Sylhet Today 24 PRINT

এমসি কলেজের বিকেল: বন্ধু, আড্ডা, গান

দেবদাস চক্রবর্তী, এমসি কলেজ প্রতিনিধি |  ০৪ ডিসেম্বর, ২০১৫

বাংলাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের টিলাবেষ্টিত অঞ্চল টিলাগড়ে ১২৪ একর ভূমির উপর অবস্থিত মুরারিচাঁদ কলেজের সুবিশাল ক্যাম্পাস। ভৌগলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে সিলেটবাসী তরুণ-বৃদ্ধ সকলের প্রিয় এই ক্যাম্পাসে প্রতিদিন বিকালে প্রায় সব বয়সের মানুষই আসেন কিছুটা সময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটাতে।

পরিবার, বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রিয় মানুষদের সাথে নিয়ে আড্ডা দিতে আসা মানুষের ভিড় জমে এখানে প্রতিদিন।

এই কলেজের বর্তমান ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী ছাড়াও স্থানীয় লোকজন এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অনেকেই এখানে আসেন সময় কাটাতে। তেমনি কয়েকজনের সাথে বিকেলে কথা হয় কলেজের ক্যাম্পাসে।

লিডিং ইউনিভার্সিটি বিবিএ শেষ বর্ষের ছাত্র রাহুল ভট্টাচার্য বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন ক্যাম্পাসের ভেতরের পুকুরের পূর্ব দিকটাতে। এই ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, “প্রায় পাঁচ বছর ধরে সিলেটে আছি। আমি এমসি কলেজের ছাত্র নই। কিন্তু এম.সি. কলেজকে সব সময় নিজের ক্যাম্পাস বলেই মনে হয়েছে। এই কলেজের খেলার মাঠ, পুকুরপাড় ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক এতোটাই গভীর যে সপ্তাহে অন্তত একবার এখান থেকে ঘুরে না গেলে কেমন যেনো শূণ্যতাবোধ করি।”

এই দলেরই একজন, এলএলবি শেষবর্ষের ছাত্র সৌমিত্র দে যোগ করেন, “বিকেলের মিষ্টি রোদে এমসি কলেজের অপূর্ব এই ক্যাম্পাস সম্ভবত সিলেটের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। বন্ধুদের সাথে প্রাণ খুলে কিছুক্ষণ আড্ডা দিতে এর বিকল্প কোন স্থান আছে কিনা জানা নেই।”

পুকুর থেকে কিছুটা দূরে ক্যান্টিনের বারান্দায় গীটার হাতে গান গাইতে দেখা যায় একদল তরুণকে। কাছে গিয়ে জানা যায় তারা সবাই এই কলেজেরই বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী।

গণিত তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রুহুল আজিজ বলেন, “সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হয়তো অনেকেই এমসি কলেজ সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু আমাদের ক্যাম্পাসের অপরূপ সৌন্দর্যের প্রেমে পড়বেন না এমন কাউকে এই সিলেটে পাওয়া যাবে না।

তার সাথে হাসতে হাসতে পদার্থবিদ্যার ছাত্র নোবেল তালুকদার যোগ করেন, “আমরা তো সেই ১ম বর্ষ থেকেই পড়ে আছি। বিকেলের আড্ডা মানেই এম.সি. কলেজের ক্যাম্পাস।”

কলেজ ক্যাম্পাসে ১টি ছোটখাট বোটানিক্যাল গার্ডেন রয়েছে। এই বোটানিক্যাল গার্ডেনটি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ রক্ষনাবেক্ষন করে থাকে। এটি সমগ্র সিলেটের একমাত্র বোটানিক্যাল গার্ডেন। এই বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশেই স্থানীয় গৃহিনী আছমা আক্তার তার ৭ বছরের ছেলে সোহান এবং স্বামী ফয়জুর রহমানের সাথে হাটছিলেন।

তাদের সাথে কথা বললে ফয়জুর রহমান জানান, তিনি পেশায় একজন ব্যাংকার। সপ্তাহের অন্যান্য দিনে ব্যস্ত থাকায় সাধারণত শুক্রবারে তিনি পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে আসেন।

তিনি বলেন, “সিলেট শহরে পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার মত স্থান খুব কম। তবে প্রকৃতির কিছুটা নিকটে আসতে এবং তার সন্তানকে বিকেলের মুক্ত বাতাসে কিছুটা সময় দিতে তিনি এমসি কলেজের ক্যাম্পাসে নিয়মিত আসেন।”

কলেজের শহীদ মিনার প্রাঙ্গন, গনিত বিভাগের সিঁড়ি, অধ্যক্ষের কার্যালয়ের সিঁড়ি, নতুন একাডেমিক ভবন, পুকুর পাড়সহ প্রায় সব জায়গাতেই বিভিন্ন বয়েসি, শ্রেণি ও পেশার মানুষকে নিজেদের মত করে আড্ডা দিতে দেখা যায়। কেউ শহুরে জীবনের ব্যস্ততা কাটাতে, কেউবা বন্ধুদের নিয়ে একটু খোশগল্প করতে চলে এসেছেন প্রিয় ক্যাম্পাসে।

বিকেলের এমসি কলেজের ক্যাম্পাসকে ঘিরে অনেক শ্রমজীবি মানুষের কর্মচাঞ্চল্যও চোখে পড়ার মত। কেউ বাদাম বিক্রি করছেন, আবার কেউ ঝালমুড়ি-চানাচুর অথবা হরেক পদের আচার নিয়ে বসে আছেন।

তেমনি একজন বাদাম বিক্রেতা আনিসের সাথে কথা হয়। বয়স ১১ কি ১২ হবে হয়তো। সে একটি প্রাইমারি স্কুলে ৫ম শ্রেণিতে পড়ে। এ সময়ে বাদাম বিক্রি কেমন হয় জানতে চাইলে সে জানায়, এ সময় অনেক মানুষ কলেজের ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসে। তাই স্কুল শেষ করে সে বাদাম বিক্রি করতে চলে আসে এখানে। তার বাবা একজন দিনমজুর। পরিবার চালাতে বাবাকে সাহায্য করতেই সে দুই বছর ধরে এই কাজ করে বলে জানায়।

ছাত্রদের হোস্টেলের উল্টোপাশে রয়েছে কলেজের নিজস্ব খেলার মাঠ। যেখানে সিলেটের প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা নিয়মিত খেলাধুলা করে। আর তাই সাধারণ মানুষের নিয়মিত উপস্থিতিতে মুখর থাকে হোস্টেল আঙ্গিনা কিংবা খেলার মাঠ অথবা মূল ক্যাম্পাস।

টিলাবেষ্টিত প্রাকৃতি আর মনোরম নিরিবিলি পরিবেশের কারণে এমসি কলেজের ক্যাম্পাস সিলেটের সাধারণ মানুষের প্রাণের আঙ্গিনায় পরিণত হয়েছে। বিকেলের সোনাঝরা রোদ থেকে শুরু করে সন্ধ্যের শিশিরভেজা ঘাস, সময়টা সাধারণ মানুষের মিলনমেলায় পরিনত হয় এম সি কলেজের ক্যাম্পাস; বন্ধুত্বে এবং আড্ডায়।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.