Sylhet Today 24 PRINT

আল-হাদিসের শিক্ষক সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ‘১২ বছরে’ করেন দাখিল পাস

বিশ্ববিদ্যালয় আইন বলছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে

বাপ্পা মৈত্র |  ২৩ আগস্ট, ২০২৬

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে যোগ দেওয়া কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন মাত্র ১২ বছর বয়সে দাখিল পাস করেছেন। তিনি মাদ্রাসা বোর্ড ঢাকার অধীনে বোয়াইলমারী কামিল মাদ্রাসা পাবনা থেকে ১৯৭৫ সালে ২য় বিভাগে দাখিল পাস করেছেন। জাতীয় পরিচয় পত্রে অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন জন্ম ১৯৬৩ সালের এক মার্চ।

এছাড়াও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৫ সালে বি.এ অনার্স আরবি এবং একই বছরে মাদ্রাসা বোর্ড হতে মাদ্রাসা-ই-আলিয়া থেকে কামিল (স্নাতকোত্তর) শ্রেণিতে তাফসির বিষয়ে ২য় বিভাগ পেয়ে পাস করেছেন।

মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি কিভাবে দাখিল পাস করলেন- সেটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভিসি প্রার্থীর তালিকায় থাকা একজন শিক্ষক। তবে তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। একজন রেগুলার ছাত্র একই বছরে কিভাবে দুটি ডিগ্রি নিয়েছেন ও উপাচার্য নিয়োগর পাওয়ার জন্য যে গবেষণা থাকা দরকার সেটি উনার নেই বলে জানান ওই শিক্ষক।

এসব বিষয়ে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন বলেন, ‘‘তখনকার সময় মাদ্রাসা বোর্ডে ১২ বছরে দাখিল পরীক্ষা দেওয়া যেত, আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন। আমি ১২ বছরে দাখিল পাস করেছি। তখনকার সময় মাদ্রাসা শিক্ষা এখনকার মত ছিল না।’’

একই বছরে দুটি পরীক্ষায় পাসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আনার্স আর তাফসির দুটির সাল এক। আমি আনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছি ৮৯ সালে আর রেজাল্ট হয়েছে ৯০ সালে। কামিল তাফসির বিষয়ে পাস করেছি ৮৫ সালে। দুটি পরীক্ষার ভর্তির সময়টা এক। আমার সার্টিফিকেটগুলো দেখলে বুঝতে পারবেন।’’

অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন বলেন, ‘‘আগে মাদ্রাসা বোর্ডে দাখিল, আলিম ও ফাজিল পাস করার পর এসএসসির সমমান ধরা হত। বর্তমানে দাখিলকে এসএসসির সমান, আলিম এইচএসসি ও ফাজিল স্নাতক ডিগ্রির সমমান ধরা হয়। তখনকার সময় মাদ্রাসা বোর্ডে এখনকার মত ছিল না।’’

সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ প্রফেসর মুহাম্মদ মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘‘মাদ্রাসা বোর্ড গঠনের পর দাখিলকে এসএসসির সমমান দেওয়া হয়েছে। বোর্ড গঠনের আগে দাখিলকে অষ্টম শ্রেণি ধরা হত।’’

সদ্য ভিসি নিয়োগ পাওয়া এক ভিসি দাবি করেছেন আগে দাখিল-ফাজিল-আলিম সমান এসএসসি ধরা হতো এই বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুল জলিল বলেন, ‘‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে আছে একজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ভিসি হবেন। কিন্তু যিনি ভিসি হয়েছেন উনি ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক। সুনামগঞ্জ হাওর অধ্যুষিত এলাকা, উনি হাওরের কৃষ্টি-কালচারের বিষয়টি বুঝবেন না।’’

সুনামগঞ্জের অনেক যোগ্য মানুষ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘‘সরকারের উচিত সুনামগঞ্জের একজন যোগ্য মানুষকে ভিসি নিয়োগ দেওয়া। এতে তিনি সুনামগঞ্জের লিডারশিপ ও স্থানীয়দের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে পারবেন। দেখেন বিশ্ববিদ্যালয়টি বয়স ৬ বছর হলেও এখনও জায়গা নির্ধারণের বিষয়টি সমাধান হয়নি। সুনামগঞ্জের একজন ভিসি হলে এটি দ্রুত সমাধান হয়ে যেত।’’

সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য ও জেলা সদরে বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব মনোজ্জির আলী সুজন বলেন, ‘‘উনি ১২ বছর বয়সে একজন মানুষ দাখিল পাস করেছেন এটা তো অবিশ্বাস্য। ভিসি নিয়োগে আমাদের দাবি ছিল সুনামগঞ্জের যোগ্য একজন মানুষকে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার। আমাদের অনেক যোগ্য মানুষ রয়েছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়টা নতুন, তাই এটাতে সুনামগঞ্জের একজন মানুষ নিয়োগ হলে সবকিছু বুঝতেন।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘দেখেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি ছিলেন অধ্যাপক ড. ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী। তিনি সিলেটের মানুষ হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে একটা ভালো অবস্থানে নিয়ে যান প্রথম দিকেই। উনি তো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষক না, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে আছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির শিক্ষককে ভিসি নিয়োগ দেওয়ার। তারপরও যেহেতে উনার নিয়োগ হয়েছে, আমরা আশা করছি, উনি সবাইকে নিয়ে কাজ করবেন। সুনামগঞ্জের মানুষের বিষয়টি বুঝবেন।’’

এদিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য বিষয়ের অধ্যাপককে উপাচার্য পদে বসিয়েছে সরকার; যা আইনের ‘সাংঘর্ষিক’। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উপাচার্য পদে ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের শিক্ষাবিদকে’ দায়িত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও তা মানা হয়নি। একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে বসানো হয়েছে আল-হাদিস বিষয়ের একজন অধ্যাপককে।

‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২০’ এ উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি আছে ১০ নম্বর ধারা। এই ধারার উপধারা-২ এ বলা হয়েছে, “আচার্য (রাষ্ট্রপতি), তৎকর্তৃক নির্ধারিত শর্তে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে স্বনামধন্য একজন শিক্ষাবিদকে চার বছরের জন্য উপাচার্য পদে নিয়োগ দেবেন। তবে কোনো ব্যক্তি একাদিক্রমে বা অন্য কোনোভাবে দুই মেয়াদের বেশি উপাচার্য পদে যোগ্য হবেন না।”

একই ধারার উপধারা-২ এ বলা হয়েছে, “উপধারা ১-এ যা কিছুই থাকুক, আচার্যের সন্তোষ অনুযায়ী উপাচার্য স্বপদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।”

এ বিষয়ে অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন বলেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয় আইনে উপাচার্য নিয়োগের বিষয়ে যাই থাকুক না কেন, চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি যাকে উপাচার্য পদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হবেন, তিনিই এ দায়িত্ব পাবেন।”

সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি তুলে ধরা হলে জাকির হুসাইন বলেন, “আমি তো নিজেই উপাচার্য হইনি। যারা আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করুন। যারা আমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন, তারা আইন ও বিধিবিধান পর্যালোচনা করেই দিয়েছেন বলে আমি মনে করি।”

সার্চ কমিটির সদস্য ছিলেন ইউজিসির সাবেক সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ অধ্যাপক গত ২৩ এপ্রিল ইউজিসির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। অন্য বিভাগের অধ্যাপককে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে বসানোর বিষয়টি ‘আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তিনি। তিনি বলেন, “এটি হাস্যকর। এ থেকে বোঝা যায়, যারা বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য পদের দায়িত্ব তাকে দিয়েছেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন সম্পর্কে অবগত নন।

“একটি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য পদের দায়িত্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের একজন শিক্ষাবিদেরই পাওয়া উচিত। যতদূর জানি আইনেও সেরকমটা আছে। কারণ ওই প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে নেতৃত্ব দিতে সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যে ধরনের গবেষণা, প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতা প্রয়োজন, তা অন্যদের থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক।”

তিনি বলেন, “এ থেকে আরও বোঝা যায়, বর্তমান সরকার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা ফেরানোর যে কথা মুখে বলছে, বাস্তবে সে পথ থেকে উল্টো দিকেই হাঁটছে। সরকার যদি তার কথায় থাকত, তাহলে এমন ঘটনা আমরা দেখতাম না।”

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.