রাজীব চৌধুরী | ০১ জানুয়ারী, ২০২৬
‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ, এই দেশের মাটিই আমার সবকিছু।’ - এই একটি বাক্যের মধ্যেই খালেদা জিয়ার জীবনের দর্শন, রাজনীতি এবং দেশপ্রেমের গভীরতা ধরা পড়ে। আজ তাঁর প্রয়াণের পর জাতি ফিরে তাকাচ্ছে এক দীর্ঘ, গৌরবময় ও সংগ্রামী জীবনের দিকে—যে জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে।
খালেদা জিয়া ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি রাজনীতিকে বেছে নেননি; বরং রাজনীতিই তাঁকে বেছে নিয়েছিল। ব্যক্তিগত শোক থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, নীরবতা থেকে নেতৃত্ব—তাঁর জীবন এক অসাধারণ রূপান্তরের গল্প।
নীরব জীবন থেকে জাতীয় দায়িত্ব :
রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় খালেদা জিয়া ছিলেন আড়ালের মানুষ। সংসার, সন্তান ও পারিবারিক জীবনেই ছিল তাঁর জগৎ। রাজনীতির কোলাহল থেকে দূরে, পরিমিত ও সংযত জীবনযাপনেই অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে ইতিহাস নির্মমভাবে তাঁকে সামনে এনে দাঁড় করায়।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ যেমন নেতৃত্ব সংকটে পড়ে, তেমনি বিএনপিও পড়ে গভীর অনিশ্চয়তায়। সেই শূন্য সময়ে খালেদা জিয়া হয়ে ওঠেন আশার প্রতীক। তিনি তখনো প্রস্তুত ছিলেন না, তবু ইতিহাসের দায় এড়িয়ে যাননি।
দায়িত্ববোধ থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ:
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল দায়িত্ববোধের ফল। স্বামীর মৃত্যুর গভীর বেদনা, পরিবারের অনাগ্রহ—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি বিএনপিকে ভেঙে পড়তে দেননি। ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন—নেতৃত্ব মানে ক্ষমতার মোহ নয়, দায়িত্ব গ্রহণ।
ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন দলের ভরসাস্থল। ভাইস-চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হয়ে ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়টি ছিল সামরিক শাসনের কঠিন সময়, যখন সাহস ছাড়া রাজনীতিতে টিকে থাকা অসম্ভব ছিল।
আপসহীনতার রাজনীতি :
স্বৈরশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়া ছিলেন দৃঢ়, অবিচল ও সাহসী। গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক চাপ—কোনো কিছুই তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট ও দৃঢ়।
এই সময়েই তিনি পরিচিত হন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে—যা ছিল জনগণের দেওয়া একটি সম্মানসূচক পরিচয়। এটি কোনো স্লোগান নয়, বরং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত এক মর্যাদা।
ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী :
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এটি ছিল শুধু রাজনৈতিক অর্জন নয়, বরং সামাজিক অগ্রগতির এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
একজন নারী রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে—এটি লক্ষ লক্ষ নারীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও দু’বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতা ও স্থিতিশীলতা আসে।
ক্ষমতার বাইরে থেকেও নেতৃত্ব :
ক্ষমতায় না থেকেও খালেদা জিয়া কখনো রাজনীতির বাইরে ছিলেন না। বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে তিনি সংসদ ও রাজপথে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ২০০৮ সালের পর তাঁর জীবন প্রবেশ করে এক কঠিন অধ্যায়ে।
দীর্ঘ কারাবাস, শারীরিক অসুস্থতা ও নানা বিধিনিষেধ সত্ত্বেও তিনি মনোবল হারাননি। নীরব থেকেও তিনি ছিলেন লক্ষ মানুষের প্রেরণা। তাঁর ধৈর্য, সহনশীলতা ও দৃঢ়তা অনেকের কাছে অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
একজন মা, একজন নেতা, একজন প্রতিষ্ঠান:
খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন মা, যাঁর পরিবার ব্যক্তিগতভাবে গভীর ক্ষতির মধ্য দিয়ে গেছে। আবার তিনি ছিলেন একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতীক—যাঁর নামেই একটি দল, একটি আদর্শ, একটি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে।
তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার চেতনা—এই তিন স্তম্ভে দাঁড়িয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন।
বিদায়ের পর :
খালেদা জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশ হারাল এক সাহসী নারী, এক দৃঢ় নেতৃত্ব এবং এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়। তাঁকে নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
তিনি ইতিহাসে থাকবেন—প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদাতা হিসেবে, এবং সংকটের সময়ে দায়িত্ব নেওয়া এক সাহসী নারীর প্রতীক হিসেবে।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর জীবন ও সংগ্রাম থেকে যাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে—প্রেরণা হয়ে, আলো হয়ে।