Sylhet Today 24 PRINT

দিবসের রাজনীতি: ঐক্যের বদলে বিভাজনের অনুশীলন

আকাশ চৌধুরী  |  ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিভিন্ন জাতীয় ও সাংস্কৃতিক দিবস উদযাপন। এসব দিবস আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংগ্রাম এবং পরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, সময়ের পরিক্রমায় এসব দিবসকে ঘিরে যে ঐক্যের পরিবেশ গড়ে ওঠার কথা ছিল, তার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা প্রত্যক্ষ করছি রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নামকরণ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক। এটি শুধু দুঃখজনকই নয়, বরং আমাদের সামষ্টিক চেতনার জন্যও ক্ষতিকর।

বিগত বিভিন্ন সরকারের আমলে আমরা দেখেছি, একেকটি দিবসের নাম একেকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে দিবসের উপস্থাপন, ব্যাখ্যা এবং কখনো কখনো মূল চেতনার দিকটিও। অথচ একটি জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি কোনো দল বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়—এটি সবার, এটি সর্বজনীন। তাই এসব দিবসের নাম ও তাৎপর্য নির্ধারণে রাজনৈতিক প্রভাব থাকাটা একেবারেই অনুচিত।

উদাহরণ হিসেবে পহেলা বৈশাখের কথাই ধরা যাক। এটি বাঙালির প্রাণের উৎসব, বাংলা নববর্ষের সূচনা। ধর্ম, বর্ণ, দল-মত নির্বিশেষে এটি সকলের উৎসব। অথচ এখানেও আমরা দেখতে পাচ্ছি নামকরণ নিয়ে বিতর্ক—কখনো “মঙ্গল শোভাযাত্রা”, কখনো “বৈশাখী শোভাযাত্রা”। একটি সাংস্কৃতিক আয়োজনে এমন নাম পরিবর্তনের প্রবণতা নতুন প্রজন্মের কাছে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। তারা বুঝতে পারছে না, আসল নাম কী, এর পেছনের ইতিহাস কী, এবং কোনটি গ্রহণযোগ্য।

এই ধরনের বিভ্রান্তি শুধু একটি নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ধীরে ধীরে আমাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। নতুন প্রজন্ম যখন কোনো কিছু স্পষ্টভাবে জানতে পারে না, তখন তাদের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়। আর এই সংশয় একসময় উদাসীনতায় রূপ নেয়। ফলে তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করে, যা একটি জাতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

দিবসের নাম পরিবর্তনের এই প্রবণতা আমাদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভাজনও সৃষ্টি করছে। একটি পক্ষ একটি নাম সমর্থন করছে, অন্য পক্ষ আরেকটি নাম—এভাবে একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক বিষয়ও রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। অথচ এসব দিবসের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষকে একত্রিত করা, ঐক্যের বার্তা দেওয়া।

আমাদের মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি কখনোই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাতিয়ার হতে পারে না। এটি একটি জাতির আত্মার প্রতিফলন। তাই এর সঙ্গে কোনো ধরনের কৃত্রিম পরিবর্তন বা বিভাজনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তা শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদেরই ক্ষতি করবে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি। যেকোনো দিবসের জন্য একটি নির্দিষ্ট, গ্রহণযোগ্য এবং সর্বসম্মত নাম থাকা উচিত, যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হবে না। এটি নির্ধারণ করতে পারে একটি নিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক বোর্ড বা জাতীয় পর্যায়ের কোনো বিশেষজ্ঞ কমিটি, যেখানে ইতিহাসবিদ, সংস্কৃতিবিদ এবং সমাজবিজ্ঞানীরা যুক্ত থাকবেন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এমন একটি উদ্যোগই পারে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। একটি জাতির ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের। আমরা যদি নিজেরাই বিভ্রান্তি ছড়াই বা অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে জড়িয়ে পড়ি, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের উপর পড়বে।

অতএব, সময় এসেছে এসব বিষয় নিয়ে নতুন করে ভাবার। দিবসকে ঘিরে রাজনীতি নয়, বরং ঐক্য ও সম্মানের চর্চা প্রয়োজন। একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার মানুষ নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করে। আর সেই সম্মান বজায় রাখতে হলে দিবসগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।

আমরা আশা করতে পারি, ভবিষ্যতে এসব দিবস সত্যিকার অর্থেই আমাদের মিলনের উৎসবে পরিণত হবে—বিভাজনের নয়।

আকাশ চৌধুরী: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.