হাসান নাঈম, শাবিপ্রবি | ৩১ আগস্ট, ২০২৪
স্বজনপ্রীতিমুক্ত, যোগ্য, সৎ, নির্দলীয়, একাডেমিশিয়ান ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রশাসক চায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, হল প্রভোস্টসহ বিভিন্ন দপ্তর ও ইনস্টিটিউট পরিচালকের পদত্যাগে অচল হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তাই দ্রুত প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে অচল অবস্থা কাটিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে জোর দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এতে আগামীর ক্যাম্পাস ও কেমন প্রশাসক চায়? তা জানতে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে সিলেটটুডে
এসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইফরাতুল হাসান রাহীম বলেন, ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে সৎ, যোগ্য, শিক্ষার্থী ও গবেষণাবান্ধব এবং অরাজনৈতিক ব্যাক্তিদের দেখতে চাই। যেই সরকারই থাকুক না কেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাজনীতির গ্যাড়াকল মুক্ত থাকুক, যেনো তারা পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের উপর নির্ভর করে উপযুক্ত শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে কাজ করতে পারে।
বিগত সময়ে শিক্ষাঙ্গনে অপরাজনীতির শিকার হয়ে বহু মেধার অপচয় হয়েছে। তাই সকল ধরনের ছাত্র এবং শিক্ষক রাজনীতিমুক্ত এমন একটি ক্যাম্পাস চাই। তবে বিগত দিনে দূর্নীতি বা স্বজনপ্রীতিতে যুক্ত এমন কোন ব্যক্তিকে প্রশাসনিক পদে আমরা দেখতে চাই না। তাই দলমত নির্বিশেষে যোগ্য ও বিতর্কমুক্ত ব্যক্তিদের প্রশাসনিক পদ গুলোতে দেখতে চাই।
আগামীর ক্যাম্পাস নিয়ে তিনি বলেন, আবাসন সংকটের সমাধান করে শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদার ভিত্তিতে কম খরচে স্বাস্থ্যকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি, রিডিং রুম, লাইব্রেরি সুবিধা, পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে মেধাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন দিতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক ক্ষ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও পড়ার আগ্রহ পাবে। সর্বোপরি, এমন একটি ক্যাম্পাস আমরা চাই, যেটি হবে শিক্ষার অভয়ারণ্য, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসক নিয়োগ নিয়ে গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আফসানা ইসলাম শিফা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসককে অবশ্যই সৎ, শিক্ষার্থীবান্ধব, নারীবান্ধব হওয়া উচিত। ভিসি হবেন অত্যন্ত উঁচু মানের গবেষক, উঁচু মানসিকতা সম্পন্ন, সকলের শ্রদ্ধাভাজন রাজনৈতিক নিরপেক্ষ প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পন্ন একাডেমিক ব্যাক্তিত্ব। তবে দুর্নীতিগ্রস্থ, স্বজনপ্রীতি কিংবা লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত এমন কেউ প্রশাসক হিসেবে না আসাই শ্রেয়।
ক্যাম্পাস নিয়ে তিনি বলেন, আমরা লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস চাই। যে ক্যাম্পাস মুখরিত হবে গবেষণা চর্চায়, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায়। এখানে কেউ কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানবে না, স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা করবে। এছাড়া ফাইনাল পরীক্ষার খাতায় নাম, রোলের পরিবর্তে কোড ব্যবহার করে পরীক্ষা নেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন স্কলারশিপ সেন্টার, ক্যারিয়ার সেন্টার চালু, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সহায়তায় গবেষণা টিম, আবাসিক হলে ছাত্রদের সীটের সুষম বন্টন, জলাবদ্ধতা নিরসন করা সময়ের দাবি। এছাড়া রাজনীতির কারণে ছাত্র সংগঠনগুলো উপাচার্য ও অন্যান্য প্রশাসনিক পদ নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। তাই সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত এমন কেউ আসলেও উনার একাডেমিক প্রোফাইল, প্রশাসনিক দক্ষতা, নিরপেক্ষ ভূমিকাকে প্রাধান্য দিতে হবে।
রসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী বদরুল আমিন ইমন বলেন, গনঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে আমরা এমন মানুষদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পদগুলোতে চাই যাঁরা বিগত সময়ের অরাজকতা, অস্থিরতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সকল ধরনের রাজনীতিমুক্ত, গবেষণা নির্ভর, স্থিতিশীল ক্যাম্পাস বিনির্মান করে গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবেন। সেক্ষেত্রে অরাজনৈতিক, একাডেমিক ও ক্লিন ইমেজসম্পন্ন ব্যাক্তিত্বরাই পারেন দূর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ব্যাতিরেখে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয় উপহার দিতে।
নতুন প্রশাসনের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা থাকবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি নিয়োগ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও টেন্ডার যেনো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে হয়। গবেষণার সুযোগ ও অনুদান বৃদ্ধি করা, লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিকল্প হিসেবে ছাত্রসংসদ (শাকসু) চালু করা, শিক্ষার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসনের ব্যাবস্থা করা, পরিবহন খাতে বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক কাজগুলোতে গতিশীলতা আনা। সর্বোপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যাবস্থা জোরদার করা।
ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী তাহসিনা ত্বাক্কীয়া বলেন, প্রথমেই চাইবো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ। সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়িত এমন কাউকে প্রশাসক হিসেবে চাইনা। মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে, তবে সেটা ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে অবাঞ্চনীয়। পাশপাশি আমাদেওর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার এমনভাবে সাজানো প্রয়োজন যেনো তৃতীয়বর্ষ থেকেই একজন শিক্ষার্থী গবেষনার সাথে যুক্ত হতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য পার্ট টাইম কাজের সুযোগ, ক্যাম্পাসকে মুক্তজ্ঞান চর্চার পরিবেশ, বাস্তবধর্মী পড়াশোনা, সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় অনুকরণীয় হয় এমন ব্যবস্থা করতে হবে। পরিশেষে সকল ধরণের বৈষম্যহীন এমন নিরাপদ একটি ক্যাম্পাস চাই।
সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী হানিফ হাসান নিশান বলেন, শাবিপ্রবিকে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাতারে নিতে কাজ করবে এমন ভিসি দরকার। ক্যাম্পাসে আর কোনো বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতিগ্রস্থ, বোমারু এমন প্রশাসক চাইনা। এমন কেউ প্রশাসনে আসলে শিক্ষার্থীরা মেনে নিবে না। পাশাপাশি আমাদের ক্লাসরুমগুলোতে উন্নতমানের ল্যাব সুবিধা, পর্যাপ্ত ইকুইপমেন্ট থাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজগুলো ডিজিটালাইজেশন করা, লাইব্রেরীতে যথেষ্ট পরিমাণে বই রাখা, হলের খাবারের মান উন্নত ও দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখা, খেলার মাঠ সংস্কার প্রয়োজন। এছাড়া প্রতি এক বছর পরপর শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও কর্মচারীদের ডোপ টেস্ট করে মাদকমুক্ত ক্যাম্পাস করা।
প্রসঙ্গত, গত ৭ আগস্ট শাবিপ্রবির উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষসহ প্রশাসনিক বডির সকলকে পদত্যাগ করতে ২৪ ঘন্টা আল্টিমেটাম দেয় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। এরপর উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার, প্রধান প্রকৌশলী, প্রক্টর, ছয় হলের প্রভোস্ট, বিভিন্ন ইনস্টিটিউট ও দপ্তর পরিচালক, ভিসির পিএস, এপিএসসহ ৪০ জনের অধিক পদত্যাগ করেছেন বলে জানা গেছে। এতে একে একে সবাই পদত্যাগ করায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অচল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাই এ অচল অবস্থা কাটিয়ে উঠতে দ্রুত প্রশাসক নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।