আজ বুধবার, ২০ মার্চ, ২০১৯ ইং

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনে পাকিস্তানি মানস

সাব্বির হোসাইন  

বাঙালির জাতীয় জীবনে শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালির জন্য স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র 'বাংলাদেশের' প্রতিষ্ঠা করা। এই অর্জনের জন্য বাঙালিকে দিতে হয়েছিল ভয়ংকর মূল্য; ত্রিশ লক্ষ শহীদ, পাঁচ লক্ষ নারীর উপর পাশবিক নির্যাতন, এক কোটি শরণার্থী, বাংলাদেশের অবকাঠামোর চূড়ান্ত ধ্বংস।

যুদ্ধ মাত্রই মানবসভ্যতার জন্য অভিশাপ। যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছিত, নির্যাতিত,অত্যাচারিত ও নিপীড়িত হয় যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদের নারী ও শিশু।

যুদ্ধে নারী নির্যাতনের কারণ হিসেবে সাধারণত চার’টি কারণ চিহ্নিত করা যায়-

১. আগ্রাসী বাহিনীর লালসা চরিতার্থ করার প্রবণতা।
২. বিজিত জনপদের প্রতি তীব্র ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ।
৩. কোন প্রথার অনুসরণ বা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি।
৪. এবং বিজিত জাতিকে হেয় করার উদ্দেশ্য।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান অধিকৃত বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি; বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাসের পরতে পরতে আছে পাকিস্তানিদের দ্বারা নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ বাঙালি নারীর অশ্রু, আর্তনাদ ও ভয়ংকরতম বিভৎসতার শিকার হওয়ার দুর্ভাগ্য। একাত্তরে অধিকৃত-বাংলাদেশের সর্বত্র পাকিস্তানি সৈন্য ও দালালরা সর্বত্র ভয়াবহ বর্বরতা চালিয়েছিল; প্রতিদিনই শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সের নিরস্ত্র হাজার হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হতো, যৌনদাসী হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো নারীদের। এই নারীরা ধর্ষণ, অঙ্গহানি, বিভৎস উপায়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলো।

পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, বিহারি ও দালালদের সংঘটিত এই নারকীয়তার শিকার হয়েছে কমপক্ষে পাঁচ লক্ষ নারী। এবং এই ভয়ংকর দানবীয় কাজটি পাকিস্তান সামরিক বাহিনী, বিহারী ও দালালরা মাত্র নয় মাসে সংঘটিত করেছে। অপরাধ সংঘটনের স্বল্প সময় ও ভিক্টিমের লক্ষাধিক সংখ্যা থেকে নারী নির্যাতনের এই ভয়ংকর ঘটনাবলীর ব্যাপকতা ও বিভৎসতা স্পষ্টতই বুঝতে পারা যায়। পাকিস্তানি, বিহারি ও দালালদের পাশবিকতা হতে শিশুকন্যা হতে বৃদ্ধা কেউ রেহাই পায়নি।

মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারী: শিল্পী হাশেম খান

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত হতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী অধিকৃত-বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান) বাঙালি গণহত্যা ও নারী নিপীড়ন শুরু করে; সূচনা হয় মানব ইতিহাসের অন্যতম চরম বেদনাদায়ক মানবিক বিপর্যয়। বাঙালির অপরাধ ছিল, তারা সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করেছিলেন। পাকিস্তান (তৎকালীন পশ্চিম-পাকিস্তান) বাঙালিদের অধস্তন হিসেবে গণ্য করতো এবং বাঙালি কাউকে শাসনক্ষমতায় দেখতে চায়নি। ফলশ্রুতি, সত্তরের নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত হলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি। বরং পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম একটি জাতিগত নির্যাতন ও ধোলাইয়ের পরিকল্পনা করেছিল এবং সে অনুসারে ২৫ মার্চ, ১৯৭১ রাত হতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী অধিকৃত বাংলাদেশে শুরু করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ভয়াবহতম গণহত্যা ও জাতিগত নির্যাতন এবং নারীর বিরুদ্ধে নৃশংসতম যুদ্ধাপরাধ।

এই প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালের ২৭ মে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত সংখ্যায় একটি প্রতিবেদনে বলা হয়:

“রাত বা দিনের যেকোন সময় গ্রামগুলো ঘিরে ফেলা হয়, ভীত গ্রামবাসী যেখানে পারছে পালিয়ে যাচ্ছে; যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, তাদের হত্যা করা হচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে, মেয়েদের ব্যারাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, নিরীহ-নিরস্ত্র কৃষকদের নৃশংসভাবে প্রহার করা হচ্ছে, বেয়নেট চার্জ করা হচ্ছে।”

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিরুদ্ধে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সংঘটিত ভয়াবহ গণহত্যা ও নারী নির্যাতনের স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় পাকিস্তানি জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের কথায়; তিনি বলেছেন:

“.....সব দেশে মানুষ শেষ আশ্রয় হিসেবে সেনাবাহিনীর কাছে যায়। আর পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী দেখে মানুষ পালিয়ে গেছে।”

অধিকৃত-বাংলাদেশের সর্বত্র পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে বাঙালির বিরুদ্ধে গণহত্যা, নারী নির্যাতন, সম্পত্তি বিনষ্ট ও লুটপাটের মত ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ সংঘটন করেছিল। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী অধিকৃত-বাংলাদেশে তাদের দালালদের নিয়ে রাজাকার, আল-বদর, মুজাহিদ বাহিনী নামে কয়েকটি আধা-সামরিক বাহিনী গঠন করে এবং পূর্ব-পাকিস্তানে বসবাসরত বিহারি জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠন করা হয় আল-শামস নামে একটি আধা-সামরিক বাহিনী। দালাল ও বিহারিদের নিয়ে গঠিত এসব আধা-সামরিক বাহিনী পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সাথে সক্রিয়ভাবে বাঙালি গণহত্যা ও নারী নিপীড়নে অংশগ্রহণ করেছিল।