Sylhet Today 24 PRINT

যুক্তরাষ্ট্রের ‘পাবলিক চার্জের কঠোর প্রয়োগে’ ভিসা প্রত্যাখ্যান, উদ্বেগে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশিরা

জয়েন্ট স্পনসরেও সংকট

শাহ্ এ সুমন, নিউইয়র্ক |  ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারভিত্তিক অভিবাসন ভিসার আবেদনে ‘পাবলিক চার্জ’ বিধানের প্রয়োগ ও স্পনসরশিপের আর্থিক শর্ত নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে। দীর্ঘদিন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অপেক্ষার পর পুনরায় সাক্ষাৎকারে অংশ নিয়েও পাবলিক চার্জের কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন একাধিক বাংলাদেশি পরিবারের সদস্য।

সামনে আসা ঘটনাগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বয়স্ক বাবা-মায়ের আবেদনও রয়েছে। তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা উল্লেখ করে অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের ২১২(এ)(৪) ধারায় ভিসা প্রত্যাখ্যানের কথা জানানো হচ্ছে।

একই সময়ে স্পনসরের আয়, কর বিবরণী, চাকরি, সম্পদ ও আর্থিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন কিছু আবেদনকারী। নিজস্ব আয় যথেষ্ট না হলে যোগ্য যৌথ স্পনসরের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ বহাল থাকলেও এমন স্পনসর পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিজ্ঞতায়, আর্থিক দায় ও যাচাই নিয়ে উদ্বেগের কারণে পরিচিতজনদের কেউ কেউ যৌথ স্পনসর হতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ থেকে মিজান সিদ্দিকী জানান, তাঁর বাবার অভিবাসন ভিসার প্রথম সাক্ষাৎকার হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৬ জুন। এরপর দীর্ঘদিন আবেদনটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় ছিল। সম্প্রতি পুনরায় সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হলেও শেষ পর্যন্ত পাবলিক চার্জের কারণ দেখিয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তাঁর বাবা সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন বলে কনস্যুলার কর্মকর্তা মনে করেছেন এমনটি প্রত্যাখ্যান নোটিশে বলা হয়েছে । তবে কোন আর্থিক বা ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা নোটিশে বিস্তারিত উল্লেখ নেই।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বাংলা পত্রিকাকে জানিয়েছেন সিলেটের ষাটোর্ধ্ব এক বাংলাদেশি নারীর পরিবারের সদস্যরা। তাঁর ছেলে মিশিগানে বসবাস করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ছেলের আবেদনের ভিত্তিতে ওই নারী ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে প্রথম সাক্ষাৎকারে অংশ নিলেও ভিসা পাননি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিসা ইস্যু স্থগিত থাকার কারণে তখন আবেদনটির নিষ্পত্তি হয়নি।

গত ২২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎকার দিতে যান তিনি। পরিবারের দাবি, সাক্ষাৎকার শেষে কনস্যুলার কর্মকর্তা তাঁকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে তিনি সরকারি সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন বলে তাঁর ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

এসব অভিজ্ঞতা বয়স্ক বাবা-মাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক পরিবারের উদ্বেগ সামনে আনলেও বাংলাদেশি আবেদনকারীদের মধ্যে পাবলিক চার্জের কারণে প্রত্যাখ্যান কতটা বেড়েছে, তার সামগ্রিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

জয়া সরকার নামে আরেক বাংলাদেশি একটি ফেসবুক গ্রুপে জানিয়েছেন, তাঁর বাবার অভিবাসন ভিসার সাক্ষাৎকার হয়েছিল ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

সাক্ষাৎকারের পর আবেদনটি ২২১(জি) ধারায় রাখা হয়। পরে ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট জমা দিতে বলা হয়।

জয়ার দাবি, ২১ জানুয়ারি থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য ভিসা ইস্যু স্থগিত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে দূতাবাস পাসপোর্ট ফেরত দেয় এবং ফোন করে স্থগিত থাকার বিষয়টি জানায়। সর্বশেষ ৪ অক্টোবর তাঁর বাবার কেসটি আবার হালনাগাদ হলেও ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের কনস্যুলার ইলেকট্রনিক অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারে ‘রিফিউজড’ দেখাচ্ছে।

তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় থাকা আবেদনও ২২১(জি) ধারায় প্রত্যাখ্যাত হিসেবে প্রদর্শিত হতে পারে। প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সেটি পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে। ফলে জয়ার বাবার অনলাইন স্ট্যাটাসকে শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে পাবলিক চার্জজনিত প্রত্যাখ্যান বলা যায় না। প্রত্যাখ্যানের ধারা ও দূতাবাসের লিখিত নির্দেশনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

