আজ বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

‘টার্গেট ২০২০’: বাতিল নয়, দীর্ঘায়িত হয়েছে শুধু

আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল  

জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হচ্ছে - একে আমরা রাজনৈতিক দল মনে করি! জামায়াতির মেয়ে, শিবিরের স্ত্রী, ছাত্রী সংস্থা বা জামায়াত-শিবিরের লোকজনদের পদ দেয়াকে কৌশল মনে করলে তা হবে বোকার স্বর্গে বাস করা। আর একে মামুলি বিষয় মনে করার কারণ জামায়াত সম্পর্কে অজ্ঞতা। জানা উচিত জামায়াতের ‘টার্গেট ২০২০’ সম্বন্ধে।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর সাড়ে তিন বছর আত্মগোপনে থাকা রাজাকাররা প্রকাশ্যে আসা শুরু করে। জিয়ার বদান্যতায় জামায়াত যখন রাজনীতি শুরু করে তখন ১৯৭৮ সালে গোলাম আযমের নেতৃত্বে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় যার লক্ষ্য ২০২০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল - "টার্গেট ২০২০"।

টার্গেট ২০২০-এর মধ্যে যে কৌশল প্রণয়ন করা হয় তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:
১. জামায়াতে ইসলামীর নতুন নামকরণকৃত ছাত্র সংগঠন ছাত্র শিবিরের মাধ্যমে স্কুল পর্যায় থেকে ধর্ম প্রচারের নামে সদস্য তৈরি এবং তাদেরকে মওদুদী রচিত বিভিন্ন বই পড়ানো যা ব্রেইনওয়াশের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করে।

২. শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থসহ পাঁচটি লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা।

৩. সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করা এবং দলীয় লোকদের সংশ্লিষ্ট সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত করা, প্রমোশন দেয়াসহ সর্বাত্মক সহযোগিতা করা। এছাড়া নিজেদের বিনিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাবে শুধু দলীয় সদস্যরা

৪. যে কেউ চাইলেই হঠাৎ করে জামায়াত-শিবিরে যুক্ত হতে পারবে না। আস্থা অর্জন করে বিশ্বস্ত হিসেবে গণ্য হলে কলেমা পড়ে ও কোরআন ছুঁয়ে শপথ করতে হয়। সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বস্ততার ভিত্তিতে নির্ধারিত গোপন বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত করা হয়।

৫. সংগঠনের প্রতি আদর্শিক ও মনস্তাত্ত্বিক মনোভাবকে প্রভাবিত করতে শিবিরের ক্ষেত্রে সামান্য অংকের মাসিক চাঁদা এবং চাকুরীজীবী ও ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে বেতন বা লাভের ১০% থেকে ১৫% দলীয় ফাণ্ড বায়তুল মালে জমা দিতে । এবং

৬. তাকিয়া: জীবন বাঁচাতে কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে ধর্মান্তরিত হওয়াকে শিয়া মতবাদে নাম দেয়া হয়েছে তাকিয়া। এ নীতিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছিল মওদুদী। মওদুদী তাকিয়ায় দলের সদস্যরা দলের স্বার্থ রক্ষায় দলে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং নিজের প্রভাব-বলয় তৈরি করবে। জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে হয়তো আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টির খ‍্যাতনামা তাকিয়া জামায়াতিদের চেনা যেত! [তবে লক্ষণ বুঝতে সাবেক ছাত্রী সংস্থা/জামায়াত-শিবিরের আশেপাশে যারা থাকে তাদের গেটআপ দেখতে পারেন।]

জামায়াত-শিবিরকে আমরা রাজনৈতিক সংগঠন মনে করি, প্রকৃতপক্ষে জামায়াতে ইসলামী একটি ধর্মীয় মতবাদের নাম। ইসলামের নামে শিয়া, সুন্নি মতবাদ রয়েছে; এমন আরেকটি ভার্সন হচ্ছে জামায়াত, যার প্রবর্তক মওদুদী। তার কিছু লেখা রয়েছে যা পাবলিক নয়, শুধুমাত্র শীর্ষ দুই ধাপের সদস্যদের পাঠ‍্য। তাদের যদি জিজ্ঞেস করেন, ইসলাম মানার জন্য কেন মওদুদীই পড়তে হবে তাহলে সন্তোষজনক জবাব দিতে পারবে না। হাসিমুখে আদবের সাথে ধর্মের কথা বলা জামায়াতের প্রকৃত রূপ উপলব্ধি করতে নিজেকে ইরাকে বসবাসকারী ভেবে দেখুন!

মওদুদী মতবাদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার নাম ইসলাম এবং এজন্য মিথ্যা বলাসহ দলের স্বার্থে সব অপকর্ম হালাল। জামায়াতের সদস্যদের কাছে দলের রহস্য প্রকাশিত হয় ধীরে ধীরে। কেউ যদি জামায়াতের প্রকাশিত মতবাদও বোঝে, তাহলে তার জামায়াত-শিবিরে যোগ দেয়ার কথা নয়। এ কারণে সদস্য হিসেবে তাদের লক্ষ্য কিশোর-তরুণরা।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতবিরোধের মধ্যে পার্থক্য কতটুকু তা বুঝলেই কেবল উপলব্ধি করা যাবে, একজন জামায়াত/শিবির কখনো বিএনপিও হবে না, আওয়ামী লীগ তো দূরের কথা! একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান শিবির হতে পারে, কিন্তু একজন জামায়াতির সন্তান পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করবে- এটা বোধহয় অসম্ভব।

সারাদেশে জামায়াত-শিবিরের যারা আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেও দিচ্ছে, তারা জামায়াতের অনুমতি নিয়ে তাদের স্বার্থ রক্ষা করতেই এসেছে। এজন্য বায়তুল মালের বিপুল পরিমাণ অর্থের কাছে কয়েক কোটি টাকার অংক খুবই ক্ষুদ্র। আজ যাকে স্থান দেয়া হচ্ছে, সে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হবে। অন‍্যদিকে নিজে ক্লিন থেকে আরও দশজন তাকিয়া জামায়াতিকে দলে স্থান দিবে। প্রভাব বিস্তার করবে। দলীয় পরিচিতি নিয়ে ভয়াবহ কাণ্ড ঘটানোর প্রেক্ষাপট তৈরি করবে।‌ জামায়াতি ধর্মের জন্য জেহাদের নামে জীবন দিতে কার্পণ্য করবে না - এমন সদস্য রয়েছে অগণিত।

সাময়িক সুবিধার জন্য বা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য যারা জামায়াতিকরণে জড়িত তারা শুধু আদর্শকে জলাঞ্জলি দেননি, দল ও দেশের জন্য দুর্ভাগ্য ডেকে আনতে সহযোগির ভূমিকা পালন করেছেন! ২০০৬ সালেও জামায়াত ২০২০ সালের মধ্যে ক্ষমতায় আসাকে সম্ভব মনে করতো। এখন মনে হচ্ছে, ২০০৮-এর নির্বাচন তাদের পরিকল্পনাকে ভণ্ডুল করেনি, দীর্ঘায়িত করেছে শুধু!

আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল, সাবেক ছাত্রনেতা ও তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ।

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫৩ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২১ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৬ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১১৪ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৮ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১৩১ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