আজ রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

তুলনামূলক ইতিহাসপাঠেই বঙ্গবন্ধুর যথাযথ মূল্যায়ন

আরিফ রহমান  

“পাকিস্তান এক সুন্দর ফুলের ফুলদানীর নাম আর শেখ মুজিব সেখানে এক বিষাক্ত মৌমাছি। সে সমস্ত মধু শুষে নেবে এবং হাতুড়ি দিয়ে এই ফুলদানীকে ভেঙ্গে চৌচির করবে।”

ষাটের দশকের এক পাকিস্তানি দার্শনিকের ভবিষ্যৎবাণী এটা। পাকিস্তান নামক দেশটি প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা পতন দিবস পালন করে। দুঃখ দুঃখ মনে টক-শো করে, বিশ্লেষণ করে, কেন পাকিস্তানের পতন হল। এরকম একটা টক শো দেখছিলাম ইউটিউবে। বিভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণ করে তারা দেখালেন সব কিছুর পেছনে মুজিব দায়ী।

বিরোধী শিবিরকে জানাটা এজন্যই জরুরি।

আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের ক্রেডিট ডিস্ট্রিবিউশানে এক শ্রেণীর মানুষের চুলকানি রোগ দেখা যায়। এক শ্রেণীর মানুষ জিয়ার সাথে বঙ্গবন্ধুর তুলনা করে বসে। এসব তুলনা কতোটা যৌক্তিক সেটা বুঝতে হইলে পাকিস্তানি সমরনায়কদের লেখা বই-পুস্তক, পাকিস্তানি সমালোচক, বিশ্লেষকদের বিভিন্ন লেখা, তাদের বিভিন্ন টক-শো এসব দেখা দরকার। পাকিস্তানি কোন লেখকের বাংলাদেশ ইস্যুতে লেখা এমন একটা বই কেউ দেখাতে পারবে না যেখানে "মুজিব" নামটি নাই।

তুলনামূলক বিশ্লেষণের অভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত বিভ্রান্তি। আমাদের গণহত্যাকে আমারা ভয়াবহ বলি কিন্তু আর কয়টা গণহত্যা সম্পর্কে আমরা খোঁজ রাখি? আমাদের স্কুল কলেজে শেখানো হয়? এভাবে অন্ধকারে থাকতে থাকতে আমরা মেশিনের মত যুদ্ধটাকে ঠিকই ভয়াবহ বলতে শিখেছি কিন্তু সেই ভয়াবহতাকে অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে শিখি নাই।

আমাদের মা-বোনদের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস নজিরবিহীন কিন্তু অন্য যুদ্ধের নারী নির্যাতন সম্পর্কে না জানলে আমাদের ওপরে চালানো পাক বাহিনীর নির্যাতন কতোটা ভয়াবহ ছিল সেটা কি আমরা হৃদয় দিয়ে আত্মস্থ করতে পারবো?

সাত মার্চের ভাষণ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণ গুলোর একটা এটা আমরা জানি, কিন্তু কখনো কি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলো শুনে দেখেছেন? না শুনলে কি করে বুঝবেন এই ভাষণের বিশেষত্ব কোথায়?

মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা নিয়ে এত সন্দেহ, 'নয় মাসে কি করে তিরিশ লাখ মানুষ মারা যায়?' প্রশ্ন করেই সারা, কখনো পৃথিবীর গণহত্যার দিকে চোখ পড়েছে কি? খোঁজ করেছেন কোন যুদ্ধে কোন দেশে কত সৈন্য কত দিনে কত মানুষ মেরেছে? না দেখলে কি করে বুঝবেন এর চেয়ে বড় বড় গণহত্যা পৃথিবীতে ঘটেছে যেখানে নয় মাসের কম সময়ে তিরিশ লাখের বেশি মানুষকে হত্যা করে হয়েছে, তিরিশ লক্ষ মেনে নেয়া অসম্ভব হলে সেগুলো কি করে সম্ভব হলো? সেসব দেশের সবাই কেমন করে এক বাক্যে মেনে নিলো, সেসব খতিয়ে দেখেছেন?

