নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৯ জুন, ২০২৬
রাজধানী ঢাকার দর্শকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে নাট্যায়ন সিলেটের প্রযোজনা ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত “নতুন নাটকের উৎসব-২০২৬”-এ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাটকটির সফল মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হয়।
এখলাছ আহমেদ তন্ময়ের রচনা এবং মোস্তাক আহমেদের নির্দেশনায় নির্মিত নাটকটি ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন মঞ্চে প্রদর্শিত নতুন নাটকগুলোর মধ্য থেকে নির্বাচিত আটটি নাটকের অন্যতম হিসেবে উৎসবে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে। সিলেট বিভাগের প্রতিনিধিত্বকারী এ প্রযোজনাটি জাতীয় পর্যায়ে নাট্যায়ন সিলেটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, হতাশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং নতুন করে বেঁচে ওঠার প্রত্যয়কে কেন্দ্র করে নির্মিত ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ নাটকটি দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনাবসান ঘটানো কয়েকজন মানুষের জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক রহস্যময় জগতে নিজেদের সিদ্ধান্ত, অনুশোচনা এবং জীবনের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করার গল্প নাটকটিতে তুলে ধরা হয়েছে। সমকালীন বাস্তবতা, দার্শনিক ভাবনা এবং মানবিক আবেদনসমৃদ্ধ নাটকটির অভিনয়, মঞ্চ-নির্মাণ ও উপস্থাপনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
প্রদর্শনী শেষে মঞ্চে উপস্থিত হয়ে নাটকটির ভূয়সী প্রশংসা করেন দেশের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব, নাট্যকার ও নাট্যনির্দেশক জাহিদ রিপন। তিনি বলেন, “বর্তমান সমাজে আত্মহত্যা একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা। এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে অত্যন্ত সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল এবং শিল্পসম্মতভাবে নাটকে উপস্থাপন করা হয়েছে। নাট্যকার এখলাছ আহমেদ তন্ময়কে বিষয় নির্বাচনের জন্য ধন্যবাদ জানাই। একইসঙ্গে নির্দেশক মোস্তাক আহমেদ আধুনিক নাট্যভাষা ও মঞ্চনির্মাণে যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।”
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক এবং উৎসব পরিচালক দীপক কুমার গোস্বামী বলেন, “নতুন নাটকের উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নতুন চিন্তা ও নতুন নির্মাণকে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা। ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ সেই লক্ষ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। নাটকটি জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।”
প্রদর্শনী শেষে অনুভূতি প্রকাশ করে নাটকের নির্দেশক মোস্তাক আহমেদ বলেন, “জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে সিলেটের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমরা গর্বিত। দর্শকদের আন্তরিক সাড়া, মনোযোগ এবং ভালোবাসা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে। ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ শুধু একটি নাটক নয়, এটি জীবনের পক্ষে দাঁড়ানোর একটি আহ্বান। আমরা বিশ্বাস করি, নাটকটি দর্শকদের ভাবাবে এবং জীবনের প্রতি নতুন করে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করবে। এই অর্জন নাট্যায়ন সিলেটের সকল শিল্পী, কলাকুশলী ও শুভানুধ্যায়ীদের।”
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিবৃন্দ নাট্যায়ন সিলেটের হাতে উৎসবের স্মারক তুলে দেন। এ সময় নাট্যকর্মী, আয়োজক, আমন্ত্রিত অতিথি ও দর্শকদের উপস্থিতিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নাটকটিতে অভিনয় করেছেন মোস্তাক আহমেদ, এখলাছ আহমেদ তন্ময়, রীমা দাস, শিপন আহমদ, রুবেল আহমেদ রাজ, রিংকু মালাকার, এনামুল হক সামি, পারভেজ আহমেদ এবং মো. সাদমান তন্ময় আদিয়ান। তাঁদের সাবলীল অভিনয় নাটকের দার্শনিক ও মানবিক বার্তাগুলো দর্শকদের কাছে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
প্রযোজনাটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন নজরুল ইসলাম মনজুর ও তুহিন খান। মঞ্চ ও পোশাক পরিকল্পনা করেছেন মোস্তাক আহমেদ। আলোক পরিকল্পনায় ছিলেন খোয়াজ রহিম সবুজ, প্রক্ষেপণে বদরুল আলম এবং আবহসঙ্গীত পরিকল্পনা ও প্রয়োগে দায়িত্ব পালন করেছেন রীমা দাস ও উত্তম কাব্য।
সফল এই মঞ্চায়নের মাধ্যমে নাট্যায়ন সিলেট আবারও প্রমাণ করেছে যে, রাজধানীর বাইরেও গড়ে উঠছে শক্তিশালী ও চিন্তাশীল নাট্যচর্চা। ঢাকার দর্শকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা ও প্রশংসা নিয়ে ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ যুক্ত করল সাফল্যের নতুন এক অধ্যায়, যা ভবিষ্যতে নাট্যায়ন সিলেটের নাট্যযাত্রাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।