স্পনসরশিপের সংকটের আরেকটি উদাহরণ পাওয়া গেছে নিউইয়র্কে বসবাসরত এক বাংলাদেশি-আমেরিকানের অভিজ্ঞতায়। তিনি তাঁর বোন, বোনের স্বামী ও তাঁদের সন্তানদের জন্য আবেদন করেছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর চলতি অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে চার সদস্যের পরিবারের ভিসা সাক্ষাৎকারের তারিখ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় আর্থিক দায়িত্বের বিপরীতে তাঁর আয় যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

ওই ব্যক্তির ভাষ্য, যৌথ স্পনসরের জন্য আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কাউকে পাচ্ছেন না। অনেকে সহায়তা করতে চাইলেও আর্থিক দায় ও নতুন যাচাইয়ের বিষয়ে উদ্বেগ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন। সাক্ষাৎকারের সময় ঘনিয়ে আসায় প্রয়োজনীয় আর্থিক নথি প্রস্তুত করা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে পরিবারটি।

নিউজ উইকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী , যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে পাবলিক চার্জের বিধান আগে থেকেই রয়েছে। এর আওতায় আবেদনকারী ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, তা মূল্যায়ন করা হয়। ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীর বয়স, স্বাস্থ্য, পারিবারিক অবস্থা, শিক্ষা, দক্ষতা ও আর্থিক সম্পদের পাশাপাশি স্পনসরের আর্থিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় আসতে পারে। তাই আর্থিক সহায়তার অঙ্গীকারপত্র বা ফরম আই-৮৬৪ জমা দিলেই ভিসা অনুমোদন নিশ্চিত হয় না।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে,এই মূল্যায়নে বয়স্ক বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে বয়স ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরিস্থিতি প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে বয়স বেশি হলেই ভিসা প্রত্যাখ্যান হবে, এমন স্বয়ংক্রিয় বিধান নেই। আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি ও পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ন্যূনতম আয়ের শর্ত পূরণ করা এবং পাবলিক চার্জের আপত্তি কাটিয়ে ওঠা সম্পর্কিত হলেও পৃথক মূল্যায়নের বিষয়।

দ‍্য অ‍্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি পাবলিক চার্জসংক্রান্ত ২০২২ সালের বিধিমালা বাতিল করেছে। নতুন বিধান ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনার ও সিদ্ধান্তের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।

সিবিএস নিউজ তাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, স্পনসরশিপের ক্ষেত্রে অধিকাংশ পরিবারভিত্তিক আবেদনে স্পনসরের বার্ষিক আয় ফেডারেল দারিদ্র্যসীমার অন্তত ১২৫ শতাংশ হতে হয়। এটি নতুন কোনো শর্ত নয়। দারিদ্র্যসীমার বার্ষিক হালনাগাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আয়ের ডলারের অঙ্ক পরিবর্তিত হয়।

ইউএসসিআইএস এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিউইয়র্কসহ মূল ভূখণ্ডের ৪৮টি স্টেট ও ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়ায় দুই সদস্যের পরিবারের জন্য সাধারণ স্পনসরের ন্যূনতম বার্ষিক আয় ২৭ হাজার ৫০ ডলার। তিন সদস্যের জন্য ৩৪ হাজার ১৫০ ডলার এবং চার সদস্যের জন্য ৪১ হাজার ২৫০ ডলার প্রয়োজন। পাঁচ সদস্যের ক্ষেত্রে ৪৮ হাজার ৩৫০ ডলার, ছয় সদস্যের জন্য ৫৫ হাজার ৪৫০ ডলার, সাত সদস্যের জন্য ৬২ হাজার ৫৫০ ডলার এবং আট সদস্যের জন্য ৬৯ হাজার ৬৫০ ডলার। আটজনের বেশি হলে অতিরিক্ত প্রত্যেক সদস্যের জন্য ৭ হাজার ১০০ ডলার যোগ হয়। আলাস্কা ও হাওয়াইয়ে আলাদা সীমা প্রযোজ্য।

এদিকে পাবলিক চার্জের কারণে ভিসা প্রত্যাখ্যানের পরও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রমাণ দিয়ে আপত্তি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে। যোগ্য যৌথ স্পনসর বা পর্যাপ্ত আর্থিক সম্পদের নথি সহায়ক হতে পারে, যদিও নতুন নথি জমা দিলেই অনুমোদন নিশ্চিত নয়। ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট গত ৫ আগস্ট জানিয়েছে, নির্বাচিত কিছু অভিবাসন ভিসার আবেদনে পাবলিক চার্জ বন্ডের পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়; সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে কনস্যুলার কর্মকর্তা জানাবেন। অন্য সব যোগ্যতা পূরণ হলে বন্ড অনুমোদনের ভিত্তিতে আগে ২১২(এ)(৪) ধারায় প্রত্যাখ্যাত ভিসা ইস্যুর সুযোগ থাকতে পারে।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.