আজ মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

৬ দফা বাঙালির মুক্তিসনদ

শেখ মো. নাজমুল হাসান  

ব্যক্তিগতভাবে কিছু কিছু ঐতিহাসিক বিষয়কে আমি মেনে নিতে পারি না যদিও তা আমাদের ইতিবাচক পরিবর্তনকেই ত্বরান্বিত করেছে। এটি হয়ত আমার জানার সীমাবদ্ধতার জন্য। আমার অতীত-দর্শিতা ও সময়কে ধারণ করা বিশ্লেষণী ব্যর্থতাও এ জন্য দায়ী হতে পারে। যেমন- সর্ব শ্রদ্ধেয় মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী যে কি চেয়েছিলেন তা আমি আজও পরিষ্কার হতে পারিনি। সবাই উনাকে শ্রদ্ধা করে, দেখাদেখি আমিও করি। কিন্তু কেন করি তা আজ পর্যন্ত নিজের কাছেই পরিষ্কার হতে পারিনি।

ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবও তেমন একটি বিষয়। এটিকে কেন যেন আমার নিজের কাছে একটি সাম্প্রদায়িক সনদ মনে হয়। সাম্প্রদায়িকতাকে সামনে রেখে কোন সেক্যুলার বিষয়কে স্থায়ী রূপ দেওয়া যায় ব্যক্তিগতভাবে আমি তা মানতে পারি না। একটু যদি জানার চেষ্টা করি, কি ছিল সেই লাহোর প্রস্তাবে-

১৯৪০ সালের ২৩ শে মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ভারতীয় উপমহাদেশে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম দেশের দাবী জানিয়ে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অনুমোদন করে। বর্তমান পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে এটি পাকিস্তান প্রস্তাব হিসেবে অভিহিত হয়। লাহোর প্রস্তাবে যে বিষয়গুলি ছিল তা নিম্নরূপ-

প্রথমত: নিখিল ভারত মুসলিম লীগ দৃঢ়তার সাথে পুন:ঘোষণা করছে যে, ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ভারত শাসন আইন -এ যে যুক্তরাষ্ট্রের (ফেডারেল) পরিকল্পনা রয়েছে, তা এ দেশের উদ্ভূত অবস্থার প্রেক্ষিতে অসঙ্গত ও অকার্যকর বিধায় তা ভারতীয় মুসলমানদের জন্য অগ্রহণযোগ্য।

দ্বিতীয়ত: সমস্ত সাংবিধানিক পরিকল্পনা নতুনভাবে বিবেচনা না করা হলে মুসলিম ভারত অসন্তুষ্ট হবে এবং মুসলমানদের অনুমোদন ও সম্মতি ব্যতিরেকে সংবিধান রচিত হলে কোন সংশোধিত পরিকল্পনা ও তাদের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না।

তৃতীয়ত: নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সুচিন্তিত অভিমত এরূপ যে, ভারতে কোন শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা কার্যকর হবে না যদি তা নিম্নবর্ণিত মূলনীতির উপর ভিত্তি করে রচিত না হয়-
(ক) ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী সংলগ্ন বা সন্নিহিত স্থানসমূহকে 'অঞ্চল' হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে,
(খ) প্রয়োজন অনুযায়ী সীমানা পরিবর্ত করে এমনভাবে গঠন করতে হবে যেখানে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান এলাকাগুলো 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ' গঠন করতে পারে,
(গ) 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের' সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাষ্ট্র বা প্রদেশসমূহ হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।

চতুর্থত: এ সমস্ত অঞ্চলের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয়,সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক,প্রশাসনিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থরক্ষার জন্য তাদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে সংবিধানের কার্যকর ও বাধ্যতামূলক বিধান রাখতে হবে। ভারতবর্ষের মুসলমান জনগণ যেখানে সংখ্যালঘু সেখানে তাদের সাথে পরামর্শ সাপেক্ষে এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথেও আলোচনা সাপেক্ষে সংবিধানে কার্যকর বিধান রাখতে হবে।
 
১৯৪৭ সালে পৃথিবীর বুকে পাকিস্তান নামক সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রটি জন্ম নেবার পর থেকে এর একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান ক্রমাগত বঞ্চনার স্বীকার হয়, যদিও এ অংশেরও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই অত্যাচারী পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষের ধর্মেরই অনুসারী ছিল। এই বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণ পেতে ১৯৬৬ সালে ৬ দফার ভিত্তিতে একটি ব্যাপক আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়। এটিই পরবর্তীতে বাঙ্গালীর মুক্তি সনদরূপে আবির্ভূত হয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পরে স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন অবিতর্কিতভাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর এক সম্মেলনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। ছয় দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানকে একটি Federal বা যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং ঘোষিত ছয় দফা কর্মসূচীর ভিত্তিতে সেই Federation বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেবার মাধ্যমে সুন্দরভাবে পরিচালনা করা। এই ছয়দফা কর্মসূচীর ভিত্তি ছিল ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব।

দেখা যাক বাঙ্গালীর মুক্তি সনদ বলে খ্যাত কি ছিল সেই ৬ দফার দাবীতে-

প্রথম দফা :
শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে সরকারের বৈশিষ্ট্য হবে ফেডারেল বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ও সংসদীয় পদ্ধতির; তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন হবে প্রত্যক্ষ এবং সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার প্রতিনিধি নির্বাচন জনসংখ্যার ভিত্তিতে হবে।

দ্বিতীয় দফা :
কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় বা যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের দায়িত্ব থাকবে কেবল প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।

তৃতীয় দফা :
মুদ্রা ও অর্থ বিষয়ক ক্ষমতা: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দু'টি পৃথক মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা পারস্পরিকভাবে কিংবা অবাধে উভয় অঞ্চলে বিনিময়যোগ্য। এ ক্ষেত্রে দু'অঞ্চলে স্বতন্ত্র বা পৃথক পৃথক ষ্টেট ব্যাংক থাকবে এবং মুদ্রার পরিচালনা ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। অথবা, এর বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি মুদ্রা-ব্যবস্থা চালু থাকতে পারে এই শর্তে যে, একটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার অধীনে দুই অঞ্চলে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে। তাতে এমন বিধান থাকতে হবে যেন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সম্পদ হস্তান্তর কিংবা মূলধন পাচার হতে না পারে। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচার বন্ধ করার জন্য সংবিধানে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।