Sylhet Today 24 PRINT

আশা ভোঁসলে : এক অনন্ত সুরের বিদায়গান

মিহিরকান্তি চৌধুরী  |  ১২ এপ্রিল, ২০২৬

আজ যেন আকাশটা একটু বেশি নীরব। বাতাসে ভাসছে এক অদ্ভুত শূন্যতা—যেন অসংখ্য সুরের উৎস হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে। ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে যে নামটি যুগের পর যুগ আলো ছড়িয়েছে, সেই আশা ভোঁসলে আজ আমাদের মাঝে নেই—এই ভাবনাটাই যেন বিশ্বাস করতে মন চায় না। তবুও সময়ের অনিবার্য নিয়মে একদিন সব সুর থেমে যায়, কিন্তু কিছু কণ্ঠ কখনোই মুছে যায় না—তারা থেকে যায় চিরকাল, মানুষের হৃদয়ের গভীরে। মুম্বাইতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ৯২ বছর বয়সে তিনি আজ প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

আশা ভোঁসলে— শুধূ একটি নাম নয়, এক বিস্ময়। এক বহুমাত্রিক সংগীতজীবন, যার প্রতিটি অধ্যায় যেন একেকটি আলাদা গল্প। শিশুকাল থেকেই সংগীতের সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। সুরের জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে, কিন্তু সেই কঠিন পথই তাঁকে গড়ে তুলেছিল এক অদম্য শিল্পীতে। তাঁর কণ্ঠে ছিল বেদনা, আনন্দ, প্রেম, উচ্ছ্বাস—মানুষের প্রতিটি অনুভূতির নিখুঁত প্রতিফলন।

তাঁর কর্মজীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। একদিকে পরিবারিক সংগ্রাম, অন্যদিকে সংগীতজগতে নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই—সবকিছুকে জয় করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। যখন অনেকেই ভেবেছিল তিনি হয়তো ছায়াতেই রয়ে যাবেন, তখনই তিনি নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুললেন। তিনি প্রমাণ করলেন—একজন শিল্পীকে তাঁর নিজস্ব স্বরই আলাদা করে চিহ্নিত করে।
৯২ বছরের আয়ুষ্কালে তিনি সমাজ ও সংস্কৃতির অনেক যুগ দেখেছেন, অনেক যুগ গড়েছেনও। বলিউডের স্বর্ণযুগে তাঁর কণ্ঠ ছিল এক অমূল্য সম্পদ। প্রেমের গান থেকে শুরু করে কাব্যিক গজল, মজার আইটেম নাম্বার থেকে গভীর আবেগময় সুর—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান যেন জীবন্ত হয়ে উঠত, যেন প্রতিটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে থাকত একেকটি গল্প।

ও.পি. নাইয়ার, বাহুল দেব বর্মণ, খৈয়াম, লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলাল, কল্যাণজি-আনন্দজি—এমন বহু কিংবদন্তি সুরকারের সঙ্গে তাঁর সৃষ্টিশীল সম্পর্ক ভারতীয় সংগীতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল। বিশেষ করে বাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে তাঁর সংগীতযাত্রা ছিল এক অসাধারণ অধ্যায়—যেখানে প্রেম আর সৃষ্টির মেলবন্ধন এক নতুন জাদু তৈরি করেছিল। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি। “পিয়া তু আব তো আজা” বা “দম মারো দম”-এর মতো গানগুলো শুধু জনপ্রিয়ই হয়নি, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছে। আবার “দিল চীজ ক্যা হ্যায়”, “চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে হো দিলকো” বা “মেরা কুছ সামান”-এর মতো গানগুলোতে তিনি তুলে ধরেছেন এক গভীর, সংবেদনশীল শিল্পীসত্তা। এই বৈচিত্র্যই তাঁকে করেছে অনন্য। দ্বৈতকণ্ঠের গানে সকল প্রতিষ্ঠিত গায়ক-গায়িকাদের সাথে গেয়েছেন। অনেক ছায়াছবির পরিচালক ও সংগীত পরিচালক তাঁর একটি গানের জন্য এক বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করেছেন কারণ এই গান তাঁকে ছাড়া আর কারো সাথে যায় না।

