আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে’

সঙ্গীতা ইমাম  

লেখার শিরোনামটি বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের স্লোগান ছিল। ১৯৯৯ সালের ৪, ৫ এবং ৬ মার্চ যশোরের ঐতিহাসিক টাউন হল মাঠে অনুষ্ঠিত তিনদিনব্যাপি অনুষ্ঠিত জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনে এক ভয়াবহ আক্রমণের শিকার হয় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ওই দিন মৌলবাদী গোষ্ঠী উদীচীর সম্মেলনে বোমা মেরে ১০টি তাজা প্রাণ কেড়ে নেয়। উদীচীর উপর বোমা হামলার মাধ্যমেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ভয়াবহ বোমাবাজির নজির শুরু হয়।

উদীচীর একাদশ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকাতে। সে সময় প্রথম সাংগঠনিক দিক থেকে শ্রেষ্ঠ জেলা নির্বাচন শুরু হয়। সাংগঠনিক যোগ্যতার ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ জেলা হিসেবে নির্বাচিত হয় যশোর জেলা। দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় যশোর জেলার উপর। সেবারই প্রথম ঢাকার বাইরে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যশোর জেলায় আয়োজিত প্রতিনিধি সম্মেলনে সারা বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১,৫০০ সাংস্কৃতিক কর্মী ও উদীচী’র ভাই-বোনেরা আসেন। এই সম্মেলন হয়ে উঠে সাংস্কৃতিক কর্মীদের এক অপূর্ব মিলন মেলা।

৬ মার্চ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছিল। ভারতের মেদিনীপুর থেকে আসা সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ষড়ভুজ’সহ আরও বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক দলের পরিবেশনা চলছিল মঞ্চে। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছিলেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর যশোর জেলা সংসদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক (বর্তমান সভাপতি) ডি এম শহীদুজ্জামান। তখনই পর পর দুটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরিত হয় অনুষ্ঠানস্থলে। উদীচীর ১০ জন সাংস্কৃতিক কর্মী এতে প্রাণ হারান, আহত হন প্রায় দুই শতাধিক। নিহত ১০ জন হলেন— নূর ইসলাম, নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যা রাণী ঘোষ, ইলিয়াস মুন্সী, শাহ আলম বাবুল, বুলু, রতন রায়, বাবুল সূত্রধর, শাহ আলম ও রামকৃষ্ণ।

এই নৃশংস হামলার ১৮ বছর পেরিয়ে গেছে। এই ১৮ বছর বিচারহীনতার ১৮ বছর, জঙ্গিবাদী, মৌলবাদী গোষ্ঠীর নৃশংস আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়ানোর ১৮ বছর, ১০ জন সাংস্কৃতিক কর্মী ও সহযোদ্ধা হারানোর ১৮ বছর। গত ১৮টি বছর ধরে উদীচী’র ভাই-বোনেরা এই নৃশংস ঘটনার বিচার দাবি করে আসছে। কোন বিচার হয়নি কিন্তু বারবার হামলা হয়েছে উদীচীসহ দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলগুলোর উপর।

এই ভয়াবহ হামলার পর সারাদেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন উদীচী’র পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এ হামলা কেবল উদীচী’র উপর হামলাই নয়, এ হামলা ছিল বাংলাদেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের উপর এক ন্যক্কারজনক হামলা। তাই আমরা যেমন হারিয়েছিলাম আমাদের সাংস্কৃতিক সহযোদ্ধাদের, তেমনি সারাদেশের প্রগতিশীল সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এই হামলার প্রতিবাদে।

উদীচী’র দ্বাদশ সম্মেলনে সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনর্নিবাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে নাট্যজন সৈয়দ হাসান ইমাম এবং গণসংগীত শিল্পী মাহমুদ সেলিম। বোমা হামলায় আহতদের উদ্ধার এবং সুচিকিৎসার জন্য উদীচী’র তৎকালীন সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশের উদীচী’র ভাই-বোনরা একসঙ্গে কাজ শুরু করেন।

উদীচী আমাদের কাছে কেবলই একটি সংগঠন নয়; এ আমাদের এক পরিবার। পরিবারের সদস্যদের রক্ষার জন্য সারা বাংলাদেশের উদীচী’র শিল্পী-কর্মীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন তখন। এখানেই একটি সংগঠনের শক্তি। ঘটনার পরদিন মারাত্মকভাবে আহতদের যশোর থেকে হেলিকপ্টারে করে খুলনায় এবং ঢাকা এনে চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হয়। নিহত ১০ জনের পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব নিয়েছে উদীচী। নিহত ১০ জনের মধ্যে উদীচী পরিবারের সদস্য ছিলেন ৫ জন আর বাকি ৫ জন ছিলেন অনুষ্ঠানের দর্শক-শ্রোতা।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারের নামে পোস্ট অফিসে ৫০,০০০ টাকা জমা করে দেন। নিহতদের মধ্যে যাঁদের পরিবারের কোনো সদস্য চাকুরির উপযুক্ত, তাকে চাকুরির বন্দোবস্ত করে দেয়া, কাউকে দোকান করে দেয়া, রিকশা বা ভ্যান কিনে দেয়া থেকে শুরু করে সার্বিক দায়িত্ব তৎকালীন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে পালন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।

যাঁদের অঙ্গহানি ঘটেছে, তাঁদের কৃত্রিম অঙ্গ সংস্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। আহতদের মধ্যে ৪ জন তাঁদের পা হারান। এই চার জনেরই কৃত্রিম পা সংযোজনের উদ্যোগ নেয় উদীচী। তৎকালীন সভাপতি সৈয়দ হাসান ইমাম প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ করে জার্মান থেকে কৃত্রিম পা এনে তা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে সংযোজনের কাজ সম্পন্ন করেন। কৃত্রিম পা সংযোজনের পর উদীচীর ভাই-বোনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তাঁদের হাঁটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং সুস্থ হবার পর বাড়ি পাঠানো হয়।

এই ১৮ বছর ধরে উদীচী যেমন যশোর হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছে, তেমনি এই বোমা হামলায় আহতদের পাশে আজও উদীচী দাঁড়িয়ে আছে তার মানবিক আদর্শ নিয়ে। সংগঠনের ওপর যে বিপর্যয় নেমে এসেছিলো সেদিন, তাতে আমরা চূড়ান্তভাবে আহত হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু ভেঙে পড়িনি। কারণ, ‘সত্যেন রণেশের আঁকা পদচিহ্ন’ আমাদের শিখিয়েছে নিদারুণ দুর্যোগও সহযোদ্ধাদের নিয়ে কী করে মোকাবেলা করতে হয়।

সঙ্গীতা ইমাম, শিক্ষক, সংগঠক ও সংস্কৃতি কর্মী

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫০ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৮ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৪ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬০ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০২ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১২ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১০৮ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