আজ বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ ইং

‘এপ্রিল ফুল’-এর সত্য-মিথ্যে কাহিনী

আশিক শাওন  

‘এপ্রিল ফুলস ডে’র জন্ম ইতিহাস নিয়ে নানাজনে নানান কথা প্রচলিত রয়েছে; কিন্তু এর প্রকৃত ইতিহাস আজও রহস্যাবৃত। সভ্যতার ইতিহাসে ঠিক কোন বছরটি থেকে এই দিবসটির পালন শুরু হয়েছে তা আজও অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে। তবে, বিভিন্ন জাতি এই দিনটিকে নিজেদের অন্যতম একটি আনন্দ-উৎসবের দিন হিসেবে পালন করে থাকে।

প্রাচীন ইতিহাস অনুসারে
‘এপ্রিল ফুল ডে’র উদ্ভব রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইনের (২৮৮-৩৩৭ খ্রি.) শাসনামলে বলে ধারণা করা হয়। একবার একদল ভাঁড় সম্রাটকে কৌতুক করে বললো যে, তারা রাজার চেয়ে ভালভাবে দেশ চালাতে পারবে। তখন সম্রাট সেই ভাঁড়দের সর্দার কুগেলকে ১ এপ্রিল তারিখ একদিনের জন্য সম্রাট বানিয়ে দিলেন। কুগেল তখন রাজ্যময় আইন জারি করে দিল, প্রতি বছর এইদিন সবাই ঠাট্টা-তামাশা করবে। সেই থেকে প্রতি বছর ‘এপ্রিল ফুল ডে’তে ঠাট্টা-তামাশার প্রচলন।

ইংরেজদের মতানুসারে
১৩৯২ সালে ইংরেজি সাহিত্যের জনক জিওফ্রে চসার তার লেখা ‘নানস প্রিস্ট টেল’ কবিতায় মার্চ মাসের ৩২তম দিনের উল্লেখ করেন। কারও কারও মতে, এর দ্বারা পয়লা এপ্রিলকেই বুঝনো হয়েছিলো। যদিও ঐতিহাসিক পিটার ট্রাভিসের মতে, ৩২তম দিন বলতে চসার কোনো নির্দিষ্ট দিনের কথা বুঝাননি; বরং তিনি মধ্যযুগীয় দার্শনিকতা নিয়ে ঠাট্টাচ্ছলে এটি ব্যবহার করেছেন।

ফরাসীদের মতানুসারে
‘এপ্রিল ফুলস ডে’র জন্ম ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত মতবাদ হলো ‘পঞ্জিকা-পরিবর্তন তত্ত্ব’; যেটি মূলত ফ্রান্স কেন্দ্রিক। জুলিয়ান পঞ্জিকানুসারে ‘ইস্টার’ (যিশুখ্রিস্টের পুনর্জন্মের দিন) ছিল বছরের প্রথম দিন; যেটি চন্দ্রের আবর্তনের সাথে জড়িত হওয়ার প্রতি বছর পরিবর্তিত হতো, তবে কিছু ব্যতিক্রম বাদে প্রতি বছর ৩১ মার্চ বা ১ এপ্রিল পালিত হতো নববর্ষ।

১৫৮৩ সালে ফ্রান্সের রাজা নবম চার্লস গ্রেগরিয়ান পঞ্জিকা অনুসারে ১ জানুয়ারিকে নববর্ষ বলে ঘোষণা করেন, যা ১৫৬৪ সালের ২২ ডিসেম্বর পার্লামেন্টে আইন হিসেবে পাস হয়। কিন্তু অনেক ফরাসীই এই সিদ্ধান্তটিকে মেনে নিতে পারেননি; তারা আগের মতই ১ এপ্রিলেই নববর্ষ পালন করতেন! নববর্ষ পালন করা নিয়ে দুভাগে বিভক্ত হওয়া ফরাসীরা একে অপরকে বিভিন্নভাবে নাস্তানাবুদ করতে লাগলো।

