নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৪ মে, ২০২৫
গত বছরের ৭ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য ফেসবুকে একজনের পোস্ট শেয়ার করে লিখেছিলেন, “সন্ত্রাসমুক্ত আমার ক্যাম্পাস”। সেই স্ট্যাটাসের ৯ মাসের মাথায় সেই ক্যাম্পাসের পাশেই সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারালেন তিনি।
শাহরিয়ার আলম সাম্য ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন ও স্যার এ এফ রহমান হলের ২২২ নম্বর কক্ষে থাকতেন। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায়।
তিনি হল ছাত্রদলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, এবং আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী জুলাই-আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে রক্তাক্ত অবস্থায় বন্ধুরা সাম্যকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঢাকা মেডিকেল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. ফারুক বলেন, রাতে বন্ধুরা তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে। এরপর চিকিৎসক পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। তার ডান পায়ে ধারাল অস্ত্রের আঘাত রয়েছে।
সহপাঠী আশরাফুল ইসলাম রাফি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, রাতে মোটরসাইকেল চালিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুক্তমঞ্চের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন সাম্য। এসময় অন্য একটি মোটরসাইকেলের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের ধাক্কা লাগলে উভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটি এবং ধস্তাধস্তি হয়। এক পর্যায়ে সাম্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ডান পায়ের উরুতে আঘাত করে পালিয়ে যায় ওই মোটরসাইকেলের আরোহী। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এলে তার মৃত্যু হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্যার এ এফ রহমানের হলের প্রাধ্যক্ষ সহযোগী অধ্যাপক মাহফুজুল হক সুপণ বলেন, ছুরির আঘাতে রক্তাক্ত করা হয়েছে তাকে। এতে তার মৃত্যু ঘটেছে।
এদিকে, ছাত্রদল নেতা সাম্যের হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল।
তার স্মৃতি রোমন্থন করে এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী সাবেক ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ এরশাদ খান সাম্য হত্যার বিচার চেয়ে ফেসবুকে লেখেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র, ছাত্রদল নেতা সাম্যকে একটু আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করেছে একদল সন্ত্রাসী। সাম্যকে আমি চিনি, যখন সে প্রাইমারি স্কুলে পড়ে, তখন থেকে। সাম্যর পরিবারের সবাই আমার কাছের। অন্তত ১৫ বছর ধরে, আমরা পাশাপাশি মিরপুরে থাকি। সাম্যের মত একটা নিরীহ, ভদ্র এবং মেধাবী ছেলে ঢাকায় খুব কমই আছে। আমি সাম্যের খুনিচক্রকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।’
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির পদত্যাগ দাবি করে লেখেন, ‘যে ভিসি ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তার পদে থাকার কোন অধিকার নাই।’
সাদিকুর রহমান খান নামের একজন ফেসবুকে লেখেন, ‘সাম্য শহীদ হয়ে গেছেন। বাট এই খুনের জন্য যারা যারা দায়ী সবাইকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় না করানো পর্যন্ত আমরা যেন ঘরে না ফিরি।’
সুরাইয়া আলম ইভা নামের একজন ফেসবুকে লেখেন, ‘শাহরিয়ার আলম সাম্য আজকে সন্ধ্যায়ই আইইআর-এর নবীনবরণে গেলাম, আর তুই মাথায় টোকা দিয়ে তোর চিরচেনা “কীরে মামা, কি অবস্থা” বলে চলে গেলি! আমি তো জানতাম না, এটাই তোর সাথে শেষ দেখা বন্ধু। এই ক্যাম্পাস এতোই অনিরাপদ হয়ে যাচ্ছে যেখানে আগে ভাবতাম ফোনটা কেউ হাত থেকে টান দিয়ে নিয়ে যাবে, ভবঘুরে টোকাই পাগল উন্মাদগুলো আমাকে আক্রমণ করবে। কিন্তু আজ আমাদেরই ক্যাম্পাসে, আমাদেরই বন্ধুকে সন্ত্রাসীর হামলায় “লাশ” হয়ে ফিরে যেতে হবে, এতদূর কল্পনাও করিনি! কেন একটা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এতো অনিরাপদ হবে? এর জবাব কে দেবে? আমার বন্ধুর জীবন কে ফেরত দেবে?’
আমিনুল ইসলাম ফুয়াদ নামের একজন ফেসবুকে লেখেন, ‘বাহ নিরাপদ ক্যাম্পাস বাহ! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পার্ক প্রশাসনের এবার বহিরাগতমুক্ত ক্যাম্পাস নিয়ে সিরিয়াস পদক্ষেপ নেওয়া ফরজ হয়ে গেছে। ক্যাম্পাসের মধ্যে একটা ছেলে খুন; নিরাপদ থাকবে কই আর! বহিরাগতমুক্ত ক্যাম্পাস নিয়ে নানাসময় নানা পদক্ষেপ নিলেও কোনো কাজে আসে নাই। এই ফল হচ্ছে বহিরাগতদের হাতে একজনের মৃত্যু, তাও ক্যাম্পাসের রানিং স্টুডেন্ট।’
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আজম খান ফেসবুকে লেখেন, ‘ঢাবিতে ছাত্রলীগ থাকা অবস্থায় ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ এর জুলাই পর্যন্ত একজন ছাত্রও খুন হয় নাই। আজ দীর্ঘ ১৫ বছর পরে ঢাবি ক্যাম্পাসে খুনের রাজনীতি আবার ফিরে আসলো। সাম্য নামের একজন ছাত্রকে ছুরিকাঘাত করে খুন করা হয়েছে। এরআগে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফজলুল হক হলে তোফাজ্জল নামে এক মানসিক প্রতিবন্ধী ভবঘুরেকে ভাত খাইয়ে তারপরে পিটিয়ে খুন করা হয়। তবে ছাত্র হত্যা এই প্রথম।
সাম্যের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে শাহবাগ থানার ওসি খালিদ মনসুর বলেন, ‘এক ছাত্র খুন হয়েছেন। পুলিশ বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’