ভারত আমাদের সহযোগিতা না করলে স্বাধীন হতাম কি না সেই প্রশ্নে আমাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। কোনদিন খোঁজ নিয়ে দেখেছেন পৃথিবীতে কোন দেশটা স্বাধীন হবার জন্য পাশের দেশের সহযোগিতা নেয় নি? এটাতে এত দুঃখ পাবার কি আছে যে আমাদের স্বাধীনতার ভারত সাহায্য করেছে? ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তো চীন অনেক সহায়তা করেছে, তাতে কি ভারতের স্বাধীনতা ম্লান হয়ে যায়? পৃথিবীর কোন দেশ পাশের দেশের সাহায্য ছাড়া স্বাধীন হয়েছে? তাহলে কিসের এত হীনমন্যতা?

রাজাকারের সংজ্ঞা নিয়ে এত মত পার্থক্য। অন্য দেশের যুদ্ধ গুলোতে কি রাজাকার ছিল না? প্রতিটা যুদ্ধেই নিজের দলের বিশ্বাসঘাতক থাকে, যেমন জামাত ছিল আমাদের যুদ্ধের বিশ্বাসঘাতক। কম্বোডিয়ায় রাজাকার ছিল, রুয়ান্ডায় রাজাকার ছিল, চীনে রাজাকার ছিল, হিটলারের ইহুদি নিধনেও অনেক স্বজাতির সহযোগিতা ছিল। তুলনা না করে ক্যাসেট বাজিয়ে চেতনার গান শুনতে থাকলে গান আপনার ঠিকই মুখস্থ হবে কিন্তু কি বলতে চাওয়া হয়েছে সেটা কোনদিনই বুঝতে পারবেন না।

১৫ই আগস্ট শুধু ভাষণ চালাতে থাকলে এক যুগ পরে এদেশের বাচ্চারা ২-৩ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধুর সব ভাষণ মুখস্থ বলতে পারবে, কিন্তু ভাষণে কি বলা হয়েছে সেই স্পিরিট-টা কোনদিনই ধরতে পারবে না। আর পারে না দেখেই আমাদের মধ্যে সহজে বিভ্রান্তি ছোড়ানো যায়। ইতিহাসকে খেলো করে ফ্যালা যায়।

পাকিস্তানের একটা কলেজ পড়ুয়া ছেলেও বলে দিতে পারে যে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার দায় একজন শেখ মুজিবের, অথচ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পাশ কাবিলদেরও এই সত্য মেনে নিতে কষ্ট হয়।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি কর্মসূত্রে আমার বাবা দীর্ঘ প্রায় সাত বছর আফগানিস্তান ছিলেন। সেখানে হেরাত কিংবা কান্দাহারের মত একেবারে দুর্গম অঞ্চলে; যেখানে বিদ্যুৎ তো দূরে থাক সংবাদপত্র কিংবা স্কুল নেই, যেখানকার অনেক মানুষ বাংলাদেশের নামটা পর্যন্ত জানে না, সেসব জায়গার বয়স্ক মানুষেরাও পাকিস্তানের সাহসী নেতা শেখ মুজিবের নাম জানে। বেলুচিস্তানে শেখ মুজিবের নামে বিপ্লবীরা উদ্বেলিত হয়, কিউবায় মুজিবের নাম নেয়া হয় সম্মানের সাথে, বিশ্ব রাজনীতির ছাত্ররা মুজিবকে চেনেন পাঠ্য হিসেবে।

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা- আমাদের দেশে এ সবকিছুর এমন অবমূল্যায়ন ততদিন চলবে যতদিন পর্যন্ত না আমরা তুলনামূলক ইতিহাস পাঠে উৎসাহী হয়ে উঠবো, অন্তর দিয়ে অনুধাবন করতে শিখব।

