শাকিব সালমান, নিউ ইয়র্ক থেকে | ২৯ মে, ২০২৫
২৪ মে শনিবার বেলা ১২টা; লোকে লোকারণ্য নিউ ইয়র্কের জয়া হল। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছেন খ্যাতিমান লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা’র আহ্বায়ক বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, আরও অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার আছেন কমিটিতে। উদ্বোধন করছেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বেলাল বেগ। সকলের হাতে জাতীয় পতাকা। ধীর পায়ে সবাই এগিয়ে যাচ্ছেন, বুকস্টগুলোর দিকে। সামনেই ফিতা। ফিতা কেটেই উদ্বোধন ঘোষণা করলেন বেলাল বেগ। এভাবেই সাক্ষী হলেন হল ভর্তি হাজারো মানুষ। একটি ইতিহাস রচিত হলো বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা'র যাত্রাশুরুর ক্ষণের।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে অভিবাদন জ্ঞাপনের পর সমস্বরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনার মধ্যদিয়ে নিউ ইয়র্কে শুরু হয় দুদিনের ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা’। মেলায় শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণী, নির্বিশেষে সর্বস্তরের প্রবাসীর ঢল নেমেছিল।
এবারের আয়োজক ছিল 'একাত্তরের প্রহরী' নামক একটি প্ল্যাটফর্ম। বইমেলায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন খ্যাতিমান লেখিকা তসলিমা নাসরিন। ছিলেন ভারত, বাংলাদেশ ও প্রবাসের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক-লেখক-মানবাধিকার সংগঠকরা।
বক্তব্যকালে বাংলাদেশের ধর্মীয় মৌলবাদী-জঙ্গিদের প্রাণনাশের হুমকিতে নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন বলেন, ৩১ বছর যাবত নির্বাসিত জীবন-যাপন করছি। আমি নিজের দেশে যেতে পারি না। যে পশ্চিমবঙ্গে বাস করছিলাম সেখানেও নিরাপত্তাহীনতা, সেখানেও এখন আমার স্বাধীনতা নেই। এখানে আমি এসেছি শুধু দেখতে যে, কী ঘটছে এখানে। এই সিটিতেই আরেকটি বইমেলা হচ্ছে, শুনেছি ওখানে সবাই জয় বাংলার পক্ষে নয়, তাই ঐ বইমেলা (মুক্তধারা আয়োজিত মেলার প্রতি ইঙ্গিত করে) অনেক বড় এবং পুরনো জানা সত্ত্বেও আমি ওখানে যাবার ব্যাপারে কোন আগ্রহ প্রকাশ করিনি। আমি এখানে এসেছি কারণ, আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ।তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশের পক্ষের মানুষ এবং স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। আমি এখানে এসেছি এবং আপনাদের আবারো ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আমাকে এইভাবে সম্মান জানানোর জন্যে। কারণ আমি জানি ঐ বইমেলায় এমন অনেক মানুষ থাকবে যারা নারীবিদ্বেষী, যারা আমাকে ওখানে একেবারেই সম্মান জানাবে না, তা আমি জানি। সুতরাং আপনারা যে আন্তরিকতা দেখালেন তা আমি চিরকাল মনে রাখবো।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনির মধ্যে তসলিমা উচ্চারণ করেন, আপনারাই আমার দেশ। এখানে এসে এই যে ভালবাসা আমি পাচ্ছি সেই ভালবাসাই আমাদের দেশ।
মেলায় প্রবর্তিত এবারের সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডার কলেজ অব মেডিসিনের অধ্যাপক ও সহকারী ডিন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টম গ্র্যাজুয়েশনকারি কবি, সাহিত্যিক, গীতিকবি, ছড়াকার এবং কলামিস্ট সেজান মাহমুদ। নগদ দুই হাজার ডলারসহ বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট বিপুল করতালির মধ্যে হস্তান্তর করেন মেলা কমিটির আহবায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ড. নুরুন্নবী এবং বিজ্ঞানী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. জিনাত নবী।
