আজ রবিবার, ২৫ আগস্ট, ২০১৯ ইং

৩০ ফেব্রুয়ারি

আশিক শাওন  

কারো সাথে মজা করে অনেক সময়ই কেউ কেউ বলে থাকে, “৩০ ফেব্রুয়ারিতে এটা হবে”; কারণ শৈশব থেকেই সবাই শেখে যে, ফেব্রুয়ারি মাস সাধারণভাবে ২৮ দিনে সমাপ্ত হয়, তবে প্রতি ৪ বছর (শতবর্ষ হলে ৪০০ বছর) পর পর ‘লিপ-ইয়ার’ হবে এবং সেটি ২৯ দিনে যাবে, কাজেই ‘৩০ ফেব্রুয়ারি’ বলে বাস্তবে যেহেতু কিছু নেই সেহেতু তেমন কিছু প্রকৃত পক্ষে ঘটবে না!

এই সম্পর্কে দিন-মাস-বছরের হিসাব শেখার একটি জনপ্রিয় ইংরেজি ছড়াও রয়েছে:

Thirty days hath September,
April, June and November.
All the rest have thirty-one,
Excepting February alone,
And that has twenty-eight days clear,
And twenty-nine in each leap year.

(অনুবাদ:
তিরিশ দিনেতে হয় মাস সেপ্টেম্বর
তেমনি এপ্রিল, জুন আর নভেম্বর।
আটাশ দিনে ফেব্রুয়ারি ধরে,
একদিন বাড়ে তার চতুর্থ বছরে।
অবশিষ্ট সাত মাস একত্রিশ দিনে,
জানিবে ইংরেজি মাস এইরূপে গুনে।)

২.
কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যাবে যে, এই ফেব্রুয়ারি মাসেও একসময় ৩০ তারিখ দিনটি ছিলো, অর্থাৎ ৩০ ফেব্রুয়ারি তারিখটির প্রচলন বর্তমানে না-থাকলেও এক সময় এই দিনটির প্রচলন ছিলো পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চল বা দেশে!

প্রাচীন ‘জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি’তে ফেব্রুয়ারি মাস ৩০ দিনে থাকা বিষয়টি সম্পর্কে যেমন বলা হয়েছে তেমনি আধুনিক কালে সুইডেনে ১৭১২ সালের বর্ষপঞ্জিতে ‘৩০ ফেব্রুয়ারি’ তারিখটি সংযোজন করা হয়েছিলো জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি থেকে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিতে স্থানান্তরের প্রয়োজনে; আর, সোভিয়েত ইউনিয়নে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদ দিয়ে প্রতিটি দিনকে ‘কর্ম-দিবস’ (Working Day) হিসাবে ব্যবহারের জন্য ১৯৩০ আর ১৯৩১ সালে ‘৩০ ফেব্রুয়ারি’ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়!

সুইডিশ শহর ‘যেস্টাড’ (Ystad)-এর ‘সেন্ট পেটরি পারিস’ (St. Petri Parish) চার্চের রেজিস্টারিতে লেখা রয়েছে, “Anno 1712. d: 30 Februarij wijdes fullmächtigen på Jordbärga Svven Hall wid hust Elena Jäppdotter Duue.” বাংলা অনুবাদ: “১৭১২ খ্রিস্টাব্দ। ফেব্রুয়ারির ৩০ তারিখ জর্ডবার্গার স্যেভেন হলের কেরণীক এলেনা জ্যাপ্পডোটার ড্যুই’কে বিয়ে করেন।” (ইংরেজিতে: ‘Anno 1712. On 30 February the clerk Svven Hall of Jordbärga was married to Elena Jäppdotter Duue.’)


প্রাচীন গ্রিক বর্ষপঞ্জিতে ছিলো ১০টি মাস, যা ৩০৪ দিনে সমাপ্য হতো। এর সাথে ‘জানুয়ারি’ ও ‘ফেব্রুয়ারি’ নামক দুটি মাসকে ১১দশ ও ১২দশ মাস হিসাবে সংযোজন করা হয় রোমন সম্রাট নুমা পম্পিলিয়াস’এর নির্দেশে খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দে, যেটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে সম্রাট জুলিয়াস সিজারের নির্দেশে জ্যোতির্বিদ সসিজেনিস’এর পরামর্শানুসারে জানুয়ারিকে বছরের প্রথম মাস হিসাবে চিহ্নিত করে তারিখ অনুযায়ী সাজানো হয়। প্রচলনের প্রথম দিকে ফেব্রুয়ারি মাসের দিন সংখ্যা ৩০ থাকলেও সিজার এই পঞ্জিকা সংস্কারের সময় ফেব্রুয়ারি মাস থেকে একটি দিন কেটে নিয়ে বছরের মাঝের দিকের মাস ‘কুইন্টিলিস’ (Quintilis), যেটি তার জন্ম মাস হিসাবে পরিচিত, সেটির সঙ্গে যুক্ত করে দেন (পরবর্তীকালে এই মাসটিকে সম্রাট জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে ‘জুলাই’ নামে নামকরণ করা হয়)। আবার, পরবর্তী রোমন সম্রাট অগাস্টাস সিজার ফেব্রুয়ারি মাস থেকে আরও একটি দিন কেটে নিয়ে ‘সেক্সটিলিস’ (Sextilis), যেটি তার জন্ম মাস হিসাবে পরিচিত, সেটির সঙ্গে জুড়ে দেন (সেই মাসটিকে পরে সম্রাট অগাস্টাস সিজারের নামানুসারে ‘অগাস্ট’ নামে নামকরণ করা হয়)। এর ফলশ্রুতিতে, ফেব্রুয়ারি মাসের দিন সংখ্যা ২টি কমে দাড়ায় ২৮টিতে!