এরই এক পর্যায়ে, যারা ১ জানুয়ারিতে নববর্ষ পালন করতো তারা ১ এপ্রিলে নববর্ষ পালনকারীদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করে মাছের ছবি আঁকা স্টিকার লাগিয়ে দিতেন; যার পিঠে স্টিকার লাগানো হতো তাকে বলা হতো ‘পওয়াহসোঁ ডাভরিল’। এই ‘পওয়াহসোঁ ডাভরিল’ শব্দটি এসেছে ১৫০৮ সালে প্রকাশিত কবি এলয় দ্য আমেরভাল-এর ‘লে লিভরে ডে লা ডিয়াবলেরিয়ে’ কবিতায় ‘বোকা লোক’-এর স্থলে ব্যবহার করা শব্দ থেকে; যদিও এর অর্থ ‘এপ্রিলের মাছ’, কিন্তু ফরাসি তখন থেকে ‘পওয়াহসোঁ ডাভরিল’ বলতে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’কে বুঝাতো।

আবার, একই সাথে যারা পুরোন প্রথা অনুসরণ করতো তাদেরকে বোকা বানাতে ১ এপ্রিলে ভুয়া উপহারও পাঠানো শুরু করে ১ জানুয়ারি নববর্ষ পালনকারীর দল।

জার্মানদের মতানুসারে
‘এপ্রিল ফুলস ডে’ নিয়ে জার্মানিতে দুটি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। এর প্রথম মতবাদটি হচ্ছে বাজির সাথে এবং দ্বিতীয়টি সাহিত্যের সাথে সম্পর্কিত।

প্রথম দরের মতানুসারে, ১৫৩০ সালের ১ এপ্রিল জার্মানির অগসবার্গে আইনসভার সদস্যদের নিয়ে অর্থনৈতিক বিষয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়; কিন্তু সময় সংকুলানের অভাবে ওই সভাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ দেখা দিলে আগত দর্শনার্থীরা সভা অনুষ্ঠানের বিষয়ে বাজি ধরেন! সভাটি অনুষ্ঠিত হয়নি; ফলে যারা সভা অনুষ্ঠানের পক্ষে বাজি ধরেছিলেন তারা হেরে গিয়ে অন্য সবার ঠাট্টা-তামাশার পাত্র হয়ে পড়েন।

আবার, কারো মতে ১ এপ্রিলে মানুষকে বোকা বানানোর প্রথাটি আসে ১৫৩৯ সালে ফ্লেমিশ কবি এডুয়ার্ড ডে ডেনে-এর একটি হাস্য রসাত্মক কবিতা থেকে; এর ইংরেজি শিরোনাম করা হয়েছে ‘রিফ্রেইন অন এরান্ড-ডে, হুইচ হু দ্য ফারস্ট অভ এপ্রিল’, বাংলায় দাড়ায় ‘এপ্রিলের প্রথম দিনে অপ্রাপ্তি’। এই কবিতাটির কাহিনিতে একজন ভদ্রলোক ১ এপ্রিলে তার চাকরকে বোকা বানিয়েছিলেন; যার ধারাবাহিকতায় ‘এপ্রিল ফুলস ডে’র প্রচলন ঘটে।

ডাচদের মতানুসারে
‘এপ্রিল ফুলস ডে’ নেদারল্যান্ডসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবস। ১৫৭২ সালের এই দিনে তারা ‘ডান ব্রিয়েল’ শহরটি লর্ড আলভার নেতৃত্বাধীন স্প্যানিশদের কাছ থেকে দখল করে। এই শহরটি দখলের মাধ্যমেই নেদারল্যান্ডসের স্বাধীনতার সূচনা হয় বলে ডাচদের বিশ্বাস এবং এই দিনটিকে তারা একটি সৌভাগ্যের দিন হিসাবে গণ্য করে। ‘ব্রিয়েল’ একটি ডাচ শব্দ, যার অর্থ কাঁচ। ১৫৭২ সালের ১ এপ্রিল স্মরণে ডাচরা বিদ্রূপ করে স্প্যানিশদের ‘অ্যালবা কাঁচ হারিয়েছে’ (Alba lost glasses) বলে সেই স্মৃতি রোমন্থন করে থাকে, যার থেকে ‘এপ্রিল ফুল ডে’র উদ্ভব।

