আজ রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

শোক-ক্রন্দন নয়: শপথের দিন

রণেশ মৈত্র  

দীর্ঘ ৪১ টি বছর ধরে বাঙালি শোক প্রকাশ করে চলেছে-কেঁদে বুক ভাসিয়েছে এই লড়াকু-অসীম সাহসিকতার গৌরবে গৌরবদীপ্ত জাতি চরম অসহায়তার মধ্যে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের কালরাত্রিতে নেমে আসা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম হত্যাজনিত জাতীয় বিপর্যয়-বাঙালি জাতিকে সেদিন যে ভবিষ্যতের অন্ধকারাচ্ছন্নতার ইঙ্গিত দিয়েছিল-যদি আমরা চেতনা ও বিশ্বাসে সৎ হই-তবে মানতেই হবে বাঙালি জাতি আমরা আজওে আবেগ তাড়িত। দীর্ঘ ৪১ টি বছর পরেও এ আবেগ যেন কিছুতেই আমাদের পিছু ছাড়ে না। সত্যিই আমরা অন্ধকারাচ্ছন্নতায় সেই থেকে নিমজ্জিত।

সংবাদ পত্রের পাতা খুললেই এই দিনে সেই চার দশকেরও আগের রক্তাক্ত বঙ্গবন্ধু ও ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ির শোকাবহ ছবি আর শিরোনাম রক্তের অক্ষরে লেখা“কাঁদো বাঙালি কাঁদো” অথবা “আজ আমাদের শোকের দিন-শোকের মাস”-এগুলি আর কতকাল দেখবো?

একজন ভাষা-সৈনিক হিসেবে , একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বপ্নের সেই বাংলাদেশেকে আর কতকাল শোকাচ্ছন্ন হয়ে থাকতে-বা কেঁদে বুক ভাসাতে বলবো? আমার ক্ষুদ্র বিবেচনায়-বাকী ৩৬৪ দিন বা অবশিষ্ট ৩৩৩টি দিন যদি আর বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ না করি-যদি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম আকাঙ্ক্ষা একটি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সুখী-সমৃদ্ধ ও শোষণ মুক্ত এবং পরিপূর্ণ বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ও আইনের শাসন সম্বলিত একটি প্রাণবন্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ না হই তবে কি ১৫ আগস্ট বা গোটা আগস্ট মাস ধরে শোকের ও কান্নার মাতম তুলেই আমরা জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে পারব?

বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীনতার স্থপতি, রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের অতুলনীয় প্রেরণা এবং অফুরন্ত প্রাণ প্রাচুর্যে সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক নিপুণ কারিগরের মত তাঁর ঘোষিত লক্ষে, দীর্ঘ ২৩ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন লৌহদৃঢ় জাতীয় ঐক্য এবং স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ এর ৪ নভেম্বর সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করা বাহাত্তরের মূল সংবিধান আজ কোথায়? কোথায় ঐ গণ-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেব পাওয়া তাঁর অন্যতম অমর উপহার বাহাত্তরের সংবিধান যাকে পরবর্তীতে শকুনিরা তার রূপ, সৌন্দর্য ও আদর্শিক নির্যাস পরিত্যাগ করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে? আজও কি আমরা তাকে সযত্নে তুলে এনে আবার তাকে বাহাত্তরের মত করে অবিকল আঁকতে পেরেছি?

আমরা জানি খোন্দকার মোশতাককে যিনি বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত কাছের মানুষ হয়েও দিব্যি ঠা-া মাথায় মর্মান্তিকভাবে খুন করালেন বঙ্গবন্ধুকে। আর সেইদিন সন্ধ্যায়ই বেতার ভাষণে দিব্যি বলে দিলেন শেখ মুজিব হত-তিনি ইসলাম ও গণতন্ত্র-বিরোধী ভূমিকা পালন করেছেন। নিজেকে নিতান্ত সংবিধান-বিরোধী পদ্ধতিতে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করলেন। অত:পর অতিশীঘ্রই ঘোষিত হলো তাঁর মন্ত্রীসভা-যাতে তাজউদ্দিন আহমেদ, কামরুজ্জামান, সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী, আবদুস সামাদ আহাদ প্রমুখরা ছিলেন না-তবে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার বাদ-বাকী সকল সদস্যই দিব্যি যোগ দিলেন ঐ মন্ত্রীসভায়।

সেনাবাহিনী, বিমান-বাহিনী, নৌবাহিনী, রক্ষা-বাহিনী, পুলিশ-বাহিনীর ভূমিকা ১৫ আগস্টের শেষ রাতে কি ছিল? না তাঁরা কেউ এগিয়ে আসে নি বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে বা এমন কি তাঁকে হত্যার পর হত্যাকারীদের নির্মম শাস্তি দিতে। উল্টো তাঁরা সবাই দিব্যি গিয়ে একে একে খন্দকার মুশতাকের কাছে নতুন করে শপথ নিলেন। কী কলঙ্কময় ইতিহাসই না রচিত হলো? কী করেছিল গোয়েন্দারা? দেশী-বিদেশী কত গোয়েন্দাই না সক্রিয় ছিল তখন বাংলাদেশে?

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ? বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দেশটির নেতা-কর্মীদের সেদিনকার ভূমিকার সপক্ষে কেউ কি আদৌ কোন গ্রহণযোগ্য যুক্তি উপস্থাপন করতে পারবেন?