আরিফ রহমান, লেখক, অনলাইন এক্টিভিষ্ট

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। sylhettoday24.com-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে যার মিল আছে এমন সিদ্ধান্তে আসার কোন যৌক্তিকতা সর্বক্ষেত্রে নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে sylhettoday24.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় গ্রহণ করে না।

আপনার মন্তব্য

লেখক তালিকা অঞ্জন আচার্য অসীম চক্রবর্তী আজম খান ১০ আজমিনা আফরিন তোড়া ১০ আফসানা বেগম আবু এম ইউসুফ আবু সাঈদ আহমেদ আব্দুল করিম কিম ২০ আব্দুল্লাহ আল নোমান আব্দুল্লাহ হারুন জুয়েল আমিনা আইরিন আরশাদ খান আরিফ জেবতিক ১৩ আরিফ রহমান ১৪ আরিফুর রহমান আলমগীর নিষাদ আলমগীর শাহরিয়ার ৪০ আশরাফ মাহমুদ আশিক শাওন ইমতিয়াজ মাহমুদ ৫৩ ইয়ামেন এম হক এখলাসুর রহমান ১৯ এনামুল হক এনাম ২৫ এমদাদুল হক তুহিন ১৯ এস এম নাদিম মাহমুদ ২১ ওমর ফারুক লুক্স কবির য়াহমদ ৩১ কাজল দাস ১০ কাজী মাহবুব হাসান খুরশীদ শাম্মী ১২ গোঁসাই পাহ্‌লভী ১৪ চিররঞ্জন সরকার ৩৫ জফির সেতু জহিরুল হক বাপি ২৮ জহিরুল হক মজুমদার জান্নাতুল মাওয়া জাহিদ নেওয়াজ খান জুয়েল রাজ ৭৫ ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন ড. কাবেরী গায়েন ২২ ড. শাখাওয়াৎ নয়ন ডা. সাঈদ এনাম ডোরা প্রেন্টিস তপু সৌমেন তসলিমা নাসরিন তানবীরা তালুকদার দিব্যেন্দু দ্বীপ দেব দুলাল গুহ দেব প্রসাদ দেবু দেবজ্যোতি দেবু ২৬ নিখিল নীল পাপলু বাঙ্গালী পুলক ঘটক ফকির ইলিয়াস ২৪ ফজলুল বারী ৬২ ফড়িং ক্যামেলিয়া ফরিদ আহমেদ ৩৩ ফারজানা কবীর খান স্নিগ্ধা বদরুল আলম বন্যা আহমেদ বিজন সরকার বিপ্লব কর্মকার ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ১৬ ভায়লেট হালদার মারজিয়া প্রভা মাসকাওয়াথ আহসান ১১৩ মাসুদ পারভেজ মাহমুদুল হক মুন্সী মিলন ফারাবী মুনীর উদ্দীন শামীম ১০ মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১১৮ মো. মাহমুদুর রহমান মো. সাখাওয়াত হোসেন মোছাদ্দিক উজ্জ্বল মোনাজ হক রণেশ মৈত্র ১৩১ রতন কুমার সমাদ্দার রহিম আব্দুর রহিম ১৭ রাজেশ পাল ১৯ রুমী আহমেদ রেজা ঘটক ৩২ লীনা পারভীন শওগাত আলী সাগর শাখাওয়াত লিটন শামান সাত্ত্বিক শামীম সাঈদ শারমিন শামস্ ১৪ শাশ্বতী বিপ্লব শিতাংশু গুহ শিবলী নোমান শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ ২৪ শেখ মো. নাজমুল হাসান ২১ শেখ হাসিনা শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী সঙ্গীতা ইমাম সঙ্গীতা ইয়াসমিন ১৬ সহুল আহমদ সাইফুর মিশু সাকিল আহমদ অরণ্য সাব্বির খান ২৮

ফেসবুক পেইজ