই তার বিচারের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেবার। একজন মানুষ কী‘অপরাধে’খুন হয়েছে, সেটা রাষ্ট্রের বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। খুনের অপরাধে অপরাধী যারা, তাদেরকে আইনের আওতায় আনাটাই রাষ্ট্রের জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাজ।

প্রধানমন্ত্রীর এই অ-প্রধানমন্ত্রীসূলভ বক্তব্যের বাইরে, যাঁর বক্তব্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠছে, তিনি হচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল। ইনি প্রায় প্রতিটা খুনের পর মৃত ব্যক্তিরা কী লিখেছে তা খতিয়ে দেখার কথা বলছেন, কিংবা কার আচরণ সমাজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কী ছিল না, সেই গবেষণাতেই বেশি সময় কাটাচ্ছেন। অথচ রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে প্রতিটা খুনের খুনিরা যাতে ধরা পড়ে সেই চেষ্টাটাই তাঁর কাছ থেকে সকলের কাম্য ছিল। তিনি সেই কাম্য কাজটা করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। জুলহাস মান্নানের হত্যার পর তিনি বলেছেন, “আমরা যতটুকু জেনেছি জুলহাস রূপবান নামে একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। আর তিনি সমকামীদের অধিকার রক্ষায় কাজ করতেন। এটা আমাদের সমাজের সঙ্গে মানানসই না।”

কোনটা মানানসই কাজ সমাজের জন্য আর কোনটা মানানসই নয়, এটা দেখার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নয়। আমাদের সমাজে বিবেকের চরিত্রে কিংবা বিচারকের আসনে তাঁকে কেউ বসায় নি। তাঁর কাজ হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা, অপরাধ সংঘটিত হলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। এর বাইরে অন্য কিছু বলাটা তাঁর অধিকারের আওতায় পড়ে না।

মুক্তচিন্তার মানুষদের হত্যাকাণ্ডের বিচার না হবার যে নজীর গড়ে উঠছে বাংলাদেশে, সেটা সেই সাথে বাংলাদেশ সরকারের এইসব হত্যাকাণ্ডকে গুরুত্ব না দেবার বিপদজনক প্রবণতা, এই দুইয়ে মিলে, একদিন আমাদেরকে জাতি হিসাবে ধ্বংস করে দেবে। আমাদের বুঝতে হবে যে, অসংখ্য মৌলবাদী জঙ্গি দেশের কোনও কাজেই আসবে না। এরা সমাজের জন্য, দেশের জন্য ক্যান্সারস্বরূপও। কিন্তু যে মানুষগুলোকে এরা নির্দ্বিধায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে  মেরে ফেলছে, তারা সবাই একেকজন মেধাবী মানুষ। অকাল এবং অপঘাত মৃত্যুর কারণে শুধুমাত্র এরাই যে হারিয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে তাই নয়, বাংলাদেশের মুক্ত-চিন্তার আলোকিত জায়গাটাতে ভবিষ্যতে আর কেউ আসতেই সাহস করবে না। আলোর ঝরনাধারার শেষ স্রোতটা বন্ধ হয়ে যাবে, অন্ধকার এক জগতে পতিত হবে দেশ এবং জাতি। সেই অন্ধকার থেকে মুক্তি পেতে আমাদের হয়তো অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে কয়েক যুগ, কয়েক শতাব্দী কিংবা সহস্র বছর। মৌলবাদী জঙ্গিরা ঠিক এই কাজটাই করতে চাইছে আমাদের সমাজটাকে নিয়ে। আলোর থেকে বহু দূরে সরিয়ে নিয়ে, পিছন দিয়ে হাঁটিয়ে, নিয়ে যেতে চাইছে অন্ধকার এক সময়ে, আলোহীন এক অপজগতে।

সব যুগেই, সব সমাজে, মুক্তচিন্তা যাঁরা করেছেন, সমাজকে হাত ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছেন সামনের দিকে, গাঢ় অন্ধকারকে দূর করতে চেয়েছেন প্রদীপ জ্বেলে, প্রতিক্রিয়াশীল স্বার্থপর গোষ্ঠী তাঁদের সহ্য করতে পারে নি। নৃশংসভাবে হামলে পড়েছে তারা। উদ্দেশ্য, মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তাকে রুদ্ধ করা। ভয়ানক আক্রোশে ঘৃণার বিষ-বাষ্প নিয়ে ঝাঁপিয়েছে আলোর মশালকে নিভিয়ে দিতে। তাঁদের এই আক্রোশে, নৃশংস হামলায় রক্ত ঝরেছে মুক্তচিন্তকদের। তাঁদের শরীর থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়েছে রুক্ষ মাটিতে। বন্ধ্যা মাটি সেই রক্তে হয়ে উঠেছে উর্বর। সেই উর্বর মাটিতে ঘন সবুজ শস্য ফলেছে। মুক্তচিন্তকদের ঝরে পড়া রক্ত থেকে বের হয়ে এসেছে আরও অসংখ্য মুক্ত চিন্তার মানুষ।

