আজ রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

তথ্যমন্ত্রীর তথ্য ও কিছু প্রশ্ন

আব্দুল করিম কিম  

বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্য হতে পারলে 'মন্ত্রীরা' কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকার বৃথা চেষ্টা না করে বচনের মাধ্যমে সহজ পদ্ধতিতে নিজেদের চিরঞ্জীব রাখার চেষ্টা করেন। তাই তাঁদের মুখনিঃসৃত বচনে চায়ের কাপে ঝড় ওঠে। বর্তমান সময়ে অবশ্য ঝড়টা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টক-শোতে বেশি ওঠতে দেখা যায়। আরও ঝড় দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিনা কাপে বিনা চায়ে।

এমনই এক ঝড় উঠেছিল সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী আলহাজ হাসানুল হক ইনু'র বচনে। কিন্তু জঙ্গিবাদের ঝড়ের তোপে তা সংসদেই খতম হয়ে যায়। এ ঝড় নিয়ে বিজ্ঞজনদের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করিনি। তাই স্বপ্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে এ লেখার অবতারণা করছি।

বাংলাদেশের মন্ত্রীদের মধ্যে তথ্যমন্ত্রীর পদটা আমার কাছে খুব 'সুইট' লাগে। এই মন্ত্রিত্ব এ পর্যন্ত যারা অর্জন করেছেন তাঁদের প্রায় সবাই সর্বমহলে আলোচিত হয়েছেন। সমালোচিত শব্দ সংগত কারণেই লিখলাম না। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার তথ্যমন্ত্রী ছিলেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর, জিয়াউর রহমান-এর মন্ত্রীসভায় তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন সৈয়দ শামসুল হুদা, এরশাদের মন্ত্রীসভায় ছিলেন আনোয়ার জাহিদ, খালেদা জিয়ার মন্ত্রীসভায় ছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আর বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারে আছেন হাসানুল হক ইনু। ইনু সাহেব তথ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি নিয়মিতভাবে জাতিকে নানা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে উপকৃত করে যাচ্ছেন। তেমনই উপকারের প্রত্যাশা নিয়ে গত ২৪ জুলাই ঢাকায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে চুরির জন্য এমপিসহ জনপ্রতিনিধি ও আমলাদের দায়ি করে বোমা ফাটানো বচন রেখেছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
 
তিনি বলেছিলেন, ‘টিআর-কাবিখার বরাদ্দের অর্ধেকই চলে যায় সংসদ সদস্যদের পকেটে। মাঠ পর্যায়ে যদি ৩০০ টন যায়, সেখান থেকে দেড়'শ টন চুরি হয়। আর এসব চুরি করেন সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও আমলারা। অবশ্য সব এমপিই চুরি করেন না, তবে বেশির ভাগ এমপি চুরি করেন। '

তাঁর এ বক্তব্যে সংসদ সদস্যরা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন। যদিও তথ্যমন্ত্রী বলেছিলেন 'অবশ্য সব এমপিই চুরি করেন না, তবে বেশির ভাগ এমপি চুরি করেন।' কিন্তু প্রথম অংশ শুনেই সংসদ সদস্যরা উত্তেজিত। শেষ কথা শোনার সময় কই?

পরের দিনেই মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠক। অধিকাংশ মন্ত্রী আবার সাংসদ। তাই মন্ত্রিরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উষ্মা প্রকাশ করলেন। তথ্যমন্ত্রীও কালবিলম্ব না করে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি পড়ে শোনালেন। প্রত্যেক মন্ত্রীর হাতে হাতে পৌঁছে দিলেন মন্ত্রণালয়ের খাম-প্যাডে দেয়া 'স্যরি লেটার'। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ হয় না। সন্ধ্যায় বিষয়টি ঘিরে সংসদ অধিবেশনকক্ষ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