এই সম্পর্কে ১৩দশ শতকের বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ জোহানেস ডি স্যাক্রোবোস্কো (১১৯৫ – ১২৫৬) তার ১২৩৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত“De Anni Ratione” নামীয় পঞ্জিকার হিসাব সংক্রান্ত (Compotus) বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ‘জুলিয়ান বর্ষপঞ্জিতে ৪৫ খ্রিষ্টপূর্ব থেকে ৮ খ্রিষ্টপূর্ব পর্যন্ত লিপ-ইয়ারযুক্ত ফেব্রুয়ারি মাস ৩০ দিনে সমাপ্ত হতো; যা পরবর্তীতে ২৯ দিনে এনে প্রাপ্ত বাড়তি দিনটি অগাস্টে যুক্ত করে এই মাসটিকে জুলাইয়ের সমান দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট করা হয়।’

৪.
ইউরোপ-ব্যাপী ‘জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি’র স্থলে ‘গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি’ প্রচলনের ধারাবাহিকতায় সুইডিস সাম্রাজ্যেও ১৭০০ সাল থেকে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি প্রচলনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের সমন্বয়ে গঠিত সুইডিস সাম্রাজ্য ইত্যবসরে “গ্রেট নর্দান ওয়ার”এ জড়িয়ে পড়ায় জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি থেকে গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জিতে পরিবর্তন করা হয়নি; অধিকন্তু, পরিবর্তন করা হবে বলে এই বছরটি জুলিয়ান বর্ষপঞ্জি মতে ‘লিপ-ইয়ার’যুক্ত হলেও সুইডিস সাম্রাজ্যে তা পালিতও হয়নি! যুদ্ধ এবং অন্যান্য ঘটনা প্রবাহে ব্যস্ত থাকায় পরবর্তী কয়েক বছরেও সেটি পরিবর্তন করা হয়নি এবং জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির নিয়মানুসারে ১৭০৪ ও ১৭০৮ সালে ‘লিপ-ইয়ার’ পালিত হয়। অবশেষে ১৭১২ সালে ইতিপূর্বে ১৭০০ সালের অব্যবহৃত ১টি দিনকে ‘লিপ-ইয়ার’যুক্ত ফেব্রুয়ারির সাথে যোগ করে হিসাব করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং এর ফলশ্রুতিতে উক্ত ১৭১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসটিতে মোট দিনের সংখ্যা দাড়ায় ৩০টি!

আবহাওয়া পূর্বাভাস সংক্রান্ত ১৭১২ সালের একটি সুইডিশ ক্যালেন্ডারের ছবি এটি; যেখানে দেখা যাচ্ছে ‘Februarius’ মাসে ‘৩০’ তারিখের পাশে সুইডিশ ভাষায় ‘Tillökad’ কথাটি লেখা রয়েছে, যার বাংলা অনুবাদ ‘সংযুক্ত করা’ (ইংরেজীছ ‘added’) এবং এইদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস হিসাবে সুইডিশ ভাষায় বলা হয়েছে ‘Snöö’, যার বাংলা অনুবাদ ‘বরফ পড়া’ (ইংরেজি: ‘snow’)।

১৯২৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমান: রাশিয়া) “সোভিয়েত বিপ্লবী বর্ষপঞ্জি” (The Soviet Revolutionary Calendar) প্রবর্তন করে, যাতে ৫ দিনে সপ্তাহ পূর্ণ হতো এবং কোন সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছিলো না; প্রতিটি দিনকেই ‘কর্ম-দিবস’ (Working Day) হিসাবে গণনা করা হতো! এই বর্ষপঞ্জিটি সুনির্দিষ্টভাবে ১৯৩০ এবং ১৯৩১ সালে ব্যবহার করার কথা জানা যায়, যেটিতে প্রতিটি মাস ছিলো ৩০ দিনের এবং বছর সম্পূর্ণ করার স্বার্থে অবশিষ্ট ৫ বা ৬ দিন ছিলো ‘মাসবিহীন’ ছুটির দিন! যদিও সরকারি নির্দেশনা অনুসারে প্রতিটি মাস ৩০ দিনে সমাপ্তের কথা বলা হয়েছিলো এই বর্ষপঞ্জিতে কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় মুখপত্র হিসাবে পরিচিত ‘প্রাভদা’ (Pravda) পত্রিকাটিতে ৩০ ফেব্রুয়ারির কোন সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি; অর্থা এই প্রচলনটি ছিলো কেবলমাত্র ব্যবহারিক দিক থেকে, কোন সরকারি দলিলাদিতে এর প্রমাণ নেই।

এই ‘সোভিয়েত বিপ্লবী বর্ষপঞ্জি’টি মূলত: শিল্পোৎপাদন সমহারে সচল রাখার উদ্দেশ্যে প্রচলন করা হয়, যা ১৯২৯ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয় এবং পরবর্তীতে বাতিল করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি’র ব্যবহার শুরু করা হয়।
তথ্যসূত্র:
•    www.bigganjatra.org/history-of-new-year
•    www.calendars.wikia.com/wiki/Soviet_revolutionary_calendar
•    www.en.wikipedia. org/wiki/February_30
•    www.historychannel.com.au/this-day-in-history/sweden-enjoys-february-30
•    www.ittefaq.com.bd/print-edition/kishur-kotha/2015/01/14/25740
•    www.quizards.co/history-of-the-modern-calendar
•    www.timeanddate.com/calendar/gregorian-calendar
•    www.timeanddate.com/date/february-30
•    www.tondering.dk/main/da/kalenderinformation/15-30-february

আশিক শাওন, সহকারী অধ্যাপক, শাহ্পরান সরকারি কলেজ, সিলেট।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৬ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭১ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৫ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫৩ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১১ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