আজ বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ইং

পুলিশ নয়, পাঠকরাই নির্ধারণ করুক কী পড়া উচিত

খুরশীদ শাম্মী  

ফেব্রুয়ারি মাস। বাঙালিদের ভাষার মাস। অনেক রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে অর্জিত বাঙালিদের মাতৃভাষা বাংলা বিশ্বজুড়ে কেবল পরিচিত একটি ভাষাই নয়; বাঙালিদের মাতৃভাষা দিবস, ২১ ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

বাঙালি হিসেবে এই বিষয়টি নিয়ে গর্ব হয় আমাদের। আরও গর্ব হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ঘিরে।

একটি স্বাধীন দেশ হিসাবে এটা খুবই স্বাভাবিক, বাংলাদেশে জনগণ তাদের মাতৃভাষা বাংলায় সৃষ্টি করবে সাহিত্য, প্রকাশ করবে তাদের মনের যত কথা, ধ্যান-ধারণা, আবিষ্কার করবে নতুন কোনো বিস্ময়; এমনকি মাতৃভাষায় ফুটিয়ে তুলবে নিজেদের এবং বিশ্বের বড় বড় মনীষীদের মতবাদ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের সরকার এবং প্রশাসনের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এক এক করে কেড়ে নিচ্ছে জনগণের মনের ভাব প্রকাশের অধিকার।

লেখক, প্রকাশকদের অধিকার হরণ করা হচ্ছে পদে পদে। দেশের সরকার ও প্রশাসন মৌলবাদীদের ষড়যন্ত্রে পড়ে, যুক্তিহীনভাবে মুক্তমনা লেখক ও প্রকাশকদের নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে যখন-তখন। এমনকি, কেউ ব্যক্তিগতভাবে কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে, তাকে কিংবা ঐ প্রতিষ্ঠানকেও নিষিদ্ধ করা হচ্ছে বে-আইনিভাবে। নানান বাহানায় তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে তাদের অধিকার থেকে। দেশের সাধারণ জনগণের জন্য সরকারের নিরপেক্ষতা ও যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত আজ হারিয়ে গেছে ধর্মের নামে রাজনীতির কাছে।

যদিও মানুষের মতামত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নেয়া, যে কোনো স্বাধীন দেশের জন্য সম্পূর্ণ অন্যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এই অন্যায় দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর আকার ধারণ করছে।

প্রশাসনের এই সকল অন্যায়ের সাথে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে অতীব হাস্যকর এক ব্যাপার; পুলিশকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে অমর একুশের গ্রন্থমেলার বইয়ের স্টলে কোন বই থাকবে এবং কোন বই থাকতে পারবে না, তা বিচার করার। যদিও এই সংবাদ পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করেছিলাম, কারণ সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না, এই সংবাদে কী করা উচিত? তবে পুলিশের বই তদারকির ব্যাপারটা কষ্টের হাস্যকর ছাড়া অন্য কিছু নয়। মানুষ যেমন দুঃখে এবং সুখে দুই অবস্থায়ই কাঁদে। ঠিক তেমনি, মানুষ মনের আনন্দ ও কষ্ট, দুই অবস্থায়ই হাসে।

যেহেতু একুশ বাংলার অহংকার এবং বাংলা একাডেমি এই বাংলার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই দেশের সরকার ও বাংলা একাডেমির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের কাছে একটা প্রশ্ন; আপনারা কী একবারও ভেবে দেখেছেন? ধর্মের দোহাই দিয়ে, নানান প্রকার ত্রাস সৃষ্টি করে মৌলবাদীরা কিন্তু একের পর এক মুক্তমনের লেখকদের লেখা বই ও প্রকাশকদের নিষিদ্ধ করাচ্ছে; নানান অন্যায্য দাবীর মুখে জনগণের স্বাভাবিক জীবন ও স্বাধীনতাকে খর্ব করছে। আর অন্যদিকে, মৌলবাদীদের দ্বারা রচিত প্রমাণহীন, নানান ভুল তথ্যের এবং মিথ্যা ব্যাখ্যায় ছোট চটি বইয়ে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশ। মুক্তমনের মানুষেরা ঐ বইগুলোকে কিন্তু একবারও বন্ধ করার দাবী তুলে নাই।

লেখক লিখবে, প্রকাশক তা বই আকারে প্রকাশ করবে এবং পাঠক ঐ সকল লেখা পাঠ করে, হয় তা গ্রহণ করবে কিংবা বর্জন করবে; তা কেবলই পাঠকের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। যেহেতু প্রতিটি মানুষ ভিন্ন, সুতরাং তাদের রুচি ও মতামতও ভিন্ন। তাই, পাঠকদের কী পড়া উচিত কিংবা কী পড়া উচিত না, তাহা নির্ধারণ করার দায়িত্ব কিংবা অধিকার কোনোটাই দেশ কিংবা প্রশাসনের থাকতে নেই। আর এটাই স্বাভাবিক। তবে এক তরফা একের পর এক লেখা নিষিদ্ধ করার দাবী এবং ত্রাস সৃষ্টি করা যে সমাজের শান্তি নষ্ট করে, প্রশাসনের সে দিকেও মনে হয় নজর দেয়া খুব জরুরী হয়ে পড়েছে।

প্রশাসনের ভুলে গেলে চলবে না, কেবল মাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যরা পরস্পর গুলি ছুড়ে যুদ্ধ করে। কিন্তু লেখকদের যুদ্ধ হয় কলমের কালিতে আঁকা নানান বর্ণ ও শব্দে তৈরি লেখায়। এখানে পুলিশি তদারকির দরকার নেই, লেখা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে প্রয়োজন আছে অন্যায্য দাবীদারদের দাবী নাকচ করে দেয়ার; তাদের সামাজিক সুস্থ নিয়মের অধীনে আনার।

স্বাধীন বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে শ্রদ্ধা জানাই সকল জীবিত ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের এবং শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সকল শহীদ ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের। তবে তাঁদের জন্য খুব দুঃখ হয় যখন দেখি, নতুন প্রজন্ম তাঁদের রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে গেঁথে যাওয়া স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর দেশের সরকার ও প্রশাসনই ঐ সকল বাধার কারণ।

রাজনৈতিক দলগুলো না হয় ক্ষমতার লোভের বিক্রি হয়ে গেছে বুঝলাম। কোনো কিছু নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া, আইন ও নিয়ম-নীতিও কি পাল্টে গেছে? প্রকৃত শিক্ষিত ব্যক্তিত্বরা আর কতদিন ভয়ে চুপ করে থাকবেন? একজন সুস্থ চিন্তার মানুষ হিসেবে আমার একটাই দাবী; লেখকদের লিখতে দিন, প্রকাশকদের তা প্রকাশের স্বাধীনতা দিন, পাঠকদের তার নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী পাঠ করার সুযোগ দিন।

কোনো লেখা গ্রহণ করা কিংবা বর্জন করার সিদ্ধান্তের অধিকার না হয় পাঠকেরই থাক। পুলিশ কিংবা প্রশাসনের নয়!

খুরশীদ শাম্মী, কানাডা প্রবাসী লেখক

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫১ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৯ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৪ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১১৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