মানব সমাজের নিয়মটাই এমন যে, এটি সামনের দিকেই এগোবে। পিছন থেকে একে যতই টেনে ধরে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন, এর অগ্রযাত্রাকে কখনোই থামানো যায় না। রাশ টেনে ধরে এর সম্মুখ গতিকে সাময়িকভাবে হয়তো ব্যাহত করা সম্ভব, সম্ভব স্বল্প সময়ের জন্য পিছনের দিকেও নিয়ে যাওয়া, কিন্তু দীর্ঘ সময় পরিভ্রমণে এর অগ্রযাত্রা অনিবার্য। প্রতিক্রিয়াশীলরা এটা খুব ভালো করেই জানে। সেকারণে সবসময়ই তারা থাকে মরিয়া। যতোখানি সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত করে থামিয়ে দেবার চেষ্টা করে সমাজের চাকাকে। প্রতিক্রিয়াশীল আর প্রগতিশীলের এই দ্বন্দ্ব তাই সবসময়ই সুতীব্র, সর্বব্যাপী এবং সর্বনাশা। এই সর্বনাশা লড়াইটা সবসময়ই হয় রক্তক্ষয়ী। তবে, এই রক্ত ক্ষয় হয় শুধুমাত্র একটা তরফ থেকেই। প্রগতিশীলদের দেহ থেকেই রক্ত ঝরে চুইয়ে চুইয়ে, কখনো বা ফিনকি দিয়ে প্রবলবেগে। প্রতিক্রিয়াশীলদের মতো খুন, জখম, মারামারি-কাটাকাটি করার মতো মানসিকতা প্রগতিশীলদের নেই। অস্ত্রের চেয়ে কলমের শক্তিতেই বেশি বিশ্বাস তাঁদের। প্রতিটা আন্দোলনে তাই এক তরফাভাবে রক্ত দিতে হয় তাঁদেরই।

অভিজিৎ, অনন্ত, রাজীব, বাবু, নীল, দীপন, জুলহাসদের মতো তরুণ-যুবকরা যে অফুরন্ত সম্ভাবনা নিয়ে আসে আমাদের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষের জন্য, এই পৃথিবীর জন্য, সেটাকে পরম মমতা এবং গভীর ভালবাসায় কাজে লাগানো উচিত আমাদের। আমাদের উচিত তাদেরকে এমন একটা নির্ভাবনায় পরিবেশ দেওয়া, নিশ্চিন্ত একটা বাগিচা দেওয়া, যেখানে তারা ফাগুনের ফুল হয়ে ফুটতে পারবে। তার বদলে যদি এদেরকে আমরা কিছু মূর্খ, ধর্মান্ধদের হাতে নিশ্চিহ্ন করে দেবার সুযোগ দেই, তবে অকালেই আমরা হারাবো তাদের সুগন্ধ। সেরকম কিছু হলে, একদিন কপাল ঠুকে আক্ষেপ করা আর ঘন হতাশায় পোড়া ছাড়া আর কোনও গতি থাকবে না আমাদের।

গতকাল চাপাতির আঘাতে অভিজিৎ, অনন্ত, দীপনরা বিদায় নিয়েছে, আজ জুলহাস মান্নান, মাহবুব তনয়, রেজাউল করিম সিদ্দিকীরা গেলো। আগামীকাল হয়তো অন্য একজন বিদায় নেবে। তার পরের দিন সময় আসবে আবার আরেকজনের। এভাবেই হারিয়ে যাবে একে একে সবাই। পড়ে থাকবে শুধু জীর্ণ সময়, গাছের নীচে ঝরাপাতা আর বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক টুকরো দীর্ঘশ্বাস।

আর যারা গেছে, অভ্রহীন আকাশে অন্তহীন এক বেদনার কাব্য হয়ে থাকবে তারা চিরকাল।

ফরিদ আহমেদ, কানাডা প্রবাসী লেখক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