Sylhet Today 24 PRINT

শ্রমিকের রক্তে লেখা অধিকার

খালেদ উদ-দীন |  ০১ মে, ২০২৬

মে দিবস—শুধু একটি ঐতিহাসিক দিবস নয়, এটি মানবসভ্যতার বিবেকের এক জাগ্রত প্রতীক। শ্রমিকের ঘাম, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অধিকারকে স্মরণ করার দিন। প্রতি বছরের ১ মে আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সভ্যতার অট্টালিকা যাদের কাঁধে দাঁড়িয়ে, তাদের জীবন কতটা সংগ্রাম, বঞ্চনা ও অবহেলার গল্পে ভরা।

১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটের সেই রক্তাক্ত ইতিহাস আজও বিশ্বমানবতার অন্তরে অনুরণিত হয়। দৈনিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে শ্রমিকদের আত্মদানের ঘটনা কেবল একটি দেশের ইতিহাস নয়; এটি সমগ্র বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রামের সূচনা-ক্ষণ। সেই সময় শ্রমিকদের জীবন ছিল অমানবিক পরিশ্রমে ক্লিষ্ট—প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ, নগণ্য মজুরি, নেই কোনো নিরাপত্তা, নেই সামাজিক মর্যাদা। মানুষের চেয়ে যেন তারা ছিল উৎপাদনের যন্ত্র।

এই অবমাননাকর অবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শিকাগোর শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৮৮৬ সালের ৪ মে হে মার্কেটের সেই সমাবেশ, পুলিশের গুলিবর্ষণ, শ্রমিকদের রক্তপাত—সবকিছু মিলে গড়ে ওঠে এক মর্মন্তুদ অধ্যায়। বিচার নামে প্রহসনের মাধ্যমে শ্রমিক নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হলেও তাদের কণ্ঠরোধ করা যায়নি। আগস্ট স্পিজের সেই অমর উচ্চারণ—“আজ আমাদের এই নীরবতা, তোমাদের আওয়াজের চেয়েও শক্তিশালী”—সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও সত্যের শক্তিকে ধারণ করে আছে।

এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রমিকের মৌলিক অধিকার—দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ, ন্যায্য মজুরি এবং মানবিক কর্মপরিবেশের ধারণা। মে দিবস তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; এটি একটি চলমান সংগ্রামের প্রতীক, একটি অসমাপ্ত ইতিহাসের ধারাবাহিকতা।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে—এই অর্জনের শতাধিক বছর পর, আমরা কি সত্যিই শ্রমিকের সেই ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিত করতে পেরেছি?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নটি আরও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো শ্রমজীবী মানুষ—গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক—তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও তাদের একটি বড় অংশ ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত।

বর্তমান সময়ে শ্রমিকদের দুর্দশা আরও বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি তাদের জীবনে এক নতুন সংকট তৈরি করেছে। সীমিত আয়ের মধ্যে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বহন করা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অনেক শ্রমিক পরিবারে দেখা যায়—দিনের আয়ের বড় অংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতেই শেষ হয়ে যায়, ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় গড়ে তোলা তো দূরের কথা।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়—তারা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলেও নিজেরাই অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, ওভারটাইমের চাপ, কর্মস্থলের মানসিক চাপ—এসব তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো মজুরি পরিশোধ না হওয়া বা ন্যায্য মজুরি নিয়ে দ্বন্দ্ব তাদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।

নির্মাণখাতের শ্রমিকদের অবস্থাও কম করুণ নয়। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেও তারা অনেক সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম পান না। দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে প্রতিটি কর্মদিবসই তাদের জন্য এক ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি দাঁড়ানোর সমান।

গ্রামাঞ্চলের কৃষিশ্রমিকরা মৌসুমি কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল। কাজের সময় কাজ থাকলেও অফ-সিজনে তারা বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের চক্রে আটকে পড়েন। অন্যদিকে শহরের দিনমজুর ও রিকশাচালকরা প্রতিদিনের আয়-নির্ভর জীবনে অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করেন—আজ কাজ আছে, কাল নেই।

গৃহকর্মী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অবস্থান সবচেয়ে প্রান্তিক। তাদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই আইনি সুরক্ষার যথাযথ প্রয়োগ। অনেক ক্ষেত্রে তারা মৌখিক চুক্তির ভিত্তিতে কাজ করেন, যেখানে শোষণের সুযোগ থেকেই যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রমিকদের সামাজিক মর্যাদা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক বাড়লেও শ্রমিক শ্রেণির প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। তাদের শ্রমকে প্রয়োজন হিসেবে দেখা হলেও সম্মান হিসেবে মূল্যায়নের সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

এ অবস্থায় মে দিবসের তাৎপর্য আমাদের জন্য আরও গভীর হয়ে ওঠে। এটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়; বরং আত্মসমালোচনা ও দায়বোধের দিন। আমাদের ভাবতে হয়—উন্নয়নের যে গল্প আমরা বলি, সেই গল্পে শ্রমিকের স্থান কোথায়?

শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি একটি মানবিক ও নৈতিক প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়ে ওঠে, যখন তার সবচেয়ে পরিশ্রমী মানুষগুলো সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ পায়। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

এক্ষেত্রে সরকার, মালিকপক্ষ ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য। শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, শ্রমিকবান্ধব নীতি প্রণয়ন, এবং তদারকি ব্যবস্থার জোরদারকরণ জরুরি। একইসঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও সচেতনতা বৃদ্ধিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মে দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এটি আমাদের শেখায়—অধিকার কখনো দয়া করে দেওয়া হয় না; তা সংগ্রাম করে অর্জন করতে হয় এবং সচেতনতা ও ঐক্যের মাধ্যমে তা রক্ষা করতে হয়।

আজকের এই দিনে, শিকাগোর সেই শহীদ শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের নতুন করে অঙ্গীকার করা উচিত—বাংলাদেশে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে আরও জোরদার করা, তাদের মর্যাদাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।

কারণ, শ্রমিকের ঘামে যে দেশ গড়ে ওঠে, সেই দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই শ্রমিক হাসতে পারে—নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে, নিজের প্রাপ্য অধিকার নিয়ে।

  • খালেদ উদ-দীন: কবি ও সম্পাদক, বুনন।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.