মাগরিবের নামাজের বিরতির পর সংসদের কার্যক্রম শুরু হলে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সাংসদেরা বক্তব্য দেওয়ার জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন। স্পিকার তখন কাউকে সুযোগ না দিয়ে নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, কাজী ফিরোজ রশীদ ও রুস্তম আলী ফরাজীকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘আমরা সাড়ে তিন শ সদস্য মনে হয় সবাই চোর হয়ে গেছি। আর এই সাড়ে তিন শ এমপির মধ্যে কিন্তু একজন সাধু আছেন এবং উনি হচ্ছেন আমাদের মাননীয় তথ্যমন্ত্রী।’ তাঁদের বক্তব্যের পর তথ্যমন্ত্রী ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করলে সাংসদেরা হইচই করেন। কেউ কেউ টেবিলে ফাইল চাপড়ান। অনেকে এ সময় নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেন এবং তথ্যমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে বলেন। এর মধ্যেই তথ্যমন্ত্রী ক্ষমা চাইলে অধিবেশনকক্ষ শান্ত হয়।

তথ্যমন্ত্রী তাঁর ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, টেস্ট রিলিফ ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য বিতরণে অতীতের সরকারগুলোর অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অবসানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার বিষয়টি বলতে গিয়ে ক্ষেত্রবিশেষ দুর্নীতির কথা তিনি বলেছেন। ঢালাওভাবে বলেননি। গণমাধ্যমে এর কিছু এসেছে, কিছু আসেনি। তথ্যমন্ত্রীর এই সাফাই ব্যাখ্যার প্রতিক্রিয়ায় কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন, এভাবে বলিনি, এটা বলার কোনো সুযোগ নেই। যখন রেকর্ড দেখাবে, তখন কী বলবেন?

আসলেই কি বলবেন? কিছু কি উনার বলার ছিল?

সেদিন সাংসদদের তোপের মুখে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের এ বাকপটু কেতাদুরস্ত বাম নেতাকে সর্বস্ব হারাতে বসা বন্যার্তদের মত অসহায় মনে হয়েছে। নিজের বেফাঁস উক্তির জন্য নিজেকেই নিজে চপেটাঘাত করছেন হয়তো। অবশ্য তাঁকে 'কূল রাখি না শ্যাম রাখি' পরিস্থিতিতে পড়তে হয় নাই। তিনি শ্যাম রাখতেই বদ্ধ পরিকর। তাই কালবিলম্ব না করে ক্ষমা চেয়েছেন। নিজের বেফাঁস উক্তির দায়ভার সংবাদ মাধ্যমের কাঁধে চাপিয়ে দেয়ার সহজ পথে গিয়ে হালুয়া-রুটির চলমান সমাজতন্ত্র বহাল রেখেছেন।

তিনি হয়তো তাঁর মন্ত্রিত্ব এই দফা টিকিয়ে নিলেন কিন্তু তিনি যা বলতে চেয়েছিলেন তা কি সর্বৈব মিথ্যা? ‘টিআর-কাবিখার বরাদ্দে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও আমলাদের হাতে কি তহবিল তসরুপ হচ্ছে না?

তথ্যমন্ত্রীর সংশোধিত বক্তব্য যদি সঠিক থাকে তবে তো মানতে হবে ঢালাওভাবে না হলেও হচ্ছে। সাড়ে তিন শ জন সাংসদ চুরি না করলেও অন্তত এর ৫০% ভাগ চুরি করছেন। তাও যদি না হয় তাহলে অন্তত ১০% চুরি করছেন। সেটাও যদি না হয় তবে মাত্র ১% সাংসদ চুরি করছেন। অর্থাৎ সাড়ে তিন জন সাংসদ চোর।

এরা কারা? আপনার আমার এলাকার কোন সাংসদ নয়তো? জানার খুব আগ্রহ। তথ্যমন্ত্রীর থেকে তথ্যটা পাওয়া গেলে শান্তি পেতাম।

আব্দুল করিম কিম, সমন্বয়ক, সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা পরিষদ।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