Sylhet Today 24 PRINT

আহা-রে মা, ফাহিমা!

উজ্জ্বল মেহেদী |  ১২ মে, ২০২৬

কিছু কিছু ঘটনা আছে অতলে তলিয়ে দেয়। এ ঘটনাটি তেমনই। সোনাতলা সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারমুখী মহাসড়কের পাশের গ্রাম। সামনে বাজার, পেছনে জনবসতি। বর্ধিত সিটি করপোরেশনের ছোঁয়া এলেও গ্রামটি এখনো কান্দিগাঁও ইউনিয়নের অংশ। সেখানেই এক শিশু নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ে। পরে উদ্ধার হয় তার মরদেহ। ছবিটি ছড়িয়ে পড়তেই মানুষের বুক হাহাকারে ভরে ওঠে। যে-ই তাকিয়েছে, সে-ই কেঁদেছে নীরবে।

শিশুটির নাম ফাহিমা আক্তার। বয়স মাত্র চার বছর। বাবা দিনমজুর। হাসিখুশি, চঞ্চল-চপলা ফাহিমা। ছবিটির দিকে তাকালেই যেন মাতৃত্ববোধ জেগে ওঠে। বাজারজুড়ে ঘুরে বেড়াত ছোট্ট মেয়েটি। কারণ, তার বাবা সেখানেই দিনমজুরের কাজ করতেন। সবাই চিনত তাকে। কখনো দোকানে ছোটখাটো কাজ, কখনো কারও ডাকে ছুটে যাওয়া—‘এই ফাহিমা!’ ডাক শুনলেই শিশুসুলভ চপলতায় সাড়া দিত সে। কে জানত, এই সরলতা একদিন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে!

‘নিখোঁজ’ হওয়ার খবরে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ডোবা থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ। কিন্তু চার দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যার রহস্য উদঘাটিত হয়নি। সপ্তাহ গড়াতেই এলাকায় ক্ষোভ জমতে থাকে। সভা করে এলাকাবাসী, নড়ে বসে পঞ্চায়েতও। অবশেষে সামনে আসে নির্মম সত্য। শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা কীভাবে সম্ভব? ক্রোধ কি সংবরণ করা যায়? যায়নি। মানুষ ক্রোধান্ধ হয়ে উঠেছে। আবার সেই ক্রোধের ভেতরেও আটকে আছে গভীর আহাজারি—আহা-রে ফাহিমা!

‘ফাহিমা’ নামটির অর্থ খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায়—‘বুদ্ধিমতী’। শব্দটি মনে করিয়ে দেয় ছোটবেলার পাঠ্যবইয়ের সেই ‘বুদ্ধমতী’ গল্পকে। সাজেদুল করিমের গল্পগাথায় বুদ্ধিমতী খুকি গাছে উঠে জিজ্ঞেস করেছিল—‘কী রকম আম চাও, ঠান্ডা না গরম?’ ছেলেরা বলেছিল, ‘গরমটাই দাও।’ তখন সে ঝাঁকি দিয়ে আম ফেলে বলেছিল, ‘এই তো গরম গরম আম খাওয়া হচ্ছে, ফুঁ দিয়ে দিয়ে খাচ্ছ!’

শৈশবের সেই বুদ্ধিমতী খুকির মতোই সোনতলা বাজারেও ফাহিমাকে নিয়ে ছিল অনেক স্নেহমাখা গল্প। প্রথমে শোনা যায়, দোকান থেকে বিস্কুট আনতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছে মেয়েটি। পরে মরদেহ উদ্ধারের পর ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় হত্যার কারণ। চড়েপাখির মতো চঞ্চল এই শিশুটি জ্ঞান ফিরে পেলে হয়তো সব বলে দিতে পারত। সেই আশঙ্কা থেকেই পাশবিকতার চিহ্ন মুছে ফেলতে তাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।

অভিযুক্ত জাকিরকে মাদকাসক্ত বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—কেবল নেশাগ্রস্ত হলেই কি একজন মানুষ এতটা অমানুষ হয়ে উঠতে পারে?
জাকিরকে গ্রেপ্তারের পর শাস্তির দাবিতে মধ্যরাত পর্যন্ত থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন স্থানীয়রা। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িঘরেও হামলা চালায়। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জাকিরের একটি স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও।

সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, সকালে ফাহিমাকে সিগারেট আনতে পাঠানো হয়েছিল। ঘরে একা পেয়ে সে শিশুটির প্রতি খারাপ উদ্দেশ্য পোষণ করে। পরে ভয় পেয়ে গলা টিপে হত্যা করে মরদেহ লুকিয়ে রাখে। দুদিন পর গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে রাতে লাশ ফেলে দেয় নদীতে।

চার বছরের এক শিশুর গল্প এভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল না। ফাহিমার ছোট্ট মুখটি এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে প্রশ্ন করে—আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি?

উজ্জ্বল মেহেদী: লেখক. সাংবাদিক।

টুডে মিডিয়া গ্রুপ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
✉ sylhettoday24@gmail.com ☎ ৮৮ ০১৭ ১৪৩৪ ৯৩৯৩
৭/ডি-১ (৭ম তলা), ব্লু ওয়াটার শপিং সিটি,
জিন্দাবাজার, সিলেট - ৩১০০, বাংলাদেশ।
Developed By - IT Lab Solutions Ltd.