এর আগে এই সাহিত্য পুরস্কারের প্রেক্ষাপট ও সেজান মাহমুদের বর্ণাঢ্য সাহিত্য-কর্মজীবন উপস্থাপন করেন প্রবাসের আরেক জনপ্রিয় কবি-কলামিস্ট-সংগঠক ফকির ইলিয়াস। ফুল দিয়ে লেখককে বরণ করেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম। অ্যাওয়ার্ড হস্তান্তরের সময় পাশে ছিলেন বইমেলার সদস্য-সচিব স্বীকৃতি বড়ুয়া এবং আবৃত্তিশিল্পী গোপন সাহা।
উল্লেখ্য, এই সাহিত্য পুরস্কার প্রতিবছরই বইমেলায় একজনকে প্রদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় এবং তা স্পন্সর করবে ‘ড. নবী ও জিনাত নবী ফাউন্ডেশন’। আর এ পুরস্কারের নাম হচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বইমেলা নবী-জিনাত সাহিত্য পুরস্কার’সময়ের প্রয়োজনে ‘আমরা বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে অবিচল’ স্লোগানে আয়োজিত এই বইমেলার জন্যে গঠিত কমিটির দায়িত্বশীলদের মধ্যে বক্তব্য দেন যুগ্ম আহবায়ক ও বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি আব্দুল কাদের মিয়া, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. ফজলুল হক, মানবাধিকার সংগঠক-লেখক-অধ্যাপক ড. পার্থ ব্যানার্জি, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডিসট্রিক্ট লিডার ড. দিলীপ নাথ, কম্যুনিটি লিডার রানা হাসান মাহমুদ, অধ্যাপক এ বি এম নাসের, সাংবাদিক দস্তগীর জাহাঙ্গীর, সাংস্কৃতিক সংগঠক লুৎফুন্নাহার লতা, মিথুন আহমেদ, ফোবানার সাবেক চেয়ারম্যান জাকারিয়া চৌধুরী প্রমুখ। সমসাময়িক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে চমৎকার একটি মুক্ত আলোচনার সঞ্চালনা করেছেন মিনহাজ আহমেদ সাম্মু।
গোপন সাহা, সাবিনা শারমিন এবং তাহরিনা পারভিন প্রীতির উপস্থাপনায় উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন আল আমিন বাবু এবং জাতীয় সংগীতে নেতৃত্ব দেন নিলোফার জাহান।
বিদ্যাপ্রকাশ, নালন্দা, ঘুংঘুর, শব্দগুচ্ছ, অক্ষর, জয় বাংলা পাঠাগার, বিপা, অনুপমা বুকস, রাইটার্স ক্লাব, জয় বাংলা বুকস, আমরা শিশুদের সঙ্গী, গুরুচণ্ডালী,একাত্তরের প্রহরীসহ মেলায় ছিল ১৬টি বুক স্টল; যেখানে দেশ ও প্রবাসের খ্যাতিমান লেখকদের প্রকাশিত নতুন বইয়ের পাশাপাশি ছিল ইতিহাসভিত্তিক গবেষণা গ্রন্থ।
মেলার সকল আয়োজনকে ছাপিয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আন্তর্জাতিক জনমত সুসংগঠিত করতে বিশেষ ভূমিকা পালনকারী ‘স্বাধীনতায় ডাক টিকিট’র ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের সাথে বীরাঙ্গনাদের ওপর নির্মিত ‘জননী-৭১’র প্রদর্শন।
মাত্র ১০ দিনের প্রস্তুতিতে অনুষ্ঠিত এ বইমেলায় এসেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া, নর্থ ক্যারলিনা, ওহাইয়ো, ওয়াশিংটন ডিসি, ফ্লোরিডা, ইংল্যান্ড, কানাডা, জার্মানি সহ বিভিন্ন স্টেট ও দেশের কবি-লেখক-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরাও।
জনপ্রিয় শিল্পী দিনাত জাহান মুন্নির জাগরণী সংগীতের মাধ্যমে গভীর রাতে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানমালার সমাপ্তি ঘটার আগে সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি পর্বে ছিলেন আবীর আলমগীর, কান্তা আলমগীর, সেলিমা আশরাফ, নিলোফার জাহান, পারভিন সুলতানা, শুক্লা রায়, জারিন মাইশা, কামেলা সোফি আলম, আমিনা ইসলাম, রুদ্রনীল দাস রুপাই, পিঙ্কি চৌধুরী, পিংকি চৌধুরী, পাপড়ি বড়ুয়া, দিনার মনি, আনিশা হোসেন, দানিয়া সৈয়দ দিয়া, এলমা রুদমিলা, লিমন চৌধুরী, ফারহানা তুলি, তন্ময় মজুমদার, জিএইচ আরজু, মুমু আনসারী প্রমুখ।