একটি বানোয়াট কাহিনী এবং কিছু তথ্য-উপাত্ত
উপমহাদেশীয় মতানুসারে, বিশেষত বাংলাদেশীয় মুসলমানদের মধ্যে ‘এপ্রিল ফুল ডে’র ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্ন মত লক্ষণীয়। তাদের মতে, এটি গ্রানাডার বেদনাদায়ক ইতিহাসের সাথে সংযুক্ত একটি দিবস।

এই মতানুসারে, স্পেনে মুসলমানদের গৌরবময় ৮০০ বছরের শাসনের সমাপ্তি ঘটেছিলো ১৪৯২ সালের এই দিনটিতে একটি বেদনাদায়ক উপাখ্যানের মাধ্যমে, যখন রাজা ফার্দিনান্দ ও রানী ইসাবেলার নির্দেশে হাজার হাজার মুসলমান নারী, পুরুষ, শিশুদের মসজিদের মধ্যে কৌশলে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো এবং রাণী ইসাবেলা তাদের প্রতি উপহাস করে তাদেরকে ‘ফুল’ বলে সম্বোধন করেছিলো।

অথচ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত পেগি লিসের লেখা ‘Isabel the Queen’, পিয়ারসন এডুকেশন থেকে প্রকাশিত জন এ্যাডওয়ার্ডের ‘Ferdinand and Isabella’, আই.এল. প্লাঙ্কেটের লেখা ‘Isabel of Castile’ এবং কর্নেল ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত জোসেফ কালহানের ‘A History of Medieval Spain’ গ্রন্থ এবং অন-লাইন ভিত্তিক এনসাইক্লোপিডিয়া উইকিপিডিয়া, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা, এনসাইক্লোপিডিয়া অব আমেরিকানার তথ্যানুসারে স্পেনে মুসলিমদের শাসনাবসানের ঘটনা ঘটেছিলো ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারিতে; যেদিন গ্রানাডার শাসক দ্বাদশ মুহাম্মদ শান্তিপূর্ণভাবে নগরের চাবি হস্তান্তরের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেন।

তদুপরি, স্পেন থেকে মুসলমানদেরকে তখন বের করেও দেয়া হয়নি; আমীর আবু আব্দুল্লাহ’এর সাথে ইসাবেলা আর ফার্দিনান্দের চুক্তি অনুসারে গ্রানাডার মুসলমানদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল।

১৫০৮ সালে ইনকুইজিশন প্রথা চালুর মাধ্যমে মুসলমানদের জানিয়ে দেয়া হয় ক্যাথলিক হতে হবে, নয়তো স্পেন ছাড়তে হবে। এসময় যারা স্পেন ছাড়েনি তারা ক্যাথলিকের ছদ্মবেশে মুসলিমই থেকে যান এবং তাদেরকে ‘মরিস্কো’ বরে সম্বোধন করা হতো। এই মরিস্কোরা ১৬০৯ থকে ১৬১৪ সালের মধ্যে হৃত রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য বিদ্রোহ করলে তাদেরকে স্পেন থেকে পুরোপুরি বহিষ্কার করা হয়।

এক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় মনে রাখা আবশ্যক যে, স্পেনের মূল ভাষা হলো স্প্যানিশ – ইংরেজি নয়! কাজেই, যদি সত্যি সত্যি এ ধরনের কিছু ঘটতো তাহলেও ইংরেজি ‘ফুল’ শব্দটি স্প্যানিশরা ব্যবহার করার কথাও নয়!

মূলত ‘এপ্রিল ফুল ডে’ নিয়ে মুসলমানদের পুড়িয়ে মারার ঘটনাটি এই অঞ্চলের স্বল্প-শিক্ষিত ধর্ম ব্যবসায়ী সম্প্রদায় কর্তৃক ভিন্ন ধর্মী ও মতাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষমূলকভাবে প্রচলিত ও প্রচারিত গল্পগাথা বলা চলে, যেই গল্পটির প্রচলন পৃথিবীর অন্যকোন অঞ্চলেই নেই!

আশিক শাওন, সহকারী অধ্যাপক, শাহ্পরান সরকারি কলেজ, সিলেট।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১২ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৩৯ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৪৯ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ১৫ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১১ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭০ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৪ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৫২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩২ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৫ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১০১ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১০ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ৯৭ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৬ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