উল্টো বরং সেদিনকার নেতৃত্বকে বলতে শুনেছি তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংশয়ে ছিলেন তাঁরা। সবাই কি? সবার জীবনই কি তবে অনিরাপদ হয়ে পড়েছিলো? উদাহরণ কোথায় তার? কেউ যদি প্রতিরোধের ডাক দিয়ে লাখো নেতা-কর্মী ও কোটি জনতাকে নিয়ে ঢাকার রাজপথে প্রকম্পিত করে তুলতে অগ্রসর হতেন তখনও কি ঐ খুনি বাহিনীর মুষ্টিমেয় কতিপয় সদস্য গুলি চালাতে সাহস করতো? ঐদিন তারা তা করতো তবে তারা নির্ঘাত পরাজয় বরণ করতে বাধ্য হতো। যেমনটি হয়েছিল ২৩ বছরের গণ-আন্দোলনের প্রতিটি লগ্নেই। আর বঙ্গবন্ধুর এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যালীলার পর তাঁদের জীবনের চাইতেও কি এঁদের জীবনের মূল্য বেশী ছিল? তাঁরা কেন বুঝলেন না শত্রুরা তখন সংগঠিত না-জনসমর্থিতও না-তাই তারা হারতো।

তাই আমি আজ বলতে চাই শোক-আর ক্রন্দন জাতিকে ঘুম পাড়িয়ে দেবে-দিয়েছেও খানিকটা। এখন থেকে তা আর না করে প্রয়োজন গভীরভাবে আত্মানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হওয়া। আত্মানুসন্ধানে যদি সত্যই দেখা যায় তখন চুপ করে পালিয়ে থাকাই যথার্থ ছিল-বলা হোক না তাই বিশদ পর্যালোচনা সহকারে। জনগণ তা বিচার করবেন কারণ জনগণই হলেন শেষ বিচারক।

কিন্তু ঐ দিনটা তো আমার স্বচক্ষে দেখা-যদিও পাবনা থেকে। বঙ্গবন্ধুর দলের নেতা-কর্মীরা ভোরে রেডিও তে খবর জানার পর ছুটেছিলেন-কেউ জেলা প্রশাসকের বাংলোতে, কেউ বা এস,ডি এর বাংলোতে আবার কেউ বা পুলিশ সুপারের বাংলোতে। শুধুই তাঁরা সন্ধান করেছেন ঢাকার নেতাদের একটি নির্দেশের। দেখেছি, পুলিশ-বাহিনীর সদস্যরাও কোন একটা নির্দেশের অপেক্ষায়-তাঁরাও প্রয়োজনে আবারও দাঁড়াবেন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ-মিছিলে ও সমাবেশে। বৃহৎ বৃহৎ সমাবেশ ঘটিয়ে রুখে দাঁড়িয়ে মোশতাকদের পরবর্তী পরিকল্পনা বানচাল করে দেওয়া অবশ্যই যেতো। সারা দেশেই তেমন প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব ছিল-বিজয় ছিল অনিবার্য।

আমরা সে সুযোগ হারিয়েছি। গণতন্ত্রের অসাম্প্রদায়িকতার ধর্মনিরপেক্ষ সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ট্রেনটিতে না উঠে তাকে অযাচিতভাবে বিদায় জানিয়ে পাকিস্তানী ধারা প্রবর্তন করে বিসমিল্লাহ, জামায়াত ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়া ও রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তনের সুযোগ দিয়ে আজ আবার সুপ্রিম কোর্ট এগুলি বাতিল করলেও সংসদের শক্তির জোরে সংশোধনী পাশ করে এগুলিকে বৈধতা দিয়েছি।

কি জবাব হবে জানি না,“ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম” অথবা “ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ” এই দুটির মধ্যে আদৌ কোন মৌলিক পার্থক্য আছে কি? যদি বস্তুত:ই কোন পার্থক্য থাকে তা পুরোপুরি বুঝে নিতে চাই। কিন্তু পার্থক্য যে নেই-তা তো স্পষ্টত:ই দৃশ্যমান। বিমানবন্দরগুলি নামে ইসলামী কারণ, সরকারী উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের দুশমন সৌদি বাদশার অর্থায়নে প্রতিটি থানায় একটি করে মাদ্রাসা নির্মাণের সিদ্ধান্ত, জামায়েত-হেফাজত-আওয়ামী ওলামা লীগকে নিষিদ্ধ না করা, এরশাদ ও তার দলকে আপন করে নেওয়া প্রভৃতি কি একটি বার্তাই ঘোষণা করে না-দেশটি এখন শুধুই মুসলমানের?

এমন বুঝ কেন আসে মাথায়?

আসে এই কারণে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খৃষ্টানের মিলিত রক্তের স্রোতধারায় যে দেশের জন্ম, ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন-সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ও সারা দুনিয়ার নানা ধর্মে বিশ্বাসী কোটি কোটি নানা ভাষী মানুষের সক্রিয় সমর্থনে অর্জিত স্বাধীনতা আজ যেন অনেকাংশেই বিবর্ণ যা মনে প্রচণ্ড বেদনার সঞ্চার করে।

এবারের আগস্ট-এবারের ১৫ আগস্টে আমরা কি পারবো বা পারলাম আত্মরীক্ষণ করে ৭৫ থেকে আজতক জড়ো হওয়া তাবৎ আবর্জনা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত আদর্শে দৃশ্যমান আলোকিত ও সুখী সমৃদ্ধি বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে নতুন করে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে? তবেই হবে শোক দিবস উদযাপন ও তার নানাবিধ আয়োজন সফল, সার্থক ও অর্থবহ।

রণেশ মৈত্র, লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক; মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ইমেইল : [email protected]

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৫ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