Sylhet Today 24 PRINT

তবু দেখা হোক বন্ধু লাইব্রেরিতে...

প্রণবকান্তি দেব |  ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

আজ গ্রন্থাগার দিবসে বলি, এই বঙ্গ জনপদের সবচেয়ে দু:খী শব্দটির নাম হচ্ছে পাঠাগার। যার কোন বন্ধু-বান্ধব নেই। সে এখন বড় একা। সে এখন বড় বিষন্ন। সে আজ বড় ভয় জড়োসড়ো। ভাঙনের ভয়ে সে আজ বড় চুপচাপ। তার কাছে যাওয়ার মতো কোথাও খুব একটা কেউ নেই। সে বড় নিরুপায়!

পাঠাগার-এ দেশের প্রেক্ষাপটে বড় রুগ্ন একটি নাম এখন। কেউ নেই তার শুশ্রূষায়। না সরকারী, না বেসরকারি। কেউ নেই তার গায়ে হাত বুলানোর। কেউ নেই তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলার-'ভালো হয়ে যাবে'। কেউ নেই তাকে বলার 'আমি আছি'। তার আসলে কেউই নেই!

পাঠাগার-গত দশক থেকেই একটু একটু করে তার আড় ভেঙেছে। প্রযুক্তির ঝাঁকুনিতে মধ্যবিত্ত বাঙালীর বোধ, স্বপ্ন এবং মন ভেঙে খান খান। বিশ্বায়নের আভাসে জীবনচর্চায় এসেছে দিন রাতের ব্যবধান। সব পুরনোকে ঝেটে বিদায় করাই যেন হয়ে উঠেছে আধুনিকতার সংজ্ঞা। পুরনো বাড়ীটা ভাঙ্গো, পুরনো গাছটা কাটো, পুরনো পুকুরটায় দালান বানাও- এ-ই যেন হয়ে উঠল নতুনের পরিচয়। স্মৃতি হয়ে গেল 'মেমোরি', দাদু, ঠাকুমার কাছে কোন গল্প নেই, সব আছে 'র‍্যামে'। ইন্টারনেট এখন বাঙালীর 'প্রাণভোমরা'। ফেইসবুক বিনে বাঙালীর কোন গতি যেন নেই আর। হাতের মুঠোয় পৃথিবী অথচ হৃদয়ে প্রেম নেই। হিংস্রতা শান দিচ্ছে সবখানে। রুক্ষ হয়ে উঠছে মানুষ। নির্দয়,নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে মন। নির্মমতা, নৃশংসতাই প্রতিদিনের গল্প। দুই হাজার ছাব্বিশের মানুষ বড় অশান্ত, বড় বিক্ষিপ্ত, পোস্ট মর্ডানিজমের ভাষায় Fragmented। এখানে পাঠাগারের মতো নিরুপম আলো বিলানো প্রতিষ্ঠান বড় অসহায়!

রাজনৈতিক, সামাজিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক সব দিক থেকেই এক অস্থির সময় পার করছে বাংলাদেশ। ক্ষোভ,হিংসা, ঘৃণার ছড়াছড়ি সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে। নৈতিকতা, মূল্যবোধ ঠেকেছে তলানিতে গিয়ে। তারুণ্যের মনোজগত গ্রাস করেছে তুমুল অস্থিরতা। অর্থনীতির খোলাবাজার, বেকারত্ব এবং আদর্শহীন রাজনীতি আমাদের তারুণ্যের শক্তি ও সম্ভাবনাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে সেখানে পাঠাগারচর্চার মতো নিটোল,সুকুমার বিষয়গুলো এখন বিপন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীতি ও নন্দনবৃত্তির তুমুল ক্রান্তিকালে মানুষ এখন ছন্নছাড়া। মানুষ এখন অসহিষ্ণু। এই ক্রোধ-উন্মাদ সময়ে এসেছে গ্রন্থাগার দিবস।

বিভিন্ন তথ্যমতে, সারাদেশে ৭১টি সরকারি গ্রন্থাগার আছে রয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে প্রায় এক হাজার ৫৩২টি পাঠাগার। কিন্তু আজ ভালো নেই আমাদের গ্রন্থাগারগুলো। বহুমাত্রিক সংকট সবখানে। স্কুল লাইব্রেরিগুলো ভালো নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি দখলে নিয়েছে ক্যারিয়ার গাইড আর আইএলটিএসের বই। পারিবারিক পাঠাভ্যাস তলানিতে। বাড়ী থেকে 'আউট বই' আউট। পাতা উল্টানোর শব্দ নেই। কাগজের গন্ধ নেই। রেলওয়ে বুক স্টলগুলো উধাও। স্ক্রিনে ব্যস্ত চোখ বইয়ের তাক খোঁজে না আর। বড় উরাধুরা সময়। বইয়ের মানুষ এখন বড় বিচ্ছিন্ন। শর্টকাট সাফল্যের রঙিন নেশায় বইয়ের আলো এখন অনেকটাই ম্রিয়মান।

তবু আশা ছাড়া যায় না। তাই বলি, এই ম্রিয়মান সময়ে কোন কোন বিকেলের দেখাটা হোক বন্ধু কোন লাইব্রেরিতে। অবসরের কোন আড্ডা হোক পাঠচক্রে। বেড়াতে যাওয়ার সময় না হয় ব্যাগে থাকুক 'ছবির দেশে, কবিতার দেশে'। স্কুল ছুটি হলে ছেলেমেয়েকে নিয়ে যান কোন লাইব্রেরিতে। জন্মদিনে না হয় উপহার দিন 'চাঁদের পাহাড়'। প্রেমে, বন্ধুত্বে বই বিনিময় হোক। আপনার পাশে যে পাঠাগারটি আছে তার দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিন। পাঠাগারের আলো নিভে গেলে সমাজ অন্ধকারের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। কেননা বইয়ের গন্ধে সমাজ বড় হলে, সে সমাজ কখনো হিংস্র হতে পারে না।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ইংরেজি বিভাগ, সিলেট ইন্টারনাশনাল ইউনিভার্সিটি।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.