বলিউডে এক সময় লতা মুঙ্গেশকর-কে ডোনাল্ড ব্রাডম্যান ও আশা ভোঁসলে-কে স্যার গ্যারি সোবার্সের সাথে তুলনা করা হয়েছিল। তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য তাঁকে বিশ্বখ্যাত অলরাউন্ডারের সাথে তুলনা করতে অনুরাগীদের উদবুদ্ধ করেছিল।
আশা ভোঁসলের কণ্ঠ শুধু হিন্দি সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি গেয়েছেন বাংলা, মারাঠি, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, এমনকি ইংরেজিতেও। প্রতিটি ভাষায় তিনি একই দক্ষতায় নিজের ছাপ রেখে গেছেন।

বাংলা গানে তাঁর অবদানও অনস্বীকার্য—যেখানে তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠেছে এক অন্যরকম মাধুর্য। তিনি ছিলেন এক নির্ভীক শিল্পী। নতুন কিছু করতে তিনি কখনোই ভয় পাননি। যখন সময় বদলেছে, সংগীতের ধারা বদলেছে, তখনও তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক পপ, ফিউশন—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নাটকীয়তায় ভরা। প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ—সবকিছুই তিনি সাহসের সাথে মোকাবিলা করেছেন। কিন্তু কখনোই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ঝড় তাঁর সৃষ্টিকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁর কণ্ঠকে আরও গভীর করেছে, আরও সমৃদ্ধ করেছে। আজ যখন আমরা তাঁকে হারানোর কথা ভাবছি, তখন মনে হয়—তিনি কি সত্যিই হারিয়ে গেছেন? তাঁর গাওয়া হাজার হাজার গান আজও বেঁচে আছে। প্রতিটি সুরে, প্রতিটি লাইনে তিনি যেন আমাদের সাথে কথা বলেন। রেডিওতে বাজে তাঁর গান, টেলিভিশনে শোনা যায় তার কণ্ঠ, ইউটিউবে নতুন প্রজন্ম খুঁজে পায় তাঁর সুর—তাহলে তিনি কোথায় হারালেন?

শিল্পীরা কখনো মরে না। তাঁরা থেকে যায় তাঁদের সৃষ্টির মধ্যে। আশা ভোঁসলে সেই অমর শিল্পীদের একজন। তাঁর কণ্ঠ এক অনন্ত নদীর মতো—যা কখনো থামে না, শুধু বয়ে চলে। আজকের এই বিদায়ের দিনে আমরা শুধু দুঃখ প্রকাশ করব না, বরং উদযাপন করব তাঁর জীবনকে, তাঁর সৃষ্টিকে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—সংগীত শুধু বিনোদন নয়, এটি এক অনুভূতি, এক জীবনযাপন। তাঁর কণ্ঠে আমরা পেয়েছি প্রেমের ভাষা, বেদনার সান্ত্বনা, আনন্দের উচ্ছ্বাস। তিনি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছেন—একজন শিল্পী হিসেবে নয়, একজন অনুভূতির বাহক হিসেবে।
বিদায় আশা ভোঁসলে—আপনি হয়তো আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আপনার সুর চিরকাল বেঁচে থাকবে। প্রতিটি প্রজন্ম আপনার গান শুনবে, আপনার কণ্ঠে খুঁজে পাবে নিজের অনুভূতি।

আপনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন—আমাদের হৃদয়ের গভীরে, আমাদের স্মৃতির প্রতিটি কোণে, আমাদের জীবনের প্রতিটি সুরে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি।


মিহিরকান্তি চৌধুরী : লেখক, অনুবাদক ও নির্বাহী প্রধান, টেগোর সেন্টার, সিলেট।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.