দীপ্ত বৈষ্ণব | ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ফাইল ছবি
১৫ই ফেব্রুয়ারির ফেব্রুয়ারির এই দিনে জন্মগ্রহন করেছিলেন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিম । এ বছর তার এ ১১১ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্য জন্মস্থান ধল আশ্রমে অনুষ্ঠিত হয়নি লোকউৎসব।
১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার ধল-আশ্রম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাউল সম্রাট শাহ আাব্দুল করিম। তার পিতার নাম ইব্রাহীম আলী ও মাতার নাম নাইওরজান। বাংলা সংস্কৃতির ধারায় তিনি আজ এক অনন্য নাম।
তার জন্ম উপলক্ষ্যে উদযাপিত লোকউৎসবের ব্যাপারে জানতে চাইলে, শাহ আবদুল করিম পরিষদের সভাপতি ও শাহ আব্দুল পুত্র, শাহ-নুরজালাল বলেছেন, আমাদের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিলো। তিনি জানান, কিছু দিন আগে জেলা প্রশাসক বলেছিলেন নির্বাচনের পরে লোকউৎসব করতে। ইতিমধ্যে তিনি ১৫-১৬ তারিখ এ লোকউৎসব করার জন্য বললেও এমন একটি অনুষ্ঠান হুটাহাট করা যায়না বলে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সামনে রমজান তাই এ বছর লোকউৎসব হবে কি না এখনো নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তাছাড়া লোকউৎসবটি বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন কোম্পনি ও ব্যাবসায়ীদের স্পন্সরে হতো । এখন হুটহাট করে এসব আয়োজন সম্ভব নয়। সামনে রমজান, এখনো কোন সিধান্ত হয়নি। তবে নিয়ম রক্ষার্থে আব্দুল করীমের শিষ্য-অনুরাগীরা আজ সকালে সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পন করেছেন।
এ ব্যাপারে শাহ-আব্দুল করীম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দ্রোপদ চৌধুরী নুপুর স্মৃতিচারন করে ভারাক্রান্ত হয়ে বলেন, ১৯৭৬ সনে আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি, তখন শাহ-আব্দুল করীম ১৫ ফেব্রুয়ারীতে নিজ বাড়িতে প্রথম লোক উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। এর আগে উনার(শাহ আব্দুল করীম) মুর্শিদ মৌল্লা বক্সের বাড়িতে (উকিরগাও,শান্তিগঞ্জ) ফাল্গুনের প্রথম রবিবারে বাউল গানের আসরের আয়োজন হতো। সেখানে উৎসব শেষ করে করীম সাহেব নিজ বাড়িতে এসে উৎসব করতেন। দুই দিন ব্যাপি উৎসবের প্রথম দিন বাউল গান এবং দ্বিতীয় দিন কির্তনের আয়োজন করতেন। এমন অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য হিংসাখোরদের দ্বারা জীবনদশায় উনি এলাকায় বহুবার নির্যাতিত হয়েছেন। এজন্য উনি দুঃখে পদ রচনা করে বলে গিয়েছিলেন, ‘হিংসাখোরগন বলে এখন আব্দুল করীম নেশাখোর।’ এসব হিংসাখোরেরা এখনো তৎপর কুৎসা রচনা করতে।
তিনি আরো বলেন, উনার মৃত্যুর প্রায় ২ যুগ পর কয়েকবছর ধরেই পরম্পরা অনুযায়ী বিভিন্ন টেলিকম কোম্পানি ও স্থানীয়দের সংযোগীতায় ব্যাপক পরিসরে লোকউৎসব উদযাপনের চেষ্টা করছি আমরা । তবে নির্বাচন এবং রমজান মাসের কারনে এ বছর হবে কিনা এখনো নিশ্চয়তা দেখছি না। তবে আজ রাতে শাহ-আব্দুল করীমের শিষ্য ও ভক্ত-আশেকানরা তার সমাধিঘরে বিভিন্ন বাউল মুর্শিদী গানের আসর করে শ্রদ্ধা জানাবেন।
তিনি আরো বলেন, আজ ১৫ ফেব্রুয়ারী সকালে শাহ আবদুল করীম ও উনার সহধর্মিণী সরলা খাতুনের সমাধিতে পুস্পমাল্য অর্পনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে জন্ম বার্ষিকির প্রথম প্রহর উদযাপন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘গাড়ি চলে না, চলে না’, ‘বন্ধে মায়া লাগাইছে’, ‘মুর্শিদ ধন হে’, ‘সখী কুঞ্জ সাজাও গো’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু’, ‘আমি ফুল বন্ধু ফুলের ভ্রমরা’, ‘আমি কুলহারা কলঙ্কিনী’,‘বসন্ত বাতাসে সইগো, বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ, আমার বাড়ি আসে সই গো, বসন্ত বাতাসে’- বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের এমন শত সহস্র গানগুলো দিনে দিনে বাংলার সংস্কৃতিক পরিচিতির এক অবিছেদ্দ্য সুরের পারম্পরার পরিচায়য়ক হয়ে উঠছে । এসব গান আজ লোকসমাজে সমান ভাবে জনপ্রিয়। তিনি তার জীবদ্দশায় ও মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় ভাবে বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন যার মধ্যে একুশে পদক অন্যতম। ২০০৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম মৃত্যু বরণ করেন। তবে এখনও তিনি বেঁচে আছেন তার সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে কোটে মানুষের হৃদয়ে।
দারিদ্রতার সংগ্রামী জীবনের বড় হওয়ার মাঝেই বাউল শাহ আবদুল করিমের সঙ্গীত সাধনার শুরু হয়েছিলো ছেলেবেলা থেকেই। তিনি বাউলগানের দীক্ষা লাভ করেছেন সাধক রশীদ উদ্দীন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে। শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন। উপহার দিয়েছেন অনেক মনে রাখার মতো শত শত গান।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে মরমি এই গীতি-কবি কে ভিন্ন ভাবে স্মরন করেন দেশের দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্টানগুলোও।
তার জন্ম বার্ষিকীর স্বরণে শব্দসিড়ি সাহিত্য ও সংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্টাতা সভাপতি কবি ও লেখক ইমামুল ইসলাম রানা বললেন, ‘ শাহ আব্দুল করিম ছিলেন একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, বৃহত্তর সিলেট তথা বাংলাদেশের সংস্কৃতির এক অনন্য সম্পদ। আমরা মরমি এই কবি কে শ্রদ্ধা জানাতেই তার জন্ম বার্ষিকী ও মৃত্যু বার্ষিকি উপলক্ষে তার জীবন এবং কর্ম আলোচনা নিয়ে বিভিন্ন আয়োজনের প্রচেষ্টা করে থাকি। আমরা বাউল গানের এই সাধক কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।’
সিলেটের সাহিত্য সংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত গন্য তরুন কবি মেকদাদ মেঘ বলেন, আব্দুল করিম এখনো সিলেট সহ সারা বাংলার সংস্কৃতিতে নতুন ও জীবন্ত এক কিংবদন্তী। সেই কবেই যেন উনি আজকের সমাজের চিত্র এঁকে গণমানুষের অধিকার আদায়ের জন্য কত কথা বলে গেছেন।
লোকউৎসবের ব্যাপারে দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব সরকার বলেন, যতদূর জানি নির্বাচনের কারনে হয়নি, তবে উনার মতো একজন মহাজনের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে লোকউৎসব অবশ্যই হওয়া উচিত। কবে হতে পারে এ বিষয়ে জানতে চাইলে উনি বলেন, আজ আব্দুল করীম পুত্রের সাথে কথা হয়েছে। দেখা যাক সামনে কি হয়।